সালমান শাহর মৃত্যু বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত এবং দীর্ঘস্থায়ী রহস্য। ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর জনপ্রিয় এই চিত্রনায়কের মৃত্যুর পর যে প্রশ্নের জন্ম হয়েছিল—এটি আত্মহত্যা, নাকি হত্যাকাণ্ড—২৯ বছর পরও তার চূড়ান্ত উত্তর মেলেনি। বরং সময়ের সঙ্গে সেই প্রশ্ন আরও জটিল হয়েছে।
তবে সাম্প্রতিক আইনি অগ্রগতি ঘটনাটিকে নতুন একটি পর্যায়ে নিয়ে এসেছে। ২০২৫ সালের ২০ অক্টোবর ঢাকার ষষ্ঠ অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালত নীলা চৌধুরীর রিভিশন আবেদন মঞ্জুর করে আগের অপমৃত্যুর মামলা বাতিল করে অভিযোগটি দণ্ডবিধির ৩০২/৩৪ ধারায় হত্যা মামলা হিসেবে গ্রহণের পথ খুলে দেন। আদালতের আদেশ অনুযায়ী ১৯৯৬ সালের অপমৃত্যুর অভিযোগ, ১৯৯৭ সালের আবেদন এবং রিজভি ওরফে ফারহাদের কথিত স্বীকারোক্তির অনুলিপি একত্রে এফআইআর হিসেবে বিবেচিত হয়।
প্রশ্ন হলো—প্রায় তিন দশক পর এই তদন্তের আইনি ভিত্তি কতটা শক্ত?
পুনঃতদন্ত কি আইনে অসম্ভব?
একেবারেই নয়।
বাংলাদেশের ফৌজদারি কার্যবিধির ১৭৩(৩B) ধারাই এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। কোনো তদন্তের পর পুলিশ প্রতিবেদন আদালতে দাখিল হয়ে গেলেও নতুন মৌখিক বা লিখিত প্রমাণ পাওয়া গেলে আইন further investigation বা অধিকতর তদন্তের পথ বন্ধ করে দেয় না। নতুন প্রমাণ পাওয়া গেলে পুলিশ পরবর্তী প্রতিবেদনও আদালতে দিতে পারে।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি পার্থক্য আছে—জনপ্রিয় ভাষায় আমরা যাকে ‘পুনঃতদন্ত’ বলি, আইনের ভাষায় সেটি অনেক ক্ষেত্রে further investigation। অর্থাৎ আগের তদন্তকে অদৃশ্য করে সম্পূর্ণ নতুন একটি ইতিহাস লেখা নয়; বরং আগের তদন্তের পাশাপাশি নতুন তথ্য, নতুন সাক্ষ্য, নতুন ফরেনসিক উপাদান বা নতুন পরিস্থিতি যাচাই করা।
সুতরাং শুধু ২৯ বছর পার হয়ে গেছে—এই কারণে তদন্তের দরজা আইনগতভাবে বন্ধ হয়ে যায় না।
হত্যা মামলা কি এত বছর পরও হতে পারে?
এ ক্ষেত্রেও সময়ের ব্যবধান নিজে কোনো চূড়ান্ত বাধা নয়।
দণ্ডবিধির ৩০২ ধারায় হত্যার শাস্তি নির্ধারিত হয়েছে মৃত্যুদণ্ড অথবা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও জরিমানা হিসেবে।
অতএব, সালমান শাহর মৃত্যুর ঘটনাকে যদি তদন্তে হত্যাকাণ্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার মতো আইনসম্মত প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে শুধু ‘২৯ বছর হয়ে গেছে’—এ যুক্তিতে ফৌজদারি দায় বিলীন হয়ে যায় না।
কিন্তু এখানেই আসল চ্যালেঞ্জ।
মামলা করার আইনগত সুযোগ থাকা আর ২৯ বছর পর আদালতে হত্যাকাণ্ড প্রমাণ করা—দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়।
সবচেয়ে বড় বাধা: প্রমাণ
তিন দশকের কাছাকাছি সময় পেরিয়ে যাওয়া এই মামলার সবচেয়ে দুর্বল জায়গা সম্ভবত এখানেই।
সময়ের সঙ্গে প্রত্যক্ষদর্শীর স্মৃতি দুর্বল হয়, সাক্ষীর মৃত্যু হতে পারে, নথি হারিয়ে যেতে পারে, ঘটনাস্থলের অবস্থা বদলে যায় এবং বস্তুগত আলামতের নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে।
ফলে নতুন তদন্তের সাফল্য নির্ভর করবে মূলত একটি প্রশ্নের ওপর—
আগের তদন্তকে প্রশ্নবিদ্ধ করার মতো নতুন, নির্ভরযোগ্য ও আদালতে গ্রহণযোগ্য প্রমাণ কি পাওয়া যাবে?
