সাভারের রানা প্লাজা ধসের ঘটনায় দায়ের হওয়া দুর্নীতি মামলার রায় ঘোষণা আরও একবার পিছিয়ে গেল। নকশাবহির্ভূতভাবে ভবন নির্মাণে অবহেলার অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশনের করা এই মামলায় ভবন-মালিক সোহেল রানাসহ আট আসামির বিরুদ্ধে রায় ঘোষণার জন্য দিন ধার্য থাকলেও তা আবার যুক্তিতর্কের প্রয়োজনীয়তা দেখিয়ে উত্তোলন করে নিয়েছেন আদালত।
মঙ্গলবার ঢাকার বিভাগীয় বিশেষ জজ আদালতে মামলাটির রায় ঘোষণার দিন ধার্য ছিল। তবে বিচারক নিজ উদ্যোগেই মামলাটি রায়ের তালিকা থেকে সরিয়ে অতিরিক্ত যুক্তিতর্কের শুনানির জন্য আগামী ৬ অক্টোবর নতুন তারিখ নির্ধারণ করেন। আদালতের সংশ্লিষ্ট বেঞ্চ সহকারী বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, কোনো পক্ষের আবেদনের ভিত্তিতে নয়, বরং বিচারক স্বতঃপ্রণোদিত হয়েই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
মামলার অন্য আসামিদের মধ্যে রয়েছেন সাভার পৌরসভার সাবেক মেয়র, পৌরসভার সাবেক প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, একজন নির্বাহী প্রকৌশলী, সাবেক সহকারী প্রকৌশলী, সাবেক উপ-সহকারী প্রকৌশলী, সাবেক টাউন প্ল্যানার এবং একজন লাইসেন্স পরিদর্শক। এদের মধ্যে সোহেল রানা এই মামলায় জামিনে থাকলেও পৃথক এক হত্যা মামলায় বর্তমানে কারাগারে বন্দী রয়েছেন। শুনানির দিন কারাগার থেকেই তাকে আদালতে হাজির করা হয়। আসামিদের মধ্যে দুজন শুরু থেকেই পলাতক, বাকিরা জামিনে থেকে নিয়মিত হাজিরা দিচ্ছেন। বিচার চলাকালীন সোহেল রানার বাবা-মায়ের মৃত্যু হওয়ায় তাদের এই মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।
২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল সাভার বাসস্ট্যান্ড-সংলগ্ন রানা প্লাজা ভবনটি ধসে পড়লে ঘটে দেশের ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ শিল্প দুর্ঘটনা, যাতে প্রাণ হারান এক হাজার একশর বেশি মানুষ এবং আহত হন দেড় হাজারেরও বেশি শ্রমিক। ঘটনার পরপরই ভবন নির্মাণে অনিয়মের অভিযোগে অনুসন্ধানে নামে দুর্নীতি দমন কমিশন।
তদন্তে জানা যায়, মূলত সাতটি তলার একটি শপিং কমপ্লেক্স নির্মাণের অনুমতি নিয়ে পরবর্তীতে তার ওপর আরও কয়েকটি তলা নির্মাণের অনুমোদন নেওয়া হয়েছিল স্থানীয় পৌরসভা থেকে। প্রথমে বাণিজ্যিক কমপ্লেক্স হিসেবে অনুমোদিত হলেও পরবর্তীতে সেখানে একাধিক পোশাক কারখানা স্থাপনের অনুমতি দেওয়া হয়, যা ছিল নিয়মবহির্ভূত।
২০১৪ সালের মাঝামাঝি সময়ে সতেরো জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন দুদকের একজন উপ-সহকারী পরিচালক। যেহেতু ভবনটি নথিপত্রে সোহেল রানার বাবার নামে নিবন্ধিত ছিল, তাই প্রাথমিকভাবে তার বাবা-মাসহ অন্যদের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছিল। পরবর্তী তদন্তে সোহেল রানাই ভবনটির প্রকৃত তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে প্রমাণিত হলে তাকেও অভিযোগপত্রে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ২০১৭ সালের মে মাসে দশজন আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচারকাজ শুরু হয়, তখন আটজনকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছিল। বিচার চলাকালে মোট বিশজন সাক্ষীর মধ্যে ঊনিশজন আদালতে সাক্ষ্য দেন।
দুর্ঘটনার পরপরই ধ্বংসস্তূপ থেকে উদ্ধার করা হয় এগারোশর বেশি মরদেহ, পরবর্তীতে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরও প্রায় বিশজনের মৃত্যু হয়। জীবিত উদ্ধার করা হয় প্রায় আড়াই হাজার মানুষকে, যাদের মধ্যে দেড় হাজারের বেশি ছিলেন আহত—এদের মধ্যে অন্তত আটাত্তরজন স্থায়ীভাবে পঙ্গুত্ব বরণ করেন। উদ্ধার হওয়া মরদেহের সিংহভাগ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা সম্ভব হলেও, পরিচয় শনাক্ত না হওয়া প্রায় তিনশর কাছাকাছি মরদেহ ডিএনএ নমুনা সংরক্ষণ করে জুরাইন কবরস্থানে দাফন করা হয়। ঘটনার পাঁচদিনের মাথায় ভারতে পালানোর চেষ্টাকালে বেনাপোল সীমান্ত থেকে সোহেল রানাকে গ্রেপ্তার করে র্যাব, এরপর থেকে তিনি কারাগারেই আছেন।
দুর্ঘটনার এক যুগেরও বেশি সময় পার হলেও এখনো এই মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হওয়া নিয়ে ভুক্তভোগী পরিবার ও শ্রমিক অধিকারকর্মীদের মধ্যে দীর্ঘদিনের হতাশা রয়েছে। বারবার শুনানি ও রায়ের তারিখ পিছিয়ে যাওয়ার এই ধারাবাহিকতা বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।

