বাংলাদেশের আদালতে মামলার চাপ ক্রমেই বাড়ছে। কিন্তু সেই অনুপাতে বাড়ছে না বিচারকের সংখ্যা। ফলে বিচারপ্রার্থীর অপেক্ষা দীর্ঘ হচ্ছে, আদালতের ওপর চাপ বাড়ছে এবং মামলাজট কমানোর প্রচেষ্টা বারবার কাঙ্ক্ষিত ফল থেকে দূরে থাকছে।
সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, দেশে বর্তমানে বিচারকের সংখ্যা ২ হাজার ২৩৭ জন। এর মধ্যে বিচারকাজে সক্রিয় রয়েছেন ১ হাজার ৮০০-এর কিছু বেশি। দেশের জনসংখ্যার তুলনায় এই সংখ্যা অত্যন্ত কম, প্রতি লাখ মানুষের বিপরীতে বিচারক প্রায় একজন।
এখানেই প্রশ্নটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ: মামলার সংখ্যা যদি বাড়তেই থাকে, তাহলে বিচারকের সংখ্যা সেই অনুপাতে বাড়ছে না কেন?
শুধু মামলা বেশি, নাকি বিচারিক সক্ষমতাই কম?
মামলাজটকে আমরা প্রায়ই একটি বিচ্ছিন্ন সমস্যা হিসেবে দেখি। কিন্তু বাস্তবে এটি একটি বৃহত্তর কাঠামোগত সমস্যার ফল।
একজন বিচারকের দায়িত্বে যখন বিপুলসংখ্যক মামলা থাকে, তখন প্রতিটি মামলার শুনানি, সাক্ষ্যগ্রহণ, নথি পর্যালোচনা ও রায় প্রস্তুতে প্রয়োজনীয় সময় দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। এর সঙ্গে যুক্ত হয় তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলে বিলম্ব, সাক্ষীর অনুপস্থিতি, আইনজীবীদের সময় আবেদন, নথি ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এবং আদালতের সীমিত অবকাঠামো।
ফলে একটি মামলা শেষ হতে যে সময় লাগার কথা, বাস্তবে তার চেয়ে অনেক বেশি সময় লেগে যায়।
অর্থাৎ মামলাজট শুধু আদালতের সমস্যা নয়; এটি বিচারব্যবস্থার সক্ষমতার সমস্যা।
১০ হাজার বিচারক কি সমাধান দিতে পারে?
আইনজীবী ও বিচারকদের একটি অংশ দেশে বিচারকের সংখ্যা অন্তত ১০ হাজারে উন্নীত করার পক্ষে মত দিয়েছেন।
এই প্রস্তাবের যৌক্তিকতা রয়েছে। কারণ বাংলাদেশের জনসংখ্যা, নতুন মামলা দায়েরের হার এবং বিচারাধীন মামলার বিশাল সংখ্যা বিবেচনায় বর্তমান বিচারকসংখ্যা দিয়ে দীর্ঘমেয়াদে চাপ সামাল দেওয়া কঠিন।
তবে শুধু ১০ হাজার বিচারক নিয়োগ করলেই সমস্যার সমাধান হবে এমন সরলীকরণও ঠিক হবে না।
বিচারক বাড়ানোর পাশাপাশি প্রয়োজন:
- নতুন আদালত ও বেঞ্চ;
- পর্যাপ্ত বিচারিক ও প্রশাসনিক জনবল;
- আধুনিক নথি ব্যবস্থাপনা;
- ডিজিটাল কেস ম্যানেজমেন্ট;
- দ্রুত তদন্ত ও প্রতিবেদন দাখিল;
- সাক্ষী ব্যবস্থাপনার উন্নতি;
- মামলা নিষ্পত্তির কার্যকর সময়সীমা;
- আদালতভিত্তিক মামলার চাপ অনুযায়ী বিচারক পদায়ন।
অর্থাৎ প্রয়োজন বিচারক বাড়ানোর পাশাপাশি পুরো বিচারিক ব্যবস্থার সক্ষমতা বৃদ্ধি।
১১ বছরেও বাস্তবায়ন হয়নি পরিকল্পনা
আরও উদ্বেগের জায়গা হলো, বিচারব্যবস্থার সক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয়ে সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় যে লক্ষ্য ও উদ্যোগ ছিল, তার বাস্তবায়ন দীর্ঘ সময়েও পূর্ণ হয়নি।
এটি রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনা বাস্তবায়নের একটি বড় প্রশ্ন সামনে আনে।
যদি একটি সরকার পাঁচ বছর মেয়াদি পরিকল্পনায় বিচারব্যবস্থার প্রয়োজন চিহ্নিত করে, তাহলে সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে বছরভিত্তিক বাজেট, বিচারক নিয়োগ, আদালত সম্প্রসারণ ও জনবল নিয়োগের ব্যবস্থা থাকার কথা।
কিন্তু পরিকল্পনা থাকলেও বাস্তবায়ন যদি দীর্ঘদিন পিছিয়ে থাকে, তাহলে প্রশ্ন ওঠে রাষ্ট্রের উন্নয়ন অগ্রাধিকারে বিচারব্যবস্থার অবস্থান আসলে কোথায়?
বিচার বিলম্বের মূল্য কে দেয়?
