সন্তানের হেফাজত বা জিম্মা নিয়ে পারিবারিক আদালতের দেওয়া ডিক্রির বিরুদ্ধে আপিলের সুযোগ থাকলে সরাসরি হেবিয়াস করপাস রিট করা যাবে না বলে রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট।
২০২৫ সালের ২৪ জুলাই বিচারপতি কাজী জিনাত হক ও বিচারপতি আইনুন নাহার সিদ্দিকার হাইকোর্ট বেঞ্চ এ রায় দেন। রোজিনা আক্তার বনাম রাষ্ট্র মামলায় জারি করা রুল খারিজ করে আদালত এ সিদ্ধান্ত দেন।
মঙ্গলবার ২৯ সেপ্টেম্বর রায়ের ২১ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে। রায়ের মূল অংশ লেখেন বিচারপতি কাজী জিনাত হক।
যেভাবে শুরু হয় মামলা
রায়ের তথ্য অনুযায়ী, ভোলার জসিম উদ্দিন ও রোজিনা আক্তার সাভারের হেমায়েতপুরে একটি পোশাক কারখানায় কাজ করতেন। তাদের প্রথম সন্তান জন্মের পর মারা যায়।
২০২৪ সালের ১৪ জুলাই সাভারের একটি হাসপাতালে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে তাদের দ্বিতীয় সন্তান বাসমিন আবরাবের জন্ম হয়। দুই দিন পর মা ও শিশুকে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র দেওয়া হয়।
বাড়িতে ফেরার পর অক্সিজেনের ঘাটতিতে শিশুটি অসুস্থ হয়ে পড়ে। ১৭ জুলাই তাকে সাভারের একটি হাসপাতালের এনআইসিইউতে ভর্তি করা হয়। একই দিন উন্নত চিকিৎসার জন্য মহাখালীর ইউনিভার্সাল মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়।
রিটকারী পক্ষের বক্তব্য, আর্থিক সংকট ও সে সময়ের সহিংস পরিস্থিতির কারণে জসিম উদ্দিন সঙ্গে সঙ্গে শিশুটিকে ওই হাসপাতালে নিতে পারেননি। পরে ১৯ জুলাই শিশুটিকে সেখানে ভর্তি করা হয়। শিশুটিকে এনআইসিইউ ও লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়। এ সময় দেশজুড়ে আন্দোলন, সহিংসতা ও কারফিউ চলছিল।
রিটকারীর দাবি, হাসপাতালকে ভর্তি ও অন্যান্য খরচ মিলিয়ে ৩৬ হাজার ১৩৮ টাকা দেওয়ার পর নিরাপত্তা ও অর্থের ব্যবস্থা করতে তারা সাময়িকভাবে গ্রামের বাড়িতে চলে যান।
পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে ২০২৪ সালের ১০ আগস্ট তারা হাসপাতালে ফিরে আসেন। তখন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ প্রায় ৮ থেকে ৯ লাখ টাকা বিল দাবি করে বলে রিটকারী পক্ষ জানায়।
এরপর তারা ভোলায় ফিরে গিয়ে পারিবারিক সম্পত্তি বিক্রি করে চিকিৎসার খরচ জোগাড়ের চেষ্টা করেন। কয়েক মাস পর ২০২৫ সালের ১৫ এপ্রিল ভোলা থানার ফোন পেয়ে পরদিন সেখানে যান তারা। সেখানে তারা জানতে পারেন, ২০২৪ সালের ২২ জুলাই শিশুটির বিষয়ে থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করা হয়েছিল।
পরে তারা জানতে পারেন, ২০২৪ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর শিশুটিকে আজিমপুর ছোটমনি নিবাসে দেওয়া হয়। এরপর বাংলাদেশ ও যুক্তরাজ্যের দ্বৈত নাগরিক এক দম্পতি শিশুটির অভিভাবকত্ব ও জিম্মা চেয়ে ঢাকার পারিবারিক আদালতে মামলা করেন।
রায়ের তথ্য অনুযায়ী, মামলা হওয়ার ১০ দিনের মধ্যে ওই দম্পতি একতরফা ডিক্রি পান। এতে শিশুটির অভিভাবকত্ব, জিম্মা ও পাসপোর্ট সংগ্রহের অধিকার দেওয়া হয়।
এরপর শিশুটিকে দেশের বাইরে নিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করে তার মা রোজিনা আক্তার হাইকোর্টে হেবিয়াস করপাস রিট করেন। ওই আবেদনের পর হাইকোর্ট শিশুটিকে মায়ের কাছে দেওয়ার বিষয়ে রুল জারি করেন।
