জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় কুষ্টিয়ায় ছয়জনকে হত্যাসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) সভাপতি হাসানুল হক ইনুর সাজা বাড়াতে আপিল করতে যাচ্ছে প্রসিকিউশন।
রোববার (৪ অক্টোবর) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল প্রাঙ্গণে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে এ তথ্য জানান প্রসিকিউটর গাজী এমএইচ তামিম।
সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ইনুকে ১০ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল-২। তবে এই সাজা যথেষ্ট নয় বলে মনে করছে প্রসিকিউশন। সাজা বাড়ানোর জন্য আপিলের সব প্রস্তুতি শেষ হয়েছে। চলতি সপ্তাহেই সুপ্রিম কোর্টে আপিল করা হবে।
গত ৩০ জুন মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ইনুকে ১০ বছরের কারাদণ্ড দেন ট্রাইব্যুনাল-২। বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল এ রায় দেন। একই সঙ্গে মামলার দুটি অভিযোগে মোট দুই লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।
ইনুর বিরুদ্ধে মোট আটটি অভিযোগ আনে প্রসিকিউশন। এর মধ্যে তিন নম্বর অভিযোগে তাকে ১০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। ৬ ও ৭ নম্বর অভিযোগে এক লাখ টাকা করে মোট দুই লাখ টাকা ক্ষতিপূরণের নির্দেশ দেওয়া হয়। ওই দুই অভিযোগেও ১০ বছর করে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। তবে আলাদা অভিযোগে দেওয়া সাজা একসঙ্গে কার্যকর হওয়ায় ইনুকে মোট ১০ বছর কারাগারে থাকতে হবে। ১, ২, ৪, ৫ ও ৮ নম্বর অভিযোগ থেকে তাকে খালাস দেওয়া হয়।
প্রসিকিউশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ২৫ মার্চ ইনুর বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা। তদন্ত শেষে ওই বছরের ১১ সেপ্টেম্বর চিফ প্রসিকিউটরের কাছে প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়। প্রতিবেদন যাচাইয়ের পর ২৫ সেপ্টেম্বর ট্রাইব্যুনালে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করে প্রসিকিউশন। একই দিন অভিযোগ আমলে নিয়ে ইনুর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন ট্রাইব্যুনাল-২।
এরপর প্রসিকিউশন ও আসামিপক্ষের দীর্ঘ শুনানি শেষে ২ নভেম্বর আটটি নির্দিষ্ট অভিযোগে বিচার শুরুর আদেশ দেন ট্রাইব্যুনাল।
গত বছরের ৩০ নভেম্বর মামলায় সূচনা বক্তব্য দেয় প্রসিকিউশন। ১ ডিসেম্বর শুরু হয় সাক্ষ্যগ্রহণ। তদন্ত কর্মকর্তাসহ মোট ১০ জন ইনুর বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেন। আসামিপক্ষের হয়ে সাফাই সাক্ষ্য দেন দুজন।
সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হওয়ার পর চলতি বছরের ২ এপ্রিল থেকে যুক্তিতর্ক শুরু হয়। প্রথমে আসামিপক্ষ এবং পরে প্রসিকিউশন তাদের যুক্তি উপস্থাপন করে। ১৪ মে যুক্তিতর্ক শেষ হলে মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ রাখেন ট্রাইব্যুনাল।
মামলায় মোট ১০ জন সাক্ষ্য দিয়েছেন। তাদের মধ্যে তিনজন চাক্ষুষ সাক্ষী, দুজন বিশেষজ্ঞ সাক্ষী, একজন ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্য, দুজন জব্দতালিকা সাক্ষী, একজন জেলার সাক্ষী এবং একজন তদন্ত কর্মকর্তা। আদালতে ২০ সিরিজের নথি ও পাঁচটি বস্তু প্রদর্শন করা হয়।
ইনুর বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ
প্রসিকিউশনের অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই ভারতের মুম্বাইভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ‘মিরর নাউ’কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে আন্দোলনকারীদের বিএনপি, জামায়াত এবং সন্ত্রাসী ও জঙ্গি হিসেবে উল্লেখ করেন ইনু। একই সঙ্গে আন্দোলন দমনে সর্বোচ্চ বলপ্রয়োগে উসকানি দেন বলে অভিযোগ করা হয়।
এরপর ১৯ জুলাই গণভবনে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় অংশ নেন তিনি। প্রসিকিউশনের দাবি, ১৪ দলীয় জোটের ওই বৈঠকে নেওয়া সিদ্ধান্ত অনুযায়ী নিরস্ত্র ছাত্র-জনতার আন্দোলন দমনে ‘শ্যুট অ্যাট সাইট’ নির্দেশনা বাস্তবায়নেও ভূমিকা রাখেন ইনু।
প্রসিকিউশনের আরও অভিযোগ, ২০ জুলাই আন্দোলন দমনের জন্য নিজের জেলা কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপারকে মোবাইল ফোনে আন্দোলনকারীদের ছবি দেখে তালিকা তৈরি এবং তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন ইনু।
অভিযোগে বলা হয়, ওই নির্দেশনার পর পুলিশ ও ১৪ দলীয় জোটের সশস্ত্র সদস্যরা কুষ্টিয়া শহরের বিভিন্ন এলাকায় আন্দোলনকারীদের ওপর গুলি চালান। ওই ঘটনায় শ্রমিক আশরাফুল ইসলাম, সুরুজ আলী বাবু, শিক্ষার্থী আবদুল্লাহ আল মুস্তাকিন, উসামা, ব্যবসায়ী বাবলু ফরাজী ও চাকরিজীবী ইউসুফ শেখ নিহত হন। আরও বহু মানুষ আহত হন বলে প্রসিকিউশনের অভিযোগ।
এ ছাড়া আন্দোলন দমনে মারণাস্ত্র ব্যবহার, ছত্রীসেনা নামানো, হেলিকপ্টার থেকে গুলি, বোমা হামলা এবং আটক ও নির্যাতনের পরিকল্পনা ও উসকানির অভিযোগও আনা হয় ইনুর বিরুদ্ধে।
প্রসিকিউশনের দাবি, এসব বিষয়ে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে নির্দেশনা দিতেন ইনু। কারফিউ জারি করে মারণাস্ত্র ব্যবহারের মাধ্যমে হত্যাকাণ্ড ও নির্যাতনের ঘটনাকেও তিনি সমর্থন করেছিলেন বলে অভিযোগ করা হয়।
২৯ জুলাই শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ১৪ দলীয় জোটের আরেকটি সভায়ও ইনু উপস্থিত ছিলেন বলে মামলার অভিযোগে উল্লেখ করা হয়। ওই সভায় তিনি জামায়াতে ইসলামীকে নিষিদ্ধ করার প্রস্তাব দেন বলেও প্রসিকিউশন দাবি করে।
প্রসিকিউশনের ভাষ্য অনুযায়ী, এসব কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও ১৪ দলীয় জোটের সশস্ত্র সদস্যদের হত্যাকাণ্ড ও নির্যাতনকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করেন ইনু।
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের এক দিন আগে ৪ আগস্ট কারফিউ জারি এবং গুলি চালিয়ে ছাত্র-জনতা হত্যার ঘটনায় শেখ হাসিনার নেওয়া পদক্ষেপও ইনু অনুমোদন করেছিলেন বলে অভিযোগ করেছে প্রসিকিউশন।
এখন ট্রাইব্যুনালের দেওয়া ১০ বছরের সাজা বাড়ানোর দাবিতে চলতি সপ্তাহে সুপ্রিম কোর্টে আপিল করতে যাচ্ছে রাষ্ট্রপক্ষ।

