আদালতে মামলা চলার দীর্ঘসূত্রতা কমাতে মধ্যস্থতার মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তির পরিসর বাড়ানো হচ্ছে। এরই অংশ হিসেবে নির্দিষ্ট কয়েক ধরনের মামলা মধ্যস্থতার মাধ্যমে নিষ্পত্তির উদ্যোগ নিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট লিগ্যাল এইড কার্যালয়। এ কার্যক্রম পরিচালনার জন্য প্রধান বিচারপতির অনুমতিও মিলেছে।
মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসনের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে একটি সার্কুলার জারি করা হয়। এতে বলা হয়েছে, প্রাথমিক পর্যায়ে নির্দিষ্ট কিছু আইনের অধীনে দায়ের হওয়া মামলায় বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি, বিশেষ করে মধ্যস্থতা কার্যক্রম পরিচালনা করতে প্রধান বিচারপতি সদয় অনুমতি দিয়েছেন।
সুপ্রিম কোর্টের ডেপুটি রেজিস্ট্রার আল ইমরান খান স্বাক্ষরিত সার্কুলারটি উভয় বিভাগের বিচারপতিদের অবগতির জন্য জারি করা হয়েছে।
যেসব মামলায় মধ্যস্থতার সুযোগ
সার্কুলার অনুযায়ী, পারিবারিক আদালত আইন, ২০২৩-এর ধারা ৫, পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ আইন, ২০১৩-এর ধারা ৫ এবং যৌতুক নিরোধ আইন, ২০১৮-এর ধারা ৩ ও ৪-এর আওতাভুক্ত মামলা মধ্যস্থতার মাধ্যমে নিষ্পত্তির আওতায় আসবে।
এ ছাড়া নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০-এর ধারা ১১(গ) এবং দণ্ডবিধির ১৪৩, ৪৪৭, ৪৪৮, ৩২৩, ৩২৪, ৩২৫, ৩৫৪, ৩৭৯, ৩৮০, ৩৮১, ৪০৬, ৪১৭, ৪২০, ৪৯৪, ৫০০, ৫০১ ও ৫১১ ধারায় দায়ের হওয়া মামলাও এই প্রক্রিয়ার আওতায় আনা হয়েছে।
নির্দিষ্ট কিছু দেওয়ানি বিরোধের ক্ষেত্রেও একই সুযোগ রাখা হয়েছে। এর মধ্যে সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইন, ১৮৭৭-এর ধারা ৮, ৯, ১২, ৩৯, ৪২ ও ৫৪ এবং হস্তান্তরযোগ্য দলিল আইন, ১৮৮১-এর ধারা ১৩৮-এর অধীনে দায়ের হওয়া মামলা রয়েছে।
মামলাজট কমানোর সম্ভাবনা কতটা
মধ্যস্থতার মূল লক্ষ্য হলো দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়ার বিকল্প হিসেবে বিরোধের পক্ষগুলোকে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের সুযোগ দেওয়া। এতে দুই পক্ষের সম্মতিতে দ্রুত বিরোধ মিটে গেলে একটি মামলা পূর্ণাঙ্গ বিচারপর্বে না গিয়েই শেষ হতে পারে। ফলে বিচারপ্রার্থীর সময় ও অর্থ দুটোই সাশ্রয় হওয়ার সুযোগ রয়েছে।
বাংলাদেশের আদালতগুলোতে মামলার বিপুল চাপের বাস্তবতায় এমন উদ্যোগকে তাই শুধু বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির ব্যবস্থা হিসেবে দেখছেন না সংশ্লিষ্টরা। তাঁদের মতে, কার্যকরভাবে মধ্যস্থতা করা গেলে এটি মামলাজট কমানোর পাশাপাশি আদালতের ওপর চাপ কমাতেও ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে এর কার্যকারিতা অনেকটাই নির্ভর করবে মধ্যস্থতার প্রক্রিয়া কতটা নিরপেক্ষ, দক্ষ ও পক্ষগুলোর জন্য গ্রহণযোগ্যভাবে পরিচালিত হচ্ছে তার ওপর। বিশেষ করে পারিবারিক বিরোধ, অর্থনৈতিক লেনদেন কিংবা প্রতিবেশী ও সম্পত্তিসংক্রান্ত বিরোধে সমঝোতার নামে কোনো পক্ষ যেন চাপের মুখে না পড়ে, সে বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশ ইন্টারন্যাশনাল মেডিয়েশন সোসাইটির চেয়ারম্যান জ্যেষ্ঠ আইনজীবী অ্যাডভোকেট এস এন গোস্বামী এ উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। তাঁর মতে, প্রধান বিচারপতির এই পদক্ষেপ বিচার ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনতে পারে।
তিনি বলেন, মধ্যস্থতার মাধ্যমে মামলা নিষ্পত্তির সুযোগ বাড়ানো হলে বিচার বিভাগে মামলাজট কমতে পারে এবং এর সুফল সাধারণ মানুষও পেতে পারেন।
সুপ্রিম কোর্ট লিগ্যাল এইডের মাধ্যমে এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে আদালতকেন্দ্রিক বিরোধ নিষ্পত্তিতে একটি নতুন সংস্কৃতি তৈরি হতে পারে। তবে সেই প্রক্রিয়া কতটা দ্রুত, স্বচ্ছ ও ন্যায়সংগতভাবে পরিচালিত হয়, সেটিই শেষ পর্যন্ত উদ্যোগটির সাফল্য নির্ধারণ করবে।

