অভিনেত্রী তানজিন তিশার বিরুদ্ধে করা প্রতারণা, বিশ্বাসভঙ্গ ও হুমকির মামলায় অভিযোগের সত্যতা পায়নি পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। তদন্ত শেষে মামলাটির অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি উল্লেখ করে আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করেছেন সংস্থাটির উপপরিদর্শক মো. জাহাঙ্গীর আলম।
তবে পিবিআইয়ের এই প্রতিবেদনে সন্তুষ্ট নন মামলার বাদী আয়েশাহ আনুম ফারযাহ সানায়া চৌধুরী। তিনি জানিয়েছেন, আইনজীবীর সঙ্গে আলোচনা করে তদন্ত প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে আদালতে নারাজির আবেদন করবেন।
আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন
নথি অনুযায়ী, চলতি বছরের ২৫ মে ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে তদন্ত প্রতিবেদনটি দাখিল করা হয়। মামলাটির অভিযোগ ও তদন্তের ফল নিয়ে আগামী ৯ সেপ্টেম্বর ঢাকার অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. সেফাতউল্লাহর আদালতে শুনানির দিন ধার্য রয়েছে।
এর আগে ২০২৫ সালের ২৭ নভেম্বর ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতে তানজিন তিশার বিরুদ্ধে মামলাটি করেন ফ্যাশন ডিজাইনার আয়েশাহ আনুম ফারযাহ সানায়া চৌধুরী।
বাদীপক্ষের অভিযোগ ছিল, তিশা একটি শাড়ি নেওয়ার পর তা ফেরত না দিয়ে প্রতারণা ও বিশ্বাসভঙ্গ করেছেন। একই সঙ্গে শাড়িটি ফেরত চাওয়াকে কেন্দ্র করে তাঁকে হুমকি দেওয়ার অভিযোগও আনা হয়।
মামলার পর আদালতের নির্দেশে পিবিআই তদন্ত শুরু করে।
শাড়ি নেওয়া থেকে বিরোধ
মামলার নথি ও তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাদী একজন ফ্যাশন ডিজাইনার এবং তাঁর নিজস্ব ফ্যাশন হাউজ ও স্টুডিও রয়েছে। তানজিন তিশার সঙ্গে আগে থেকেই তাঁর পরিচয় ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ছিল।
২০২৪ সালের ১৩ ডিসেম্বর একটি অনুষ্ঠানে পরার জন্য তিশা তাঁর সাবেক চালকের মাধ্যমে বাদীর কাছ থেকে একটি শাড়ি নেন। বাদীপক্ষের দাবি, শাড়িটির মূল্য ছিল ৭৫ হাজার টাকা এবং অনুষ্ঠান শেষে পরদিন সেটি ফেরত দেওয়ার কথা ছিল।
তবে শাড়িটি ফেরত না পাওয়ায় বাদী পরবর্তী সময়ে তিশার সঙ্গে যোগাযোগ করেন।
এজাহারে বাদীপক্ষ অভিযোগ করেছে, ২০২৪ সালের ১৭ ডিসেম্বর শাড়ি ফেরত চাওয়াকে কেন্দ্র করে তিশা তাঁকে গালিগালাজ ও হত্যার হুমকি দেন। পরবর্তী সময়ে ২০২৫ সালের ১৩ মার্চ ও ১৮ মার্চ বিভিন্ন অনুষ্ঠানে দেখা হলেও শাড়িটি ফেরত দেওয়ার বিষয়ে তিশার সঙ্গে কথা হয় বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।
তদন্তে যা পেয়েছে পিবিআই
তদন্ত প্রতিবেদনে পিবিআই বলেছে, বাদী ও তানজিন তিশার মধ্যে আগে থেকেই বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ছিল। তিশা এর আগেও বাদীর কাছ থেকে একাধিক শাড়ি নিয়ে ব্যবহার করার পর ফেরত দিয়েছেন এবং এ জন্য কোনো অর্থ নেননি।
তদন্তে আরও উঠে এসেছে, ২০২৫ সালের ৫ নভেম্বর বাদী আবার শাড়িটি ফেরত চেয়ে তিশাকে বার্তা পাঠান। জবাবে তিশা প্রথমে কোন শাড়ির কথা বলা হচ্ছে তা জানতে চান। পরে শাড়িটির ছবি পাঠানো হলে তিনি জানান, বিষয়টি তাঁর মনে নেই এবং খুঁজে দেখে জানাবেন।
