বিশেষ প্রতিবেদন
শনিবার রাতে ঢাকার ইসিবি চত্বরে একটা ঘটনা ঘটে। কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিও ভাঙচুর হয়। তিনি সাংবাদিকদের বলেন বাংলাদেশের আইনের ব্যপারে তিনি নাস্তিক। তার অর্থ বাংলাদেশের আইনে তার বিশ্বাস নেয়। এইভাবে যখন একটা দেশের আইনের উপর থেকে যখন সে দেশের নাগরিক বিশ্বাস হারাতে শুরু করে তখন সেই দেশের স্থিতিশীলতা আর আইনের শাসন কোথায় গিয়ে দাঁড়ায় তা প্রশ্ন থেকে যায়। তখন আইন ভাঙা আর মানুষের কাছে অস্বাভাবিক মনে হয় না।
আইন ব্যবস্থার প্রতি সঞ্চিত অবিশ্বাস তখন একটা দেশের ভিতরে হাইপার ভিজিল্যান্ট তৈরী করে। সমস্যাটা আর নিছক মনস্তাত্ত্বিক দুর্বলতা নয়, এটি রাষ্ট্রের ভিত্তিমূলে আঘাত হানা একটি অস্তিত্বগত সংকট।
যখন বিচার নিজের হাতে তুলে নেয় মানুষ
সাম্প্রতিক সময়ে সারাদেশে গণপিটুনির ঘটনা যেভাবে বেড়েছে, তা কোনো বিচ্ছিন্ন উন্মত্ততা নয়, বরং এটি একটি সুস্পষ্ট প্যাটার্নের অংশ। মানুষ যখন বিশ্বাস হারিয়ে ফেলে যে থানা-আদালতের দীর্ঘ প্রক্রিয়ায় গেলে প্রকৃত ন্যায়বিচার পাওয়া যাবে, তখন তারা তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়াকেই একমাত্র সমাধান হিসেবে গ্রহণ করতে শুরু করে। ছিনতাইকারী সন্দেহে গণপিটুনি, সামাজিক মাধ্যমে ছড়ানো গুজবের ভিত্তিতে দলবদ্ধ আক্রমণ, এমনকি ব্যক্তিগত পুরনো শত্রুতার জের ধরে “চোর সন্দেহে” মারধর—এসবের পেছনে একটি অভিন্ন মনস্তত্ত্ব কাজ করে: রাষ্ট্রীয় বিচারব্যবস্থার প্রতি সম্পূর্ণ অনাস্থা।
এই প্রবণতার সবচেয়ে ভয়ঙ্কর দিক হলো, এখানে প্রমাণ, তদন্ত বা আত্মপক্ষ সমর্থনের কোনো সুযোগ থাকে না। জনতার তাৎক্ষণিক সন্দেহ ও আবেগই হয়ে ওঠে একমাত্র “বিচারক, জুরি ও জল্লাদ।”
চুক্তি ভঙ্গের সংস্কৃতি ও সম্পত্তির অনিশ্চয়তা
আইনের প্রতি এই অবিশ্বাস শুধু সহিংসতায় সীমাবদ্ধ নয়, এটি দেশের অর্থনৈতিক ভিত্তিকেও নীরবে ক্ষয় করে দিচ্ছে। অর্থনীতিতে নোবেলজয়ী ডগলাস নর্থ, বলেছেন, “অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সবচেয়ে বড় চাবিকাঠি হলো একটি কার্যকর আইনি কাঠামো, যা চুক্তির প্রয়োগ নিশ্চিত করে এবং সম্পত্তির অধিকার রক্ষা করে। দারন আডেমোগ্লু ‘Why Nations Fail’ গ্রন্থের লেখক ও নোবেলজয়ী:“যেসব দেশ নাগরিকদের সম্পত্তির অধিকার নিশ্চিত করতে পারে না এবং যেখানে আইনি প্রক্রিয়া পক্ষপাতদুষ্ট বা ধীরগতির, সেখানে মানুষ বিনিয়োগ করতে ভয় পায়।
সম্পত্তির মালিকানা নিয়ে অনিশ্চয়তা এই সংকটের আরেকটি ভয়াবহ রূপ। এই যেমন সাল্মান মুক্তাদিরের সাথে হয়ে যাওয়া ঘটনায় রাস্ট্র সালমানের সম্পত্তির মালিকানা রক্ষায় ব্যর্থ। যখন রাষ্ট্র ব্যর্থ হয় তখন তার নাগরিক প্রাতিষ্ঠানিক সুরক্ষার বদলে স্থানীয় প্রভাবশালী মহল, রাজনৈতিক ছত্রছায়া বা এমনকি সশস্ত্র সহায়তার শরণাপন্ন হতে বাধ্য হয়। অর্থনীতিবিদদের মতে, এই অনিশ্চয়তা দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগ ও উদ্যোক্তা মনোবলে সরাসরি আঘাত করে। কারণ, কেউই এমন ব্যবস্থায় ভবিষ্যতের পরিকল্পনা করতে সাহস পায় না, যেখানে আজকের চুক্তি কালকের নিশ্চয়তা দেয় না।