বিবাদীদের বক্তব্য
রুলের বিরোধিতা করে বিবাদীরা বলেন, শিশুটিকে প্রায় দুই মাস ইউনিভার্সাল মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের এনআইসিইউতে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছিল। তাদের দাবি, শিশুটির জৈবিক বাবা মায়ের অবস্থান খুঁজে না পেয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তাকে আজিমপুর ছোটমনি নিবাসে হস্তান্তর করে।
বিবাদীদের বক্তব্য, শিশুটিকে জিম্মায় নেওয়া দম্পতি নিঃসন্তান এবং বাংলাদেশ ও যুক্তরাজ্যের দ্বৈত নাগরিক। তারা পারিবারিক আদালতে মামলা করে আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে শিশুটির অভিভাবকত্ব ও জিম্মার অধিকার পান।
বিবাদীরা আরও বলেন, জৈবিক বাবা মা শিশুটিকে পরিত্যাগ করেছিলেন। তাদের দাবি, শিশুটির অবস্থান সম্পর্কে জানার পরও তারা তাকে দেখতে যাওয়ার চেষ্টা করেননি এবং কোনো জিডিও করেননি।
হাসপাতালের বক্তব্য
হাসপাতালের পক্ষ থেকে বলা হয়, ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই শিশুটিকে সংকটজনক অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। প্রয়োজনীয় পরীক্ষা শেষে তাকে লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়।
হাসপাতালের দাবি, ভর্তির দিন রাতেই শিশুটির বাবার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তিনি তখন বাইরে থাকার কথা জানিয়ে দ্রুত ফিরে আসবেন বলে জানান। তবে পরে একাধিকবার ফোন করেও তাকে হাসপাতালে পাওয়া যায়নি। শিশুটির বাবা মায়ের সন্ধান না পেয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ২০২৪ সালের ২২ জুলাই তেজগাঁও থানায় সাধারণ ডায়েরি করে।
হাসপাতাল আরও জানায়, বিল বকেয়া থাকলেও শিশুটির চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়া হয়। পরে শিশুটি সুস্থ হলে ১৮ সেপ্টেম্বর তাকে আজিমপুর ছোটমনি নিবাসে হস্তান্তর করা হয়।
হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ
হাইকোর্ট বলেন, বাবা মা ইচ্ছা করে শিশুটিকে পরিত্যাগ করেছিলেন, নাকি রাজনৈতিক সহিংসতা ও আর্থিক সংকটের কারণে সাময়িকভাবে সরে যেতে বাধ্য হয়েছিলেন, তা নিয়ে দুই পক্ষের বক্তব্যে বড় ধরনের বিরোধ রয়েছে।
আদালতের মতে, রিটের সংক্ষিপ্ত শুনানিতে এ ধরনের বিতর্কিত তথ্য যাচাই করা সম্ভব নয়। হাইকোর্ট আরও বলেন, পারিবারিক আদালত আইন, ২০২৩ এর ২৩ ধারায় পারিবারিক আদালতের ডিক্রির বিরুদ্ধে জেলা জজ আদালতে আপিলের সুযোগ রয়েছে।
আদালত বলেন, কোনো বিষয়ে বিশেষ আইন এবং নির্দিষ্ট আপিলের ব্যবস্থা থাকলে সরাসরি রিটের মাধ্যমে হাইকোর্টের এখতিয়ার নেওয়া উচিত নয়। এ কারণে হাইকোর্ট রিটে জারি করা রুল খারিজ করে দেন। একই সঙ্গে আগের অন্তর্বর্তী আদেশও বাতিল করা হয়।
তবে আদালত বলেন, সন্তানের জিম্মা ও অভিভাবকত্ব পাওয়ার জন্য রিটকারী মা উপযুক্ত দেওয়ানি বা পারিবারিক আদালতে আইন অনুযায়ী প্রতিকার চাইতে পারবেন।
রায়ের অনুলিপি সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর কাছে দ্রুত পাঠানোর নির্দেশও দিয়েছেন আদালত।

