বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের প্রথম হিন্দু নারী বিচারপতি হিসেবে কৃষ্ণা দেবনাথের নাম দেশের বিচারিক ইতিহাসে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ৪১ বছরের দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। সে সাথে একাধিক আলোচিত মামলার রায়ে অংশ নিয়েছেন।
পারিবারিক পটভূমি ও শিক্ষাজীবন
১৯৫৫ সালের ১০ অক্টোবর কৃষ্ণা দেবনাথ জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা দীনেশ চন্দ্র দেবনাথ ছিলেন একজন বিচারক এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক। মা বেণু দেবনাথ। তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এলএলবি ও এলএলএম ডিগ্রি অর্জন করেন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকেও আইনবিদ্যায় পড়াশোনা সম্পন্ন করেন।
দুই ভাই ও তিন বোনের সংসারে বাবার বদলির চাকরির সুবাদে কৃষ্ণা দেবনাথকে শৈশবে বিভিন্ন জেলায় থাকতে হয়েছে। ছোটবেলা থেকেই এজলাসের পাশে বসে বাবার বিচারকাজ দেখতেন তিনি, আর সেখান থেকেই বিচারক হওয়ার স্বপ্ন দেখা শুরু। এই স্বপ্নপূরণের পথে সবসময় পাশে ছিলেন মা বেণু দেবনাথ।
বিচারিক কর্মজীবন
১৯৮১ সালের ৭ ডিসেম্বর মুনসেফ হিসেবে বিচার বিভাগে পা রাখলেন কৃষ্ণা দেবনাথ। এরপর ধাপে ধাপে উত্থান, ১৯৯৬ সালে জেলা ও দায়রা জজ, ২০১০ সালে হাইকোর্ট বিভাগের অতিরিক্ত বিচারক, ২০১২ সালে স্থায়ী বিচারক।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, বাংলাদেশে দেড়শ বছরের ইতিহাসে তিনিই প্রথম হিন্দু নারী, যিনি জেলা জজ পদে নিয়োগ পান। ২০২২ সালে তিনি বিচারপতি বোরহানউদ্দিন, বিচারপতি এম এনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি এফআরএম নজমুল আহসানের সঙ্গে একই দিনে আপিল বিভাগে উন্নীত হন—যা তাঁকে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের প্রথম হিন্দু নারী বিচারপতির মর্যাদা এনে দেয়।
৪১ বছরের দীর্ঘ বিচারিক যাত্রা শেষে ২০২২ সালের ৯ অক্টোবর তিনি অবসরে যান। কিন্তু বিদায় নেওয়ার আগে যে কথাটা বলে গেলেন, তা যেন আজও প্রতিটি এজলাসে প্রতিধ্বনিত হয়—বিচার বিভাগের স্বাধীনতা কাগজে-কলমে যতই লেখা থাক, একজন বিচারক যদি নিজের মন, কাজ আর বিশ্বাসে নিজেকে স্বাধীন মনে না করেন, তাহলে সেই স্বাধীনতা আসলে অন্তঃসারশূন্য। এক লাইনে যেন উনি বলে দিলেন বিচার ব্যবস্থার সবচেয়ে গভীর সত্যটা।
আহসান উল্লাহ মাস্টার হত্যা মামলা
কৃষ্ণা দেবনাথের বিচারিক জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মামলা হলো আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য আহসান উল্লাহ মাস্টার হত্যা মামলা। মুক্তিযোদ্ধা, শিক্ষক ও শ্রমিক নেতা আহসান উল্লাহ মাস্টার ১৯৯৬ ও ২০০১ সালে গাজীপুর-২ আসন থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য ছিলেন। ২০০৪ সালের ৭ মে গাজীপুরের নোয়াগাঁও এমএ মজিদ মিয়া উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে এক জনসভায় তাঁকে গুলি করে হত্যা করা হয়।
দীর্ঘ শুনানির পর ২০১৬ সালের ১৫ জুন বিচারপতি কৃষ্ণা দেবনাথ ও বিচারপতি ওবায়দুল হাসানের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ আপিলের রায় প্রদান করে।
কৃষ্ণা দেবনাথের বিচারিক কর্মজীবন বাংলাদেশের বিচার বিভাগে নারী ও ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্বের একটি উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত। তার জীবনযুদ্ধ এমন এক বার্তা, দরজা যতই বন্ধ থাকুক, ধৈর্য আর যোগ্যতা দিয়ে সেই দরজা খোলা যায়। একজন সংখ্যালঘু নারী হিসেবে তিনি যে পথ তৈরি করে গেছেন, তা আজ অনুপ্রেরণা হয়ে আছে বাংলাদেশের হাজারো তরুণী ও নারী আইনজীবীর কাছে। বর্তমানে বাংলাদেশের হাইকোর্টে সাতজন নারী বিচারক কর্মরত আছেন

