দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তিদের সরকারি ও বেসরকারি সব হাসপাতাল ও ক্লিনিকে জরুরি চিকিৎসা নিশ্চিত করতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সচিবকে সার্কুলার জারির নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। একই সঙ্গে এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট বিধি তৈরির লক্ষ্যে ২০১৮ সালের সড়ক পরিবহন আইন সংশোধনের উদ্যোগ নিতেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
আজ বৃহস্পতিবার দুই বিচারপতির সমন্বয়ে গঠিত একটি হাইকোর্ট বেঞ্চ এই আদেশ দেন। জনস্বার্থে দায়ের করা একটি রিট আবেদনের ওপর দীর্ঘ শুনানি শেষে আদালত সংশ্লিষ্ট রুল আংশিকভাবে চূড়ান্ত ঘোষণা করেন।
রুল চূড়ান্ত করার পাশাপাশি আদালত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দেন, যাতে দুর্ঘটনায় আহত যেকোনো ব্যক্তিকে নিকটস্থ হাসপাতাল বা ক্লিনিক অবিলম্বে চিকিৎসা সেবা দিতে বাধ্য থাকে—এমন একটি সার্কুলার জারি করা হয়। একই সঙ্গে সড়ক পরিবহন আইন সংশোধন করে এ বিষয়ে একটি স্থায়ী আইনি কাঠামো তৈরিরও নির্দেশ দেওয়া হয়।
মামলার পটভূমি অনুযায়ী জানা যায়, ২০১৮ সালের জানুয়ারি মাসে খুলনার এক মোটর পার্টস ব্যবসায়ী ঢাকায় ছিনতাইকারীর হামলার শিকার হয়ে গুরুতর আহত হন। তাকে প্রথমে একটি বেসরকারি হাসপাতালে নেওয়া হলেও সেখানে চিকিৎসা না দিয়ে তাকে সরকারি একটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। এই ঘটনা গণমাধ্যমে প্রকাশিত হওয়ার পর মানবাধিকার বিষয়ক একটি সংগঠন জনস্বার্থে হাইকোর্টে রিট আবেদন দাখিল করে।
সেই আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে হাইকোর্ট একটি রুল জারি করেছিলেন। রুলে জানতে চাওয়া হয়েছিল, দুর্ঘটনায় আহতদের জীবন রক্ষায় প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তা কেন বেআইনি ঘোষণা করা হবে না, চিকিৎসা নিশ্চিতে সার্কুলার জারির নির্দেশ কেন দেওয়া হবে না, এবং ভুক্তভোগীকে ক্ষতিপূরণ প্রদানের নির্দেশ কেন দেওয়া হবে না।
আজকের শুনানিতে আবেদনকারী সংগঠনের পক্ষে একজন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী আদালতে বলেন, সংবিধানের ৩২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী বেঁচে থাকার অধিকার একটি মৌলিক মানবাধিকার। তিনি উল্লেখ করেন, হাসপাতালগুলো সরকারের কাছ থেকে লাইসেন্স গ্রহণের সময় সব ধরনের রোগীকে চিকিৎসা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে থাকে, অথচ বাস্তবে দুর্ঘটনা বা ছিনতাইয়ের শিকার ব্যক্তিরা হাসপাতালে গেলে প্রায়ই চিকিৎসা দিতে অস্বীকৃতি জানানো হয়। তার ভাষ্য অনুযায়ী, সময়মতো চিকিৎসা না পাওয়ার কারণে রোগীর মৃত্যু কোনোভাবেই কাম্য নয়।
ক্ষতিপূরণ সংক্রান্ত বিষয়ে আদালত পর্যবেক্ষণে জানান, মামলার বিবাদী হাসপাতালটি তাদের লিখিত জবাবে দাবি করেছে যে তারা যথাযথ দায়িত্ব পালন করেছে। এই পরিস্থিতিতে প্রকৃত ক্ষতিপূরণের পরিমাণ নির্ধারণের জন্য বিস্তারিত তদন্তের প্রয়োজন রয়েছে, যা একটি সুনির্দিষ্ট আইনি কাঠামোর মাধ্যমেই সম্ভব। তাই হাইকোর্ট সরাসরি ক্ষতিপূরণের নির্দেশ না দিয়ে সংশ্লিষ্ট আইনের আওতায় ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির জন্য প্রতিকারের ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা দেন।
মামলাটিতে বিবাদী পক্ষ হিসেবে ছিলেন স্বাস্থ্য সচিব, পুলিশের মহাপরিদর্শক, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের একজন অতিরিক্ত মহাপরিচালক, বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিলের সভাপতি এবং ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনারসহ মোট ১২ জন কর্মকর্তা ও প্রতিষ্ঠান। রিট আবেদনকারীর পক্ষে শুনানিতে অংশ নেন একজন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী, তাকে সহযোগিতা করেন আরও দুজন আইনজীবী। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন একজন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল, আর স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এবং বিবাদী হাসপাতালের পক্ষেও পৃথক আইনজীবীরা শুনানিতে অংশ নেন।