শুধু পরিবারের দীর্ঘদিনের অভিযোগ, জনমত, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আলোচনা কিংবা কোনো ব্যক্তির পুরোনো দাবি যথেষ্ট নয়। ফৌজদারি আদালতে সন্দেহ এবং বিশ্বাসের চেয়ে প্রমাণের মূল্য বেশি।
দেহাবশেষ উত্তোলন: বৈজ্ঞানিক তদন্তের সুযোগ, নাকি দেরিতে নেওয়া ঝুঁকি?
২০২৬ সালের মে মাসে আদালত সালমান শাহর দেহাবশেষ উত্তোলন, ইনকোয়েস্ট ও পুনরায় ময়নাতদন্তের অনুমতি দিয়েছে।
আইনগতভাবে এটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। কারণ মৃত্যুর কারণ নিয়ে পূর্ববর্তী অনুসন্ধানের সঙ্গে নতুন ফরেনসিক তথ্যের তুলনা করা সম্ভব হলে তদন্ত অনেক বেশি বস্তুনিষ্ঠ হতে পারে।
তবে ২৯ বছর পর ময়নাতদন্তের বৈজ্ঞানিক সীমাবদ্ধতাও বাস্তবতা। এত দীর্ঘ সময় পর দেহাবশেষ থেকে কী ধরনের নির্ভরযোগ্য তথ্য উদ্ধার করা সম্ভব হবে, তার ওপরই এই প্রক্রিয়ার কার্যকারিতা অনেকাংশে নির্ভর করবে।
তাই নতুন ময়নাতদন্তকে ‘হত্যার প্রমাণ মিলেই যাবে’—এমন প্রত্যাশায় দেখা ঠিক হবে না। বরং এটিকে দেখা উচিত সত্য উদঘাটনের একটি ফরেনসিক প্রচেষ্টা হিসেবে।
১৯৯৭ সালের কথিত স্বীকারোক্তির গুরুত্ব কতটা?
এই মামলায় রিজভি ওরফে ফারহাদের কথিত স্বীকারোক্তির বিষয়টি বহু বছর ধরে আলোচিত। সাম্প্রতিক আদালতের আদেশেও ওই বক্তব্যের অনুলিপি এফআইআরের সঙ্গে যুক্ত করার কথা এসেছে।
কিন্তু এখানেও আইন একটি কঠিন প্রশ্ন করবে—স্বীকারোক্তিটি কোথায়, কী পরিস্থিতিতে, কার কাছে এবং কোন প্রক্রিয়ায় দেওয়া হয়েছিল?
কারণ কোনো বক্তব্যকে ‘স্বীকারোক্তি’ বলা হলেই সেটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে হত্যার চূড়ান্ত প্রমাণ হয়ে যায় না। এর গ্রহণযোগ্যতা, স্বেচ্ছাসুলভতা, প্রাসঙ্গিকতা এবং অন্যান্য প্রমাণের সঙ্গে সামঞ্জস্য—সবকিছু আদালতকে বিবেচনা করতে হবে।
অর্থাৎ পুরোনো একটি বক্তব্য নতুন তদন্তের দরজা খুলতে পারে; কিন্তু একা সেটিই হয়তো বিচারে দোষ প্রমাণের জন্য যথেষ্ট হবে না।
আগের তদন্ত ভুল ছিল—এটিও প্রমাণ করতে হবে
১৯৯৭ সালে সিআইডি তদন্ত শেষে সালমান শাহর মৃত্যুকে আত্মহত্যা হিসেবে উল্লেখ করে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিয়েছিল। পরবর্তীতে বাদীপক্ষ সেই অবস্থানের বিরুদ্ধে আইনি প্রতিকার চায়।
এখন নতুন তদন্তের সামনে শুধু ‘হত্যা হয়েছিল কি না’—এই প্রশ্নই নয়; আরও একটি প্রশ্ন রয়েছে:
আগের তদন্তের কোন অংশ ভুল, অসম্পূর্ণ বা পর্যাপ্তভাবে যাচাই করা হয়নি?
যদি নতুন তদন্ত পূর্ববর্তী তদন্তের দুর্বলতা নির্দিষ্টভাবে শনাক্ত করতে পারে এবং তার সঙ্গে নতুন বস্তুগত বা সাক্ষ্যপ্রমাণ যুক্ত করতে পারে, তাহলে মামলার ভিত্তি শক্তিশালী হবে।
অন্যথায় কেবল আগের সিদ্ধান্তের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করলেই হত্যার মামলা প্রমাণিত হবে না।
আদালতের সাম্প্রতিক পদক্ষেপ কেন গুরুত্বপূর্ণ?
