সংবিধান থেকে ‘সমাজতন্ত্র’ ও ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ বাদ দেওয়ার দাবি জানিয়ে রাষ্ট্রপতির কার্যালয়, জাতীয় সংসদ সচিবালয় ও সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের আইনি নোটিশ দেওয়া হয়েছে।
বৃহস্পতিবার ১ অক্টোবর জনস্বার্থে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মো. মাহমুদুল হাসান মামুন এই নোটিশ পাঠান।
রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ের সচিব, জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের সচিব, মন্ত্রিপরিষদ সচিব এবং আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিবকে নোটিশের প্রাপক করা হয়েছে।
নোটিশে বলা হয়েছে, ব্যক্তিমালিকানা নিশ্চিত করা এবং বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ানোর জন্য সংবিধান থেকে ‘সমাজতন্ত্র’ বাদ দেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে ধর্মীয় স্বাধীনতার সঙ্গে ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ সাংঘর্ষিক দাবি করে সেটিও বাদ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
সমাজতন্ত্র নিয়ে যে যুক্তি
বর্তমান সংবিধানের ৮ অনুচ্ছেদে জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতাকে রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
১০ অনুচ্ছেদে ন্যায়ভিত্তিক ও সাম্যবাদী সমাজ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সমাজতান্ত্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়েছে। ১২ অনুচ্ছেদে ধর্মনিরপেক্ষতার নীতি বাস্তবায়নের বিষয়টি রয়েছে।
নোটিশে দাবি করা হয়েছে, বর্তমান মুক্তবাজার অর্থনীতির সময়ে রাষ্ট্রীয় সমাজতন্ত্র কার্যকর ধারণা নয়। নোটিশদাতা এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকার সংজ্ঞার উদ্ধৃতি দিয়ে সমাজতন্ত্রের সঙ্গে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি তুলে ধরেছেন।
নোটিশদাতার মতে, সংবিধানে সমাজতন্ত্রের উল্লেখ থাকায় বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ব্যক্তিমালিকানা ও বিনিয়োগের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হতে পারে। এ কারণে সংবিধানের প্রস্তাবনা, ৮ ও ১০ অনুচ্ছেদ থেকে ‘সমাজতন্ত্র’ বাদ দেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে।
ধর্মনিরপেক্ষতা নিয়েও আপত্তি
নোটিশে বাংলাদেশের আইনি ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায়ের কথা তুলে ধরে ধর্মনিরপেক্ষতা নিয়ে আপত্তি জানানো হয়েছে।
নোটিশদাতা আইনবিদ ভি. ডি. কুলশ্রেষ্ঠের Landmarks in Indian Legal and Constitutional History বইয়ের উল্লেখ করে বাংলাদেশের আইনি ইতিহাসকে হিন্দু, মুসলিম, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ও ব্রিটিশ এবং পাকিস্তান যুগে ভাগ করার বিষয়টি তুলে ধরেছেন।
তার দাবি, এসব দীর্ঘ সময়ে ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ নামে কোনো মতবাদের চর্চা ছিল না। ১৯৬৬ সালের ছয় দফাতেও ধর্মনিরপেক্ষতার উল্লেখ ছিল না বলে নোটিশে বলা হয়েছে।
নোটিশে আরও দাবি করা হয়েছে, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ কোনো নির্দিষ্ট মতবাদ প্রতিষ্ঠার জন্য হয়নি। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক বৈষম্য, লুণ্ঠন ও বঞ্চনার বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল বলে এতে উল্লেখ করা হয়েছে।
৪১ অনুচ্ছেদ নিয়ে যুক্তি
নোটিশে সংবিধানের ৭ অনুচ্ছেদ উল্লেখ করে বলা হয়েছে, প্রজাতন্ত্রের সব ক্ষমতার মালিক জনগণ। নোটিশদাতার দাবি, সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতা থাকার কারণে এটি ৪১ অনুচ্ছেদে নাগরিকদের ধর্ম পালন, অবলম্বন ও প্রচারের মৌলিক অধিকারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
তবে সংবিধানের ১২ অনুচ্ছেদে ধর্মনিরপেক্ষতার নীতির অংশ হিসেবে সাম্প্রদায়িকতা, কোনো ধর্মকে রাজনৈতিক মর্যাদা দেওয়া, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ধর্মের অপব্যবহার এবং কোনো ধর্মাবলম্বীর প্রতি বৈষম্য বা নিপীড়ন বিলোপের কথা বলা হয়েছে।
৯০ দিনের সময়সীমা
আইনি নোটিশে আগামী ৯০ দিনের মধ্যে সংবিধান সংশোধন এবং জাতীয় গণভোটের মাধ্যমে ‘সমাজতন্ত্র’ ও ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ বাদ দেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় আইনগত ও সাংবিধানিক পদক্ষেপ নিতে বলা হয়েছে।
নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ব্যবস্থা নেওয়া না হলে সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদের অধীনে হাইকোর্টে জনস্বার্থে রিট করার কথা নোটিশে বলা হয়েছে।
নোটিশদাতার ভাষ্য অনুযায়ী, দেশের অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব, ঐতিহাসিক বাস্তবতা ও জনগণের মৌলিক অধিকার রক্ষার জন্য এই পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