রাষ্ট্রের বৈধতা প্রশ্নবিদ্ধ: এক গভীরতর সংকট
রাষ্ট্রবিজ্ঞানের একটি মৌলিক ধারণা হলো, একটি রাষ্ট্রের বৈধতা নির্ভর করে এই সামাজিক চুক্তির ওপর যে, নাগরিকরা নিজেদের হাতে আইন তুলে নেবে না, বিনিময়ে রাষ্ট্র তাদের নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করবে। যখন এই চুক্তির একটি পক্ষ তার দায়িত্ব পালনে বারবার ব্যর্থ হয়, তখন অন্য পক্ষও ধীরে ধীরে চুক্তি থেকে সরে আসতে শুরু করে।
এটি এমন একটি সংকট, যা শুধু “সরকার পরিবর্তনে” সমাধান হয় না। কারণ প্রশ্নটা কোনো নির্দিষ্ট সরকারের অদক্ষতা নিয়ে নয়—প্রশ্নটা পুরো ব্যবস্থার প্রতি আস্থা নিয়ে। যখন সাধারণ মানুষ মনে করে যে বিচারব্যবস্থা, পুলিশ, প্রশাসন—এই পুরো কাঠামোটাই ন্যায়বিচার দিতে অক্ষম বা অনিচ্ছুক, তখন রাষ্ট্র নিজেই তার নাগরিকদের চোখে তার অস্তিত্বের মূল যুক্তি (raison d’être) হারিয়ে ফেলে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা সতর্ক করছেন—এই ধরনের বৈধতার সংকট ইতিহাসে বারবার রাষ্ট্রীয় কাঠামো ভেঙে পড়ার পূর্বাভাস হয়ে দেখা দিয়েছে।
কিছু প্রশ্ন যা রেখে যাওয়া দরকার
এই পুরো পরিস্থিতি আমাদের সামনে কিছু অস্বস্তিকর কিন্তু জরুরি প্রশ্ন রেখে যায়:
যখন একটি সমাজের একটি বড় অংশ মনে করে যে ন্যায়বিচার শুধু “যার ক্ষমতা বেশি” তার জন্য, তখন সেই সমাজ কি ধীরে ধীরে এমন একটি অবস্থার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে না, যেখানে রাষ্ট্রীয় যন্ত্র অর্থহীন হয়ে পড়ে?
আজ একটা স্টুডিওতে হামলা হলো। কাল অন্য প্রতিষ্ঠানে হবে? যদি শতাধিক মানুষ প্রকাশ্যে অস্ত্র নিয়ে হামলা করতে পারে ভয় ভীতি ছাড়া, তাহলে সমাজে বল প্রয়োগের সংস্কৃতি কতদূর যাবে?
এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—যদি আজ যে বিশ্বাসের ভাঙন শুরু হয়েছে, তা যদি অব্যাহত থাকে, তাহলে আগামী প্রজন্ম কি এমন একটি সমাজে বেড়ে উঠবে, যেখানে “আইন” শব্দটি শুধুই একটি ঐতিহাসিক স্মৃতি হয়ে থাকবে, আর বাস্তবে টিকে থাকবে শুধু শক্তির নিয়ম?
ইতিহাস সাক্ষী—যখন কোনো রাষ্ট্র তার নাগরিকদের কাছে ন্যায়বিচারের নিশ্চয়তা দিতে ব্যর্থ হয়, তখন সেই শূন্যস্থান পূরণ করে হয় স্বৈরাচার, নয়তো বিশৃঙ্খলা। একজন মানুষ দেখে অন্য একজন প্রকাশ্যে আইন ভাঙছে এবং শাস্তি পাচ্ছে না। সে ধরে নেয়, নিয়ম মানার প্রয়োজন নেই।
এই কারনে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এখনই সময়—বিচারব্যবস্থার গতি বাড়ানো, আইনের সমান প্রয়োগ নিশ্চিত করা, এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, মানুষের মনে আবার এই বিশ্বাস জাগিয়ে তোলা যে ন্যায়বিচার পাওয়া সম্ভব। কারণ একবার যদি একটি জাতি সম্পূর্ণভাবে বিশ্বাস করে ফেলে যে “আইন বলে কিছু নেই,” তাহলে সেই বিশ্বাস ফিরিয়ে আনতে যে সময় ও মূল্য দিতে হবে, তা হয়তো এক প্রজন্মের সীমা ছাড়িয়ে যাবে।