বিচার বিলম্বের সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হয় সাধারণ নাগরিককে।
একটি জমি নিয়ে মামলা বছরের পর বছর চললে সেই সম্পদ অর্থনৈতিকভাবে অচল হয়ে থাকতে পারে। ব্যবসায়িক বিরোধ নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রতা বিনিয়োগ ও ব্যবসায়িক আস্থায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
ফৌজদারি মামলায় পরিস্থিতি আরও স্পর্শকাতর। ভুক্তভোগী দ্রুত বিচার না পেলে তার রাষ্ট্র ও বিচারব্যবস্থার প্রতি আস্থা দুর্বল হতে পারে। অন্যদিকে অভিযুক্ত ব্যক্তিও বছরের পর বছর বিচারাধীন অবস্থায় থাকেন।
তাই ‘বিচার বিলম্বিত হওয়া’ মানে শুধু একটি মামলা দেরিতে শেষ হওয়া নয়; এর সঙ্গে নাগরিকের অধিকার, অর্থনীতি ও রাষ্ট্রের প্রতি আস্থাও জড়িত।
শুধু বিচারক নয়, প্রয়োজন ‘বিচারিক সক্ষমতা’
বাংলাদেশে এখন আলোচনাটি হওয়া উচিত শুধু ‘কতজন বিচারক প্রয়োজন?’
এর পাশাপাশি জানতে হবে
একজন বিচারকের ওপর গড়ে কত মামলা রয়েছে?
প্রতি বছর কত নতুন মামলা হচ্ছে?
একজন বিচারক বছরে গড়ে কত মামলা নিষ্পত্তি করছেন?
কোন ধরনের মামলা সবচেয়ে বেশি সময় নিচ্ছে?
কোন আদালতে মামলার চাপ সবচেয়ে বেশি?
এই তথ্যগুলো নিয়মিত বিশ্লেষণ করে বিচারক নিয়োগ ও পদায়নের একটি বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থা তৈরি করা প্রয়োজন।
একটি জেলার আদালতে যদি মামলার চাপ অন্য জেলার তুলনায় দ্বিগুণ হয়, তাহলে শুধু সমান সংখ্যক বিচারক পদায়ন করে সমস্যার সমাধান হবে না।
ডিজিটাল ব্যবস্থাপনাও হতে পারে বড় সমাধান
মামলার নথি, শুনানির তারিখ, সাক্ষ্যগ্রহণ, আদেশ ও রায়ের তথ্য যদি একটি সমন্বিত ডিজিটাল ব্যবস্থার আওতায় আনা যায়, তাহলে মামলার ব্যবস্থাপনা অনেক বেশি কার্যকর হতে পারে।
কোন মামলায় কতদিন ধরে কোনো কার্যক্রম হয়নি, কোন মামলায় সাক্ষ্যগ্রহণ বারবার পিছিয়েছে কিংবা কোন আদালতে মামলার অস্বাভাবিক চাপ – এসব তথ্য ড্যাশবোর্ডের মাধ্যমে পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব।
এর ফলে বিচার প্রশাসনে জবাবদিহিও বাড়তে পারে।
এখন কী করা দরকার?
বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থার জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদি ‘Judicial Capacity Expansion Plan’ প্রয়োজন।
এর আওতায় একসঙ্গে পাঁচটি বিষয়ে কাজ করা যেতে পারে
১. বিচারকের সংখ্যা পর্যায়ক্রমে বৃদ্ধি:
মামলার চাপ ও জনসংখ্যার অনুপাতে বিচারকের সংখ্যা নির্ধারণ।
২. নতুন আদালত ও বেঞ্চ:
যেসব এলাকায় মামলার চাপ বেশি, সেখানে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে আদালত সম্প্রসারণ।
৩. সহায়ক জনবল বৃদ্ধি:
বিচারক নিয়োগের পাশাপাশি আদালতের কর্মকর্তা-কর্মচারী, গবেষণা ও প্রশাসনিক সক্ষমতা বৃদ্ধি।
৪. ডিজিটাল কেস ম্যানেজমেন্ট:
মামলার প্রতিটি ধাপের তথ্য ডিজিটালভাবে সংরক্ষণ ও পর্যবেক্ষণ।
৫. নিয়মিত কর্মদক্ষতা মূল্যায়ন:
মামলা নিষ্পত্তির হার, মামলার বয়স এবং বিচারিক সক্ষমতার তথ্য বিশ্লেষণ করে নীতিনির্ধারণ।
শেষ প্রশ্নটি নাগরিকের
বিচারব্যবস্থার মূল উদ্দেশ্য শুধু আদালত পরিচালনা নয়, নাগরিককে সময়মতো ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা।
যে নাগরিক বছরের পর বছর আদালতে ঘুরছেন, তার কাছে বিচারব্যবস্থার সবচেয়ে বড় সাফল্য হলো একটি ন্যায়সংগত সিদ্ধান্ত যা তিনি সময়মতো পান।
তাই বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থার সংস্কারের আলোচনায় এখন শুধু মামলার সংখ্যা কমানোর কথা বললে হবে না। দেখতে হবে, মামলার তুলনায় বিচারিক সক্ষমতা কতটা।
কারণ মামলা বাড়তেই পারে। জনসংখ্যা বাড়বে, অর্থনীতি বড় হবে, মানুষের অধিকার সম্পর্কে সচেতনতা বাড়বে, ফলে বিরোধও তৈরি হবে।
কিন্তু সেই বিরোধ দ্রুত ও ন্যায়সংগতভাবে নিষ্পত্তি করার মতো সক্ষমতা রাষ্ট্র তৈরি করতে না পারলে আইনের শাসন কাগজে থাকবে, বাস্তবে নয়।
প্রশ্ন তাই একটাই – মামলা যখন বাড়ছে, তখন বিচারক বাড়ছে না কেন? আর এই প্রশ্নের উত্তর না খুঁজে কি সত্যিই বিচারব্যবস্থার মামলাজট কমানো সম্ভব?