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—এটি এখন আর কেবল জনমতের বিতর্ক নয়; এটি বিচারিক প্রক্রিয়ার অংশ।
আদালত হত্যা মামলা হিসেবে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে এবং ২০২৬ সালের জুলাইয়ে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য ৩০ আগস্ট নতুন তারিখ নির্ধারণ করেছে।
অর্থাৎ এখন তদন্তকারী সংস্থার ওপর সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হলো আবেগ নয়, evidence-based investigation করা।
কারও সামাজিক পরিচয়, জনপ্রিয়তা কিংবা দীর্ঘদিনের জনমত তদন্তের মানদণ্ড হতে পারে না। একইভাবে কাউকে শুধু অভিযোগের ভিত্তিতেও অপরাধী বলা যাবে না।
তাহলে আইনি ভিত্তি কতটা শক্ত?
সংক্ষিপ্ত উত্তর—তদন্ত চালানোর আইনি ভিত্তি যথেষ্ট শক্ত; কিন্তু হত্যার অভিযোগ প্রমাণ করার ভিত্তি এখনো তদন্তের ফলাফলের ওপর নির্ভরশীল।
ফৌজদারি কার্যবিধির ১৭৩(৩B) ধারা পূর্ববর্তী পুলিশ প্রতিবেদনের পরও অধিকতর তদন্তের সুযোগ দেয়। আদালতের সাম্প্রতিক আদেশও মামলাটিকে হত্যা হিসেবে তদন্তের বিচারিক ভিত্তি তৈরি করেছে।
কিন্তু আইনি প্রক্রিয়ার এই শক্ত ভিত্তিকে আদালতে দণ্ডাদেশের মতো করে দেখার কোনো সুযোগ নেই।
Investigation is not conviction.
তদন্তের উদ্দেশ্য হলো সত্য উদঘাটন; কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রতিষ্ঠা করা নয়।
এই মামলায় এখন যা সবচেয়ে জরুরি
সালমান শাহ মামলায় নতুন তদন্তের বিশ্বাসযোগ্যতা নির্ভর করবে কয়েকটি বিষয়ে—
- আগের তদন্তের ত্রুটি নিরপেক্ষভাবে শনাক্ত করা;
- নতুন সাক্ষ্য ও পুরোনো সাক্ষ্যের মধ্যে সামঞ্জস্য যাচাই করা;
- ফরেনসিক ও ময়নাতদন্তের তথ্য বৈজ্ঞানিকভাবে মূল্যায়ন করা;
- ১৯৯৭ সালের কথিত স্বীকারোক্তির আইনগত গ্রহণযোগ্যতা যাচাই করা;
- প্রত্যেক আসামির বিরুদ্ধে পৃথক ও নির্দিষ্ট ভূমিকার প্রমাণ খুঁজে বের করা;
- মৃত্যুর কারণ ও ঘটনাপ্রবাহের একটি সুসংগত chain of evidence তৈরি করা;
- এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—কোনো নির্দোষ ব্যক্তিকে শুধু জনচাপের কারণে অভিযুক্ত না করা।
শেষ কথা
সালমান শাহ শুধু একজন অভিনেতা ছিলেন না; তিনি একটি প্রজন্মের আবেগের নাম। তাই তার মৃত্যুর রহস্যের নিষ্পত্তি নিয়ে মানুষের আগ্রহ স্বাভাবিক।
কিন্তু ন্যায়বিচারের পথে আবেগকে প্রমাণের বিকল্প করা যাবে না।
২৯ বছর পর তদন্তের দরজা আবার খুলেছে—এটি নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সত্যিকার ন্যায়বিচার তখনই হবে, যখন তদন্ত বলবে কী ঘটেছিল, কীভাবে ঘটেছিল এবং তার পক্ষে কী প্রমাণ রয়েছে।
হত্যা হয়ে থাকলে হত্যার বিচার হোক। আত্মহত্যা হয়ে থাকলে সেটিও প্রমাণের ভিত্তিতে স্পষ্ট হোক। আর যদি পূর্ববর্তী তদন্তে গুরুতর ত্রুটি থেকে থাকে, সেটিও আইনের আলোয় প্রকাশিত হোক।
কারণ এত দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর সালমান শাহর পরিবারের যেমন সত্য জানার অধিকার আছে, তেমনি অভিযুক্ত প্রত্যেক ব্যক্তিরও ন্যায়বিচার ও নিরপেক্ষ তদন্ত পাওয়ার অধিকার আছে।
২৯ বছর পর এই মামলার সবচেয়ে বড় পরীক্ষা তাই ‘কাকে দোষী করা হবে’ নয়—বরং ‘সত্যকে কতটা প্রমাণ দিয়ে প্রতিষ্ঠা করা যাবে’।
সেখানেই নির্ধারিত হবে সালমান শাহ হত্যা মামলার নতুন অধ্যায়টি ইতিহাসের আরেকটি রহস্য হয়ে থাকবে, নাকি সত্যিই ন্যায়বিচারের দিকে এগোবে।

