ট্রাম্প প্রশাসন ধারাবাহিকভাবে নিজেদের আন্তর্জাতিক আইনের ঊর্ধ্বে বলে মনে করেছে। শুধু তারা দাবি করছে না যে আন্তর্জাতিক আইন যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়, তারা আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) কর্মকর্তাদের ওপর নিষেধাজ্ঞাও দিয়েছে।
এই অবস্থানের মাধ্যমে ট্রাম্প প্রশাসন একটি বিপজ্জনক দৃষ্টান্ত তৈরি করছে।
ছয় মাস আগে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করে, যা আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞদের মতে আন্তর্জাতিক আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন ছিল। যুক্তরাষ্ট্র জাতিসংঘ সনদের ২ নম্বর অনুচ্ছেদে থাকা বলপ্রয়োগ বা বলপ্রয়োগের হুমকি নিষিদ্ধ করার মৌলিক বিধান লঙ্ঘন করেছে।
এরপর যুক্তরাষ্ট্র যেভাবে যুদ্ধ চালিয়েছে, সেটিও এখন প্রশ্নের মুখে। ইরানে তাদের সামরিক কর্মকাণ্ড নজরদারি ও তদন্তের আওতায় আনতে হবে। প্রমাণ পাওয়া গেলে বিচারও করতে হবে। আন্তর্জাতিক আইনকে দুর্বল করার চেষ্টার বিরুদ্ধে এখনই সোচ্চার হওয়ার সময়।
যুদ্ধের আইন
সংঘাতের ক্ষেত্রে যে আইন প্রযোজ্য, তাকে আন্তর্জাতিক মানবিক আইন বলা হয়। কখনো কখনো একে শুধু যুদ্ধের আইনও বলা হয়।
আন্তর্জাতিক হিউম্যানেটেরিয়ান আইনের উদ্দেশ্য হলো যুদ্ধের পদ্ধতি ও উপায় সীমিত করা, যাতে যোদ্ধা ও বেসামরিক মানুষের অপ্রয়োজনীয় দুর্ভোগ প্রতিরোধ করা যায়। এসব আইনের অনেক, তবে সব নয়, লঙ্ঘনকে যুদ্ধাপরাধ বলা হয়।
এই আইনের মূল ধারণা হলো যুদ্ধকে মানবিক করা। খ্রিষ্টপূর্ব ৫০০ সালেরও আগে সান জু মনে করতেন, একটি রাষ্ট্র ও তার সেনাবাহিনীকে সম্পূর্ণ অক্ষত অবস্থায় দখল করা তাদের ধ্বংস করার চেয়ে ভালো।
এই কারণে আন্তর্জাতিক মানবিক আইন বেসামরিক মানুষ ও বেসামরিক স্থাপনার ওপর হামলা নিষিদ্ধ করে। বেসামরিক ব্যক্তি ও যোদ্ধা এবং বেসামরিক ও সামরিক স্থাপনার মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য করা হয়েছে।
বেসামরিক স্থাপনার মধ্যে রয়েছে স্কুল, হাসপাতাল, সেতু, বিদ্যুৎকেন্দ্র, কৃষি অবকাঠামো, বাঁধ এবং পানি পরিশোধন কেন্দ্র।
সামরিক বাহিনীকে বেসামরিক মানুষের মৃত্যু, আহত হওয়া এবং বেসামরিক স্থাপনার ক্ষতি কমাতে সম্ভব সব ধরনের সতর্কতা গ্রহণ করতে হয়।
যে স্থাপনার বেসামরিক ও সামরিক উভয় ধরনের ব্যবহার রয়েছে, তাকে বৈধ সামরিক লক্ষ্য হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে। তবে শর্ত হলো, সেটিকে অবশ্যই সামরিক কর্মকাণ্ডে ‘কার্যকর অবদান’ রাখতে হবে এবং সেটি ধ্বংস বা অকার্যকর করলে অবশ্যই ‘নিশ্চিত সামরিক সুবিধা’ পাওয়া যেতে হবে।
কোনো দ্বৈত ব্যবহারযোগ্য স্থাপনায় হামলা নিষিদ্ধ, যদি এর ক্ষতিসাধনে বেসামরিক মানুষের ওপর গুরুতর প্রভাব ফেলে।
উদাহরণ হিসেবে, একটি সেতুর সামরিক ব্যবহার থাকতে পারে যদি কোনো সেনাবাহিনী আক্রমণ চালানোর জন্য সেটি ব্যবহার করে। তবে একটি সেতু স্বভাবতই বেসামরিক স্থাপনা এবং এটি ক্ষতিগ্রস্ত হলে বেসামরিক মানুষের ওপর উল্লেখযোগ্য প্রভাব পড়তে পারে। তাই একটি সেতুতে হামলা সম্ভবত যুদ্ধাপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