তিশা তদন্তকারীদের জানিয়েছেন, ওই সময় তাঁর আগের চালক শাড়িটি ফেরত না দিয়েই চাকরি ছেড়ে অন্যত্র চলে যান। পরে বিভিন্নভাবে বাদীর কাছ থেকে শাড়িটি ফেরত দেওয়ার ঠিকানা জানার চেষ্টা করেও তিনি তা পাননি।
পরবর্তীতে মামলার বিষয়টি জানার পর ২০২৬ সালের ৩১ মার্চ ডাকযোগে শাড়িটি বাদীর কাছে পাঠানো হয় বলে তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতারণা ও বিশ্বাসভঙ্গের অভিযোগে প্রমাণ মেলেনি
পিবিআইয়ের তদন্ত কর্মকর্তা প্রতিবেদনে বলেছেন, তদন্তের সময় বাদীকে মামলার অভিযোগের পক্ষে প্রয়োজনীয় দালিলিক প্রমাণ দিতে বলা হলেও তিনি তা উপস্থাপন করেননি।
অন্যদিকে তানজিন তিশা শাড়িটি ফেরত পাঠিয়েছেন—এ বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে তদন্ত কর্মকর্তা প্রতারণা ও বিশ্বাসভঙ্গের অভিযোগের সত্যতা পাননি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছেন।
হুমকির অভিযোগের ক্ষেত্রেও একই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে তদন্ত সংস্থা। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের ১০ নভেম্বর তিশার পাঠানো বার্তার শেষাংশে শাড়িটি ফেরত পাঠানোর ঠিকানা জানতে চাওয়া এবং বাদীর সুন্দর জীবন কামনা করার বিষয়টি ছিল। এ কারণে বাদীকে হুমকি দেওয়ার অভিযোগও তদন্তে প্রমাণিত হয়নি বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
সব মিলিয়ে বাদী ও আসামিকে জিজ্ঞাসাবাদ এবং পাওয়া তথ্য-প্রমাণ পর্যালোচনা করে মামলায় আনা অভিযোগের বিষয়ে অপরাধ প্রমাণিত হয়নি বলে সিদ্ধান্ত দিয়েছে পিবিআই।
প্রতিবেদনে ক্ষুব্ধ বাদীপক্ষ
তবে তদন্ত সংস্থার এই সিদ্ধান্ত মেনে নিতে পারছেন না মামলার বাদী আয়েশাহ আনুম ফারযাহ সানায়া চৌধুরী।
তাঁর দাবি, মামলার তদন্তের সময় তিনি সাক্ষী, হুমকির অডিও রেকর্ডিংসহ প্রয়োজনীয় প্রমাণ পুলিশের কাছে দিয়েছেন। এরপরও কোনো কারণ উল্লেখ না করে অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি—এমন প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।
বাদীর ভাষ্য, এই প্রতিবেদনের কারণে তিনি ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। তাই আইনজীবীর সঙ্গে পরামর্শ করে পিবিআইয়ের তদন্ত প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে আদালতে নারাজির আবেদন করবেন তিনি।
বাদী আরও দাবি করেছেন, এর আগে তানজিন তিশার বিরুদ্ধে শাড়ি সংক্রান্ত আরেকটি মামলায় ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ তদন্ত করে অভিযোগের সত্যতা পেয়েছিল।
এখন আদালতের সিদ্ধান্ত
পিবিআই তদন্তে অভিযোগের সত্যতা না পাওয়ায় মামলাটির ভবিষ্যৎ এখন আদালতের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে। আগামী ৯ সেপ্টেম্বর তদন্ত প্রতিবেদনের ওপর শুনানি হবে।
সেদিন আদালত পিবিআইয়ের প্রতিবেদন গ্রহণ করবেন, নাকি বাদীপক্ষের নারাজির আবেদন বিবেচনা করে নতুন করে তদন্তের নির্দেশ দেবেন—সেটিই এখন দেখার বিষয়।

