দেশের কারাগারগুলোতে বন্দির সংখ্যা পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। বর্তমানে ৭৬টি কারাগারে এক লাখের বেশি বন্দি রয়েছেন। এর মধ্যে অনেক কারাগারে ধারণক্ষমতার দুই থেকে সাত গুণ পর্যন্ত বন্দি রাখা হয়েছে।
কারা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ সেপ্টেম্বর দেশের ৭৬টি কারাগারে বন্দি ছিলেন এক লাখ চার হাজার ৬১৭ জন। এসব কারাগারের মোট ধারণক্ষমতা ৪৫ হাজার ১৮৬ জন। অর্থাৎ ধারণক্ষমতার প্রায় আড়াই গুণ বন্দি রয়েছেন।
চলতি মাসে বন্দির সংখ্যা এক লাখ ছাড়িয়েছে। বর্তমানে এ সংখ্যা এক লাখ পাঁচ হাজার ১২৩ জন।
কারা অধিদপ্তরের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত পাঁচ বছরের মধ্যে এটিই সর্বোচ্চ বন্দির সংখ্যা। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে সর্বোচ্চ ৮৩ হাজার ৭১৯ জন বন্দি ছিলেন। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে ছিলেন ৭৫ হাজার ৯৫৮ জন। ২০২৩ সালের নভেম্বরে ৮৬ হাজার ৩০৬ জন এবং ২০২২ সালের অক্টোবরে ৮৭ হাজার ১৭৩ জন বন্দি ছিলেন। ২০২১ সালের জানুয়ারিতে বন্দির সংখ্যা ছিল ৮৯ হাজার ৯১৪ জন।
কারা কর্মকর্তারা বলছেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত ও বিশেষ অভিযানে গ্রেপ্তার বাড়ায় কারাগারে চাপও বেড়েছে। এর সঙ্গে মাদক মামলার বন্দির সংখ্যাও বেড়েছে। আগে মোট বন্দির মধ্যে মাদক মামলার আসামি ছিলেন ২০ থেকে ২২ শতাংশ। এখন তা বেড়ে প্রায় ৩২ শতাংশ হয়েছে।
বিশেষ অভিযানে গ্রেপ্তার ৫৩ হাজারের বেশি
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে গত কয়েক বছর ধরে বিভিন্ন এলাকায় বিশেষ অভিযান চালানো হয়েছে। ২০২৫ সালে ‘অপারেশন ডেভিল হান্ট’, সুন্দরবনে দুটি বিশেষ অভিযান, পদ্মার চরাঞ্চলে ‘অপারেশন ফার্স্ট লাইট’ এবং ‘অপারেশন ডেভিল হান্ট ফেজ ২’ চালানো হয়।
চলতি বছরের ১ মার্চ চট্টগ্রামে ছিনতাইকারী, চাঁদাবাজ, মাদক ব্যবসায়ী, জুয়াড়ি ও কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে ‘এস ড্রাইভ’ শুরু করে চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ। এপ্রিলে একাধিক অপরাধের পর রাজধানীর মোহাম্মদপুরেও বিশেষ অভিযান চালানো হয়।
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সর্বশেষ ১ মে দেশব্যাপী বিশেষ অভিযান শুরু হয়। চাঁদাবাজি, মাদক, অবৈধ অস্ত্র, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ও অনলাইন জুয়াসহ বিভিন্ন অপরাধ নিয়ন্ত্রণে এই অভিযান চালানো হয়। গত ২৬ আগস্ট পর্যন্ত এ অভিযানে ৫৩ হাজার ৫১৮ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
সবচেয়ে বেশি চাপ শেরপুরে
কারাগারগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি বন্দির চাপ রয়েছে শেরপুর জেলা কারাগারে। ১০০ জনের ধারণক্ষমতার এই কারাগারে বন্দি রয়েছেন ৭৪৬ জন। অর্থাৎ ধারণক্ষমতার প্রায় সাত গুণ বন্দি রাখা হয়েছে সেখানে।
কেরানীগঞ্জের ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারেও বন্দির সংখ্যা অনেক বেশি। ৪ হাজার ৫৯০ জন ধারণক্ষমতার কারাগারটিতে বর্তমানে ১৩ হাজার ৯৮৭ জন বন্দি রয়েছেন। এই সংখ্যা ধারণক্ষমতার প্রায় তিন গুণ।
সাত কারাগারে পাঁচ থেকে ছয় গুণ বন্দি
