চেক ডিজঅনার সংক্রান্ত মামলায় গুরুত্বপূর্ণ একটি পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন হাইকোর্ট। আদালত জানিয়েছেন, চেকে উল্লিখিত পুরো অর্থ পরিশোধ করা হলে এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে সমঝোতা সম্পন্ন হলে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে কারাগারে পাঠানো বা তার কারাদণ্ড বহাল রাখার প্রয়োজন নেই। রায়ে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, এই ধরনের মামলার মূল লক্ষ্য কাউকে শাস্তি দেওয়া নয়, বরং পাওনা অর্থ আদায় নিশ্চিত করাই এর প্রকৃত উদ্দেশ্য।
নেগোশিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্টস আইনের একটি নির্দিষ্ট ধারায় দায়ের হওয়া একটি ক্রিমিনাল আপিলের নিষ্পত্তি করতে গিয়ে সংশ্লিষ্ট বিচারপতির একক হাইকোর্ট বেঞ্চ গত ৬ সেপ্টেম্বর এই রায় দেন। রায় ঘোষণার সময় আবেদনকারীর পক্ষে কোনো আইনজীবী উপস্থিত ছিলেন না, তবে বিবাদী প্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা আদালতে হাজির ছিলেন।
এই রায়ের মধ্য দিয়ে চেকের অর্থ ও পাওনা সম্পূর্ণভাবে মিটিয়ে দেওয়া এবং আপসনামা সম্পাদনের ভিত্তিতে দণ্ডিত ব্যক্তির এক বছরের কারাদণ্ড বাতিল করা হয়েছে। পাশাপাশি নিম্ন আদালতে আপিলের পূর্বে জমা দেওয়া চৌদ্দ হাজার একশ টাকা সংশ্লিষ্ট আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে ফিরিয়ে দেওয়ার নির্দেশও দিয়েছেন আদালত।
সিরাজগঞ্জ জেলার এক বাসিন্দা একটি মাইক্রোফাইন্যান্স প্রতিষ্ঠান থেকে পঞ্চাশ হাজার টাকা ঋণ গ্রহণ করেছিলেন। এর মধ্যে তিনি একুশ হাজার আটশ পঁচাত্তর টাকা পরিশোধ করলেও বাকি আটাশ হাজার একশ পঁচিশ টাকার বিপরীতে একটি ব্যাংক চেক প্রদান করেন। ২০০৯ সালের জানুয়ারিতে চেকটি নগদায়নের জন্য জমা দেওয়া হলে পর্যাপ্ত তহবিল না থাকার কারণে তা ফেরত আসে। আইনি নোটিশ পাঠানোর পরও পাওনা পরিশোধ না হওয়ায় ওই বছরই একটি ফৌজদারি মামলা দায়ের করা হয়।
মামলাটি পরবর্তীতে বিচারের জন্য জেলা দায়রা জজ আদালতে স্থানান্তরিত হয়। বিচার চলাকালে আসামি পলাতক থাকায় তাঁর অনুপস্থিতিতেই বিচারিক কার্যক্রম সম্পন্ন হয়, এবং ২০১৩ সালে দেওয়া রায়ে তাঁকে এক বছরের সশ্রম কারাদণ্ড ও চুরাশি হাজার তিনশ পঁচাত্তর টাকা জরিমানা করা হয়।
এই রায়ের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে আপিল করে জামিনের আবেদন জানান দণ্ডিত ব্যক্তি, এবং ২০১৮ সালে তাঁকে এক বছরের জামিন দেওয়া হয়। আপিল চলাকালীন সময়ে তিনি চেকের অবশিষ্ট পুরো অর্থ সংশ্লিষ্ট আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে পরিশোধ করেন এবং চলতি বছরের জুলাই মাসে উভয় পক্ষের মধ্যে একটি আপসনামা স্বাক্ষরিত হয়।
চলতি মাসের শুরুতে দেওয়া রায়ে হাইকোর্ট মামলার সার্বিক প্রেক্ষাপট, অপরাধের প্রকৃতি এবং আসামি কর্তৃক চেকের সম্পূর্ণ অর্থ পরিশোধের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে দোষী সাব্যস্তকরণ বহাল রাখলেও কারাদণ্ড রহিত করেন। একই সঙ্গে জরিমানার পরিমাণ কমিয়ে চেকের অঙ্কের সমান, অর্থাৎ আটাশ হাজার একশ পঁচিশ টাকা নির্ধারণ করা হয়। ইতিমধ্যে বিচারিক আদালতে জমা দেওয়া চৌদ্দ হাজার একশ টাকা যথাযথ শনাক্তকরণ সাপেক্ষে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে দ্রুত বুঝিয়ে দেওয়ার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট আর্থিক প্রতিষ্ঠানের পক্ষে থাকা একজন আইনজীবী এই রায়কে স্বাগত জানিয়ে বলেন, তাঁদের মূল উদ্দেশ্য ছিল পাওনা অর্থ আদায় করা, কাউকে শাস্তি দেওয়া নয়। আসামি সম্পূর্ণ অর্থ পরিশোধ করে আপসনামায় সই করায় তাঁরা কারাদণ্ড মওকুফের বিষয়ে ইতিবাচক অবস্থান নিয়েছিলেন এবং আদালতের এই সিদ্ধান্তকে ন্যায়সংগত বলে মনে করেন।
বিশ্লেষকদের দৃষ্টিতে, এই রায় চেক ডিজ অনার সংক্রান্ত মামলাগুলোর ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত স্থাপন করল। এটি স্পষ্ট করে দেয় যে, ফৌজদারি প্রক্রিয়ার মূল উদ্দেশ্য যেখানে আর্থিক ক্ষতিপূরণ আদায়, সেখানে পাওনা সম্পূর্ণ মিটিয়ে দিলে ও পক্ষগুলোর মধ্যে প্রকৃত সমঝোতা হলে দণ্ড লঘু করার সুযোগ থাকা উচিত। এতে একদিকে যেমন পাওনাদারের আর্থিক স্বার্থ রক্ষা পায়, তেমনি অন্যদিকে অহেতুক কারাবাসের বোঝা থেকেও রেহাই পান অভিযুক্ত ব্যক্তি।