প্রকৃতপক্ষে, আইনে বলা হয়েছে, কোনো স্থাপনা নিয়ে সন্দেহ থাকলে সেটিকে সুরক্ষিত বেসামরিক স্থাপনা হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।
কোনো বাধা ছাড়াই যুদ্ধ
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বারবার সেতু, বিদ্যুৎকেন্দ্র, তেলকূপ ও লবণাক্ত পানি শোধনাগার ধ্বংসের হুমকি দিয়েছেন। এই হুমকি স্পষ্ট করে দেয় যে তিনি এই আইন ভাঙতে এবং যুদ্ধাপরাধ করতেও প্রস্তুত। এমনকি তিনি ইরানের পুরো সভ্যতা ধ্বংস করার হুমকিও দিয়েছেন।
প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথও একই সুরে কথা বলেছেন। তিনি মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রের অধিকার আছে আইনের বাঁধন ছাড়াই যুদ্ধ করার। তিনি এই আইনি নিয়মকানুনকে বলেছেন বোকামি।
হেগসেথ আরও এগিয়ে গিয়ে বলেছেন, শত্রুদের জন্য কোনো ছাড় নেই, কোনো দয়া নেই।
এখানে ছাড় দেওয়া মানে হলো, যে যোদ্ধা আর লড়াইয়ে অংশ নিচ্ছেন না, যেমন আহত কেউ, তার ওপর হামলা না করা। কাউকে এই ছাড় না দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া যুদ্ধের আইনে সরাসরি নিষিদ্ধ। এই আইন ভাঙাও যুদ্ধাপরাধ।
মিনাবের স্কুল হামলায় নিহত ১২০ শিশু
গত ছয় মাসে সংঘটিত কয়েকটি নির্দিষ্ট হামলা দেখা যাক।
যুদ্ধ শুরুর দিনই দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর মিনাবে একটি মেয়েদের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বোমা হামলা চালানো হয়। সেদিন ছিল শনিবার, ইরানের শিশুদের জন্য স্কুলের দিন। এতে অন্তত ১৫৬ জন নিহত হয়, যার মধ্যে ১২০ জন শিশু।
একটি স্কুল নিঃসন্দেহে একটি বেসামরিক স্থাপনা। যেহেতু সেখানে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা উপস্থিত ছিল, তাই এটি বেসামরিক মানুষের ওপরও হামলা ছিল। এর অর্থ হলো, প্রাথমিকভাবে দেখলে এই হামলা বেআইনি ছিল।
২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের মিনাবে মেয়েদের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে হামলার পর উদ্ধারকর্মীরা ধ্বংসস্তূপে তল্লাশি চালানোর সময় এক ব্যক্তি একটি শিশুর স্কুলব্যাগ হাতে ধরে আছেন। মেহর নিউজ এজেন্সি/এপি।
হামলার পর সংগৃহীত প্রমাণও ইঙ্গিত দেয় যে বোমা হামলায় একটি নির্দেশনানির্ভর টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রভাণ্ডারে এসব ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে; ইরানের নেই।
স্কুলটি ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) ভবনের পাশে অবস্থিত ছিল, যেগুলোতেও হামলা চালানো হয়। এর অর্থ হতে পারে, ভুল লক্ষ্য নির্ধারণের কারণে স্কুলে বোমা হামলা একটি দুঃখজনক ভুল ছিল।
ট্রাম্প প্রশাসন হামলার দায় স্বীকার করেনি। তবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রাথমিক এক মূল্যায়নে বলা হয়েছিল, হামলার পেছনে মার্কিন বাহিনী ‘সম্ভবত’ দায়ী এবং সেখানে পুরোনো লক্ষ্যসংক্রান্ত তথ্য ব্যবহারের কথা বলা হয়েছিল।
