মাজারে হামলা ও ময়মনসিংহের ভালুকায় দীপু চন্দ্র দাস হত্যাসহ ৫ আগস্টের পরের বিভিন্ন সহিংস ঘটনার তদন্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন মানবাধিকারকর্মী ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার সারা হোসেন।
বুধবার ঢাকার সিরডাপ মিলনায়তনে ব্লাস্ট আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় তিনি এসব কথা বলেন।
সারা হোসেন বলেন, ৫ আগস্টের পর ঘটে যাওয়া অনেক ঘটনার তদন্ত এখনো শেষ হয়নি। এসব ঘটনার কোনো তদন্ত প্রতিবেদনও জনসমক্ষে আসেনি। পুলিশের মোবাইল ফোনের ভিডিও বিশ্লেষণের সক্ষমতা থাকার পরও তদন্তে অগ্রগতি কেন নেই, তা স্পষ্ট করা প্রয়োজন বলে তিনি মন্তব্য করেন।
তিনি পুলিশের মহাপরিদর্শকের প্রতিনিধির কাছে বিষয়টি পরিষ্কার করার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে হামলা প্রতিরোধে স্থানীয় বাসিন্দা, প্রতিবেশী ও অধিকারকর্মীদের নিয়ে আগাম উদ্যোগ নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
সারা হোসেন আরও বলেন, হামলার পক্ষে প্রকাশ্যে অবস্থান নেওয়া কোনো রাজনীতিক বা সংসদ সদস্য থাকলে তাদের জবাবদিহির আওতায় আনা প্রয়োজন।
দীপু দাস হত্যার বিচার নিয়ে পরিবারের অভিযোগ
সভায় দীপু চন্দ্র দাসের স্ত্রী মেঘনা দাস ও ভাই অপু চন্দ্র দাস বিচার না পাওয়ার অভিযোগ করেন।
২০২৫ সালের ১৮ ডিসেম্বর ভালুকার ডুবালিয়াপাড়া এলাকায় ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে দীপু চন্দ্র দাসকে মারধর করে হত্যা করা হয়। পরে তার মরদেহ গাছে ঝুলিয়ে আগুন দেওয়ার অভিযোগ ওঠে।
এ ঘটনায় অপু চন্দ্র দাস বাদী হয়ে ১৪০ থেকে ১৫০ জন অজ্ঞাত ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা করেন।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, মামলায় এখন পর্যন্ত ২৯ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের মধ্যে ১২ জন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।
অপু দাস বলেন, প্রায় এক বছর হয়ে গেলেও তারা বিচার পাননি। মেঘনা দাসও একই অভিযোগ করেন। সংসার চালাতে চাকরি ও ক্ষতিপূরণ হিসেবে একটি বাসা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন হয়নি বলেও তিনি জানান।
মামলায় অভিযোগ গঠনের শুনানির জন্য আগামী ২৬ ডিসেম্বর দিন ধার্য রয়েছে।
১০৩ মাজারে হামলার দাবি
সভায় অধ্যাপক মেঘনা গুহঠাকুরতা মাজার ও সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা নিয়ে একটি প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন।
তিনি দাবি করেন, দেশের সাত জেলায় সংখ্যালঘুদের ওপর এবং ১২ জেলায় মাজারে সংঘবদ্ধ হামলা হয়েছে। এসব ঘটনায় লুটপাট, অগ্নিসংযোগ ও বিগ্রহ চুরির পাশাপাশি ধর্ম অবমাননার অভিযোগও ব্যবহার করা হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
সেন্টার ফর ইসলামিক হেরিটেজের সমন্বয়কারী ইমরান হোসেন তুষার বলেন, ৫ আগস্টের পর দেশের ১০৩টি মাজারে হামলা হয়েছে। এসব ঘটনায় প্রায় ৫০টি স্থানে ওরশ ও মেলা বন্ধ হয়েছে। ১২টি মাজার পুরোপুরি পরিত্যক্ত হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।
তার হিসাবে, এসব ঘটনায় ১২৩ জন আহত ও তিনজন নিহত হয়েছেন। হুমকির কারণে ৬০টি মাজার ও দরগাহের গদিনিশীন পীর ও প্রধান খাদেম এখনো ফিরতে পারেননি বলেও তিনি দাবি করেন।
মাজারে হামলার ঘটনায় ১৩টি মামলা হয়েছে বলেও দাবি করেন ইমরান হোসেন। পুলিশের ভূমিকা নিয়েও তিনি অভিযোগ তোলেন। তবে সভায় এসব তথ্য ও অভিযোগ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য হিসেবে উপস্থাপন করা হয়।
পুলিশ সদর দপ্তরের আইন কর্মকর্তা মনছুর উদ্দিন আলোচকদের বক্তব্য ও প্রস্তাবগুলো নোট করেন। তিনি বিষয়গুলো আইজিপির কাছে তুলে ধরার কথা জানান।
হামলা ঠেকাতে আগাম সতর্কতার প্রস্তাব
ভবিষ্যতে হামলা ঠেকাতে আগাম সতর্কতামূলক ব্যবস্থা চালুর প্রস্তাব দেন অধ্যাপক মেঘনা গুহঠাকুরতা।
তিনি বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘৃণা ছড়ানো, বিপুলসংখ্যক যানবাহন ভাড়া, পেট্রোল বা রাসায়নিক সংগ্রহ এবং হঠাৎ বড় জমায়েতের মতো বিষয়গুলো পর্যবেক্ষণ করে আগাম ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে।
মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটন বলেন, ৫ আগস্টের পর আহমদীয়া সম্প্রদায়, মন্দির ও মাজারে হামলার ঘটনায় রাষ্ট্র যথাযথ পদক্ষেপ নেয়নি।
এসব ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলাগুলোর বড় অংশে এখনো অভিযোগপত্র দেওয়া হয়নি বলেও তিনি দাবি করেন। জিডির ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি নেই বলে জানান তিনি।

