দুর্নীতি ও অনিয়মের মাধ্যমে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সাবেক চেয়ারম্যান আবু হেনা মো. রহমাতুল মুনীম ও সাবেক প্রথম সচিব ঈদতাজুল ইসলামের নামে থাকা ২৫টি ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধ করার আদেশ দিয়েছেন আদালত। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) ঢাকার মহানগর সিনিয়র স্পেশাল জজ আদালতের ভারপ্রাপ্ত বিচারক মো. আলমগীর এ আদেশ দেন। দুদকের পক্ষে সংস্থাটির উপপরিচালক মো. সাইদুজ্জামান আবেদনটি করেন এবং দুদকের কৌঁসুলি তরিকুল ইসলাম বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। এই আদেশের মধ্য দিয়ে দেশের রাজস্ব প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায়ের দুজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে চলমান তদন্তে নতুন মাত্রা যোগ হলো।
আদালতে জমা দেওয়া দুদকের আবেদনে বলা হয়, মুনীম ও ঈদতাজুলসহ সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ অনুসন্ধানাধীন রয়েছে। অনুসন্ধানকালে তাদের ব্যাংক হিসাবগুলোতে সন্দেহজনক ও অস্বাভাবিক লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে। পাশাপাশি বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে, অভিযোগসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা এসব হিসাবে থাকা অস্থাবর সম্পদ বিভিন্ন মাধ্যমে হস্তান্তর বা বেহাত করার চেষ্টা করছেন। দুদক আশঙ্কা করছে, অনুসন্ধান কার্যক্রম সম্পন্ন হওয়ার আগেই যদি এসব সম্পদ হস্তান্তর, রূপান্তর বা স্থানান্তর হয়ে যায়, তাহলে তদন্ত ব্যাহত হবে। এই কারণেই হিসাবগুলোতে থাকা অর্থ অবরুদ্ধ করা জরুরি বলে আদালত মনে করেছেন।
আদালতের আদেশ অনুযায়ী, আবু হেনা মো. রহমাতুল মুনীমের নামে ব্র্যাক ব্যাংক, অগ্রণী ব্যাংক ও প্রাইম ব্যাংকের একাধিক হিসাব রয়েছে। তার স্ত্রী লায়লা জেসমিনের নামেও অগ্রণী ও প্রাইম ব্যাংকের হিসাব রয়েছে। অন্যদিকে ঈদতাজুল ইসলামের নামে ব্র্যাক ব্যাংক, মার্কেন্টাইল ব্যাংক ও সোনালী ব্যাংকের একাধিক হিসাব রয়েছে। এছাড়া শর্মি মালা আনসারীর নামে মার্কেন্টাইল ব্যাংক, ব্র্যাক ব্যাংক ও উত্তরা ব্যাংকের হিসাবও অবরুদ্ধ করা হয়েছে। দুদকের আবেদনে মোট ২৫টি ব্যাংক হিসাবের তথ্য দেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে ব্র্যাক ব্যাংক, সোনালী ব্যাংক, অগ্রণী ব্যাংক, প্রাইম ব্যাংক, মার্কেন্টাইল ব্যাংক ও উত্তরা ব্যাংকের হিসাব রয়েছে। দুদক জানিয়েছে, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আরও কোনো স্থাবর বা অস্থাবর সম্পদ বা ব্যাংক হিসাবের সন্ধান পাওয়া গেলে পরবর্তীতে কমিশনের অনুমোদন নিয়ে সেগুলো ক্রোক ও অবরুদ্ধ করার জন্য আদালতে আবেদন করা হবে।
আবু হেনা মো. রহমাতুল মুনীম ২০২০ সালের ৬ জানুয়ারি এনবিআর চেয়ারম্যান হিসেবে যোগ দেন এবং ২০২৪ সালের ৬ জানুয়ারি তার মেয়াদ শেষ হয়। তবে অবসরের বয়স পেরিয়ে যাওয়ার পরও তৎকালীন শেখ হাসিনা সরকার তাকে চুক্তিতে এনবিআর চেয়ারম্যান হিসেবে রেখেছিল। ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকার ১৪ আগস্ট সেই চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বাতিল করে। ঈদতাজুল ইসলাম ছিলেন এনবিআরের প্রথম সচিব। ২০২৫ সালের মে মাসে দুদকের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে তাদের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিলেন আদালত। সেই ধারাবাহিকতায় এবার তাদের ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধের আদেশ এলো।
এই আদেশ শুধু একটি মামলার ঘটনা নয়, এটি রাজস্ব প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায়ে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার প্রশ্নও তৈরি করছে। এনবিআর দেশের রাজস্ব ব্যবস্থার মূল চালিকাশক্তি। কর, ভ্যাট ও শুল্ক নীতির কেন্দ্রে থেকে যারা কাজ করেন, তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ কেবল ব্যক্তিগত অনিয়ম নয়, বরং প্রতিষ্ঠানটির সুনাম ও করদাতাদের আস্থার প্রশ্নও। দুদকের এই তদন্ত যদি সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হয় এবং অভিযোগ প্রমাণিত হয়, তাহলে তা ভবিষ্যতে রাজস্ব প্রশাসনে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির সংস্কৃতি গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
দুদকের তদন্ত টিম এখন অভিযোগের সত্যতা যাচাই, লেনদেনের উৎস অনুসন্ধান এবং সম্পদের পরিমাণ নির্ধারণের কাজ চালিয়ে যাবে। ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধ থাকায় অভিযুক্তরা ওই অর্থ হস্তান্তর করতে পারবেন না, যা তদন্তের স্বার্থে গুরুত্বপূর্ণ। তদন্ত শেষে দুদক যদি প্রাথমিক অভিযোগে সন্তুষ্ট হয়, তাহলে মামলা দায়েরের সুপারিশ করা হবে। অন্যথায় অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হতে পারে। এখন দেখার বিষয়, দুদকের এই তদন্ত কত দ্রুত ও স্বচ্ছভাবে সম্পন্ন হয় এবং এর ফলাফল কী দাঁড়ায়।

