হিন্দু দায়ভাগা আইনে ভাইয়ের সম্পত্তিতে বোনের উত্তরাধিকারী হিসেবে স্বত্ব দাবি করার সুযোগ নেই বলে গুরুত্বপূর্ণ রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট। একই সঙ্গে আদালত বলেছেন, কোনো বিধবা নারী স্বামীর মৃত্যুর পর তাঁর সম্পত্তিতে অধিকার পেলেও সেই সম্পত্তির পরবর্তী উত্তরাধিকারী হওয়ার আইনগত যোগ্যতা না থাকলে অন্য কেউ তাঁর সম্পত্তি হস্তান্তর নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারবেন না।
এ বিষয়ে করা একটি দেওয়ানি রিভিশন আবেদন খারিজ করে গত ৯ জুলাই বিচারপতি শেখ আবদুল আউয়াল ও বিচারপতি মো. রাফিজুল ইসলামের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এ রায় দেন। রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি প্রকাশ করা হয়েছে বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট)। এতে অধস্তন আদালতের দেওয়া আগের দুই রায়ও বহাল রাখা হয়েছে।
‘অমর কুমার দাসের উত্তরাধিকারী লিলি রানী দাস ও অন্যান্য বনাম ড. মনোরঞ্জন মহুরী ও অন্যান্য’ মামলায় এই সিদ্ধান্ত আসে। রায়ের মূল অংশ লিখেছেন বিচারপতি মো. রাফিজুল ইসলাম।
বিধবার সম্পত্তিতে কার অধিকার
মামলাটির গুরুত্ব শুধু বোনের উত্তরাধিকার দাবি নাকচ করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। হাইকোর্ট দায়ভাগা আইনে বিধবার সম্পত্তিগত অধিকার এবং তাঁর মৃত্যুর পর সেই সম্পত্তিতে কার দাবি তৈরি হতে পারে, সে বিষয়েও ব্যাখ্যা দিয়েছেন।
আদালতের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, কোনো পুরুষ মারা গেলে তাঁর বিধবা স্ত্রী জীবিত থাকা অবস্থায় স্বামীর সম্পত্তিতে অধিকার ভোগ করেন। তবে সেই অধিকার সম্পূর্ণ মালিকের মতো নয়; সম্পত্তি হস্তান্তরের ক্ষেত্রে তাঁর ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা রয়েছে।
তবে বিধবা কোনো সম্পত্তি হস্তান্তর করলে সেটিকে চ্যালেঞ্জ করার অধিকার সবার নেই। আদালতের মতে, বিধবার মৃত্যুর পর যিনি ওই সম্পত্তির প্রকৃত উত্তরাধিকারী বা পরবর্তী উত্তরাধিকারী হওয়ার আইনগত যোগ্যতা রাখেন, কেবল তিনিই সেই হস্তান্তরের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারেন।
অর্থাৎ, কোনো ব্যক্তির বর্তমান বা ভবিষ্যৎ আইনগত স্বার্থ না থাকলে শুধু সম্পত্তি ‘আইনগত প্রয়োজনে’ হস্তান্তর করা হয়নি—এমন অভিযোগ তুলে মামলা করার অধিকারও তাঁর তৈরি হয় না।
যে জমি নিয়ে বিরোধ
মামলার নথি অনুযায়ী, চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার রামকান্ত বিশ্বাস ১৯২০ সালে নিজ অর্থে তাঁর ছেলে সতীশ চন্দ্র বিশ্বাসের নামে ১ দশমিক ৩৫ একর জমি কেনেন। তবে রামকান্ত বিশ্বাস জীবিত থাকতেই সতীশ চন্দ্র মারা যান।
এরপর ১৯৩৩ সালে রামকান্ত বিশ্বাসও মারা যান। সতীশ চন্দ্রের স্ত্রী সাবিত্রী বালা ওই জমির অধিকার পান। পরে ১৯৯৬ সালে তিনি জমিটি ড. মনোরঞ্জন মহুরীর কাছে বিক্রি করে দেন।
এই বিক্রয়কে জাল ও প্রতারণামূলক দাবি করে ১৯৯৮ সালে পটিয়ার আদালতে মামলা করেন রামকান্ত বিশ্বাসের মেয়ে শৌল বালা দাস। তিনি ওই সম্পত্তিতে নিজের উত্তরাধিকার স্বত্ব দাবি করেন।
সকল মামলা খারিজ
মামলার সাক্ষ্যপ্রমাণ ও সংশ্লিষ্ট আইন পর্যালোচনা করে ২০০০ সালের ২২ জুন পটিয়ার সাব-অর্ডিনেট জজ আদালত শৌল বালার মামলা খারিজ করে দেন।
এরপর তিনি চট্টগ্রামের প্রথম অতিরিক্ত জেলা জজ আদালতে আপিল করেন। ২০০৭ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর সেই আপিলও খারিজ হয়ে যায়।
অধস্তন আদালতের ওই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ২০০৮ সালে হাইকোর্টে দেওয়ানি রিভিশন আবেদন করেন বাদীপক্ষ। একই বছর হাইকোর্ট এ বিষয়ে রুল জারি করেন।
দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া শেষে গত ৯ জুলাই হাইকোর্ট সেই রুল খারিজ করে দেন। ফলে অধস্তন আদালতের রায় ও ডিক্রি বহাল থাকে।
রায়ের গুরুত্ব
হাইকোর্টের এই রায় থেকে দায়ভাগা আইনে উত্তরাধিকার নির্ধারণের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক স্পষ্ট হয়েছে—কোনো সম্পত্তিতে শুধু পারিবারিক সম্পর্ক থাকলেই উত্তরাধিকার দাবি করার অধিকার তৈরি হয় না। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির আইনগত উত্তরাধিকার এবং সম্পত্তিতে স্বার্থ থাকার বিষয়টিই মুখ্য।
বিশেষ করে বিধবার দখল ও হস্তান্তর করা সম্পত্তি নিয়ে বিরোধের ক্ষেত্রে কে আদালতে প্রশ্ন তোলার অধিকার রাখেন, সেই সীমাটিও এই রায়ে পরিষ্কার করেছেন হাইকোর্ট।
আদালতে রিভিশন আবেদনের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী সমীরণ দাস গুপ্ত। বিবাদীর পক্ষে ছিলেন আইনজীবী তৌফিক আনোয়ার চৌধুরী।