তবে যুক্তরাষ্ট্র এখনো একটি পূর্ণাঙ্গ গোয়েন্দা মূল্যায়ন করেনি বলে জানা যায়। একই সঙ্গে তারা এই ঘটনার পূর্ণ তদন্তও প্রকাশ করেনি।
যুক্তরাষ্ট্র দাবি করতে পারে, তারা আইআরজিসি ভবনে হামলা করতে গিয়ে ভুলবশত স্কুলে আঘাত হানে। এই যুক্তিতে তারা নিজেদের দায়মুক্ত বলেও দাবি করতে পারে। কিন্তু বাস্তবে মনে হচ্ছে, বেসামরিক মানুষ রক্ষায় আইন যে সতর্কতা ও লক্ষ্য যাচাই চায়, যুক্তরাষ্ট্র তা মানেনি। এটিও যুদ্ধের আইনের স্পষ্ট লঙ্ঘন।
পানি স্থাপনায় হামলা
জুন মাসে হরমুজ প্রণালির কাছে হামলায় দুটি পানি সংরক্ষণাগার ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এসব স্থাপনা ২০ হাজার বেসামরিক মানুষের জন্য পানি সরবরাহ করত।
যুক্তরাষ্ট্র ইচ্ছাকৃতভাবে ওই জলাধারগুলোতে হামলা করেছিল কি না, তা স্পষ্ট নয়। তবে হামলাটি ইচ্ছাকৃত ছিল বলে কিছু লক্ষণ রয়েছে। স্বাধীন বিশেষজ্ঞরা হামলায় ব্যবহৃত অস্ত্রটিকে নির্ভুল লক্ষ্যভেদী বোমা হিসেবে বর্ণনা করেছেন এবং বলেছেন, পানি স্থাপনাগুলোর দুর্গম অবস্থান একটি নির্ভুল লক্ষ্যভেদ হামলার ইঙ্গিত দেয়। এমন না যে স্থাপনা গুলা অন্য সামরিক স্থাপনার কাছে ছিলো।
যুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান উভয়েই লবণাক্ত পানি শোধনাগারেও হামলা চালিয়েছে।
লবণাক্ত পানি শোধনাগার এবং পানি সংরক্ষণাগার ওই অঞ্চলের বেসামরিক মানুষের জন্য সুপেয় পানি সরবরাহে গুরুত্বপূর্ণ। এসব হামলা আরও গুরুতর হয়ে ওঠে কারণ, মধ্যপ্রাচ্য অত্যন্ত শুষ্ক একটি অঞ্চল, যেখানে প্রায়ই পানির সংকট দেখা দেয়।
তাই এসব বেসামরিক স্থাপনায় হামলা মানুষের পানির প্রাপ্যতার ওপর গুরুতর প্রভাব ফেলে। সে হিসেবে এটি যুদ্ধাপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
যুদ্ধাপরাধের বিচার
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান যদি নিজেদের সামরিক সদস্যদের বিরুদ্ধে তদন্ত ও বিচার না করে, তাহলে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) কি এগিয়ে আসতে পারে?
দুর্ভাগ্যজনকভাবে, এই যুদ্ধে আইসিসির কোনো এখতিয়ার নেই, কারণ যুক্তরাষ্ট্র বা ইরান কেউই এই আদালতের সদস্য নয়। এর অর্থ হলো, বাকি থাকা একমাত্র উপায় হলো অন্য কোনো দেশ নিজ দেশের আদালতে তদন্ত করে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিচার করা। তবে এ ধরনের মামলা জটিল এবং এর জন্য বিদেশে বিচারের মুখোমুখি করার উদ্দেশ্যে আমেরিকান নাগরিকদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করতে হবে, যা অর্জন করা অত্যন্ত কঠিন এবং রাজনৈতিকভাবে অসম্ভাব্য।
এই কারণেই এই যুদ্ধে সামরিক কর্মকাণ্ডের পূর্ণাঙ্গ তদন্ত এবং বিচার যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান উভয় দেশেই হওয়া উচিত। যারা অপরাধ করেছে তাদের বিচারের আওতায় আনার জন্য জবাবদিহি গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধ করতেও এটি সহায়তা করবে।