কারা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশের অন্তত সাতটি কারাগারে ধারণক্ষমতার পাঁচ থেকে ছয় গুণ বন্দি রয়েছেন।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা কারাগারে ১৫৩ জনের জায়গায় বন্দি রয়েছেন ৯৩৬ জন। ভোলা জেলা কারাগারে ১০০ জনের ধারণক্ষমতার বিপরীতে বন্দি ৬৬৮ জন।
নারায়ণগঞ্জ জেলা কারাগারে ধারণক্ষমতা ৫৪০ জন। সেখানে বন্দি রয়েছেন ৩ হাজার ২২২ জন।
সিরাজগঞ্জ জেলা কারাগারে ৩০৪ জনের জায়গায় বন্দি রয়েছেন ১ হাজার ৫৬০ জন। ঝিনাইদহ, রাজবাড়ী ও চাঁদপুর জেলা কারাগারেও ধারণক্ষমতার প্রায় পাঁচ গুণ বন্দি রয়েছেন।

২০ কারাগারে তিন থেকে চার গুণ বন্দি
দেশের অন্তত ২০টি কারাগারে ধারণক্ষমতার তিন থেকে চার গুণ বন্দি রয়েছেন।
গাজীপুরের কাশিমপুর ৩ মহিলা কেন্দ্রীয় কারাগারে ২০০ জনের ধারণক্ষমতার বিপরীতে বন্দি রয়েছেন ৮০০ জন। গাজীপুর জেলা কারাগারে ৩০৭ জনের জায়গায় বন্দি ১ হাজার ৩৯০ জন।
নাটোর জেলা কারাগারে ২০০ জনের ধারণক্ষমতার বিপরীতে বন্দি রয়েছেন ৯৬৯ জন। বরগুনা, নেত্রকোনা, মুন্সীগঞ্জ ও বান্দরবান জেলা কারাগারেও ধারণক্ষমতার প্রায় চার গুণ বন্দি রয়েছেন।
কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার ১ এ ৫৪৮ জনের ধারণক্ষমতার বিপরীতে বন্দি রয়েছেন ১ হাজার ৯৬২ জন। কাশিমপুর হাইসিকিউরিটি কেন্দ্রীয় কারাগারে ১ হাজার জনের জায়গায় রয়েছেন ৩ হাজার ১৭২ জন।
এ ছাড়া চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগার, কক্সবাজার, টাঙ্গাইল, মানিকগঞ্জ, জয়পুরহাট, বগুড়া, নরসিংদী, জামালপুর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও খাগড়াছড়ি জেলা কারাগারেও ধারণক্ষমতার প্রায় তিন গুণ বন্দি রয়েছেন।
২২ কারাগারে ধারণক্ষমতার দ্বিগুণের বেশি বন্দি
কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার ২ এ বন্দি রাখার ধারণক্ষমতা ২ হাজার। সেখানে বর্তমানে রয়েছেন ৪ হাজার ৭২৪ জন।
এ ছাড়া ফরিদপুর, গোপালগঞ্জ, পাবনা, নওগাঁ, কিশোরগঞ্জ, বরিশাল, পটুয়াখালী, ঝালকাঠি, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, সুনামগঞ্জ, ময়মনসিংহ, নড়াইল, মাগুরা, চুয়াডাঙ্গা, মাদারীপুর, শরীয়তপুর, নোয়াখালী, ফেনী, লক্ষ্মীপুর ও কুষ্টিয়া জেলা কারাগারেও ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি বন্দি রয়েছেন।
কয়েকটি কারাগারে বন্দি কম
তবে দেশের সব কারাগারে একই ধরনের চাপ নেই। কেরানীগঞ্জের বিশেষ কারাগারে ২৭০ জনের ধারণক্ষমতার বিপরীতে রয়েছেন ২৩০ জন বিশেষ বন্দি। সেখানে সাবেক মন্ত্রী, সংসদ সদস্য ও বিচারপতিসহ বিভিন্ন ব্যক্তি রয়েছেন।
এ ছাড়া যশোর জেলা কারাগার, খুলনা জেলা কারাগার ১, খুলনা জেলা কারাগার ২, কিশোরগঞ্জ জেলা কারাগার ও সিলেট কেন্দ্রীয় কারাগারে ধারণক্ষমতার চেয়ে কম বন্দি রয়েছেন। সেনা সাব জেলে রয়েছেন ১৭ জন বন্দি।
কারা মহাপরিদর্শক ভারপ্রাপ্ত কর্নেল মোহাম্মদ মোস্তফা কামাল বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে থাকায় অপরাধীদের গ্রেপ্তার বাড়তে পারে। একই সঙ্গে মাদক মামলার বন্দির সংখ্যাও বেড়েছে। এ কারণে কারাগারে বন্দির চাপ বেড়েছে। তাঁর দাবি, থাকার জায়গার সংকট ছাড়া বন্দিদের অন্য কোনো বড় অসুবিধা হচ্ছে না।

