গত ২০ সেপ্টেম্বর কুমিল্লায় ১৩ বছর বয়সী কিশোর অপ্রতিমের মরদেহ উদ্ধার হয়। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে কিশোর গ্যাং আবার আলোচনায় এসেছে। ধারণা করা হয়, অপ্রতিমের মৃত্যুর পিছনে কিশোরন গ্যাং- এর হাত রয়েছে। প্রায় প্রতিদিন অভিযান চালিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ২০০ থেকে ৩০০ জন কিশোর গ্যাং- এর মেম্বারদের গ্রেফতার করছে। শুধু কুমিল্লাতেই কিশোর গ্যাং ও বখাটেদের বিরুদ্ধে ধরা পড়েছে ১ হাজার ৬৭২ জন।
এই অভিযানের মধ্যে একটি প্রশ্ন বারবার উঠছে। ১৮ বছরের নিচের কেউ খুন, চাঁদাবাজি বা ছিনতাই করলে আইন তার বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নিতে পারে? আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বলছে, আইনের জটিলতাই সবচেয়ে বড় বাধা। এই প্রতিবেদনে সংখ্যা আর আইনের ধারা ধরে দেখা হয়েছে, সমস্যা আসলে কোথায় এবং সমাধান কোন পথে আসতে পারে।
ডিএমপির পরিসংখ্যান
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) তালিকা
ডিএমপির তালিকায় রাজধানীতে সক্রিয় অপরাধী চক্র আছে ১২২টি। এর মধ্যে ৮৯৩ জনের বয়সের তথ্য পাওয়া গেছে। তাদের ১৫২ জনের বয়স ১৮ বছরের নিচে, যা প্রায় ১৭ শতাংশ। ১৮ থেকে ২০ বছর বয়সী আছে ৩২২ জন, অর্থাৎ প্রায় ৩৬ শতাংশ। দুই দল মিলিয়ে ২০ বছর বা তার কম বয়সী ৪৭৪ জন, যা ৫৩ শতাংশ। বাকি ৪১৯ জনের বয়স ২০ বছরের বেশি, যা প্রায় ৪৭ শতাংশ। এই শেষ সংখ্যাটি মূল প্রতিবেদনের তথ্য থেকে হিসাব করে বের করা হয়েছে।
এই সংখ্যা থেকে প্রথম বিষয়টি স্পষ্ট। প্রতি ছয়জনে একজন আইনের চোখে শিশু, আর এই অংশের ক্ষেত্রে শিশু আইন প্রযোজ্য। দ্বিতীয় বিষয়, সবচেয়ে বড় অংশ ৩৬ শতাংশ ১৮ থেকে ২০ বছর বয়সী। আইনের চোখে তারা প্রাপ্তবয়স্ক, তাই তাদের বিরুদ্ধে সাধারণ ফৌজদারি আইনে মামলা, গ্রেফতার ও বিচার করতে কোনো বাধা নেই। অর্থাৎ আইনের জটিলতার যুক্তি তালিকার মাত্র ১৭ শতাংশের ক্ষেত্রে খাটে। বাকি ৮৩ শতাংশ ১৮ বছর বা তার বেশি বয়সী।
তৃতীয় বিষয়টি তালিকার ধরন নিয়ে। এটি পুলিশের গোয়েন্দা তথ্যের তালিকা, আদালতে দোষী প্রমাণিত ব্যক্তিদের তালিকা নয়। তালিকায় নাম থাকা মানেই কেউ অপরাধী প্রমাণিত হয়নি। পাঠককে এই পার্থক্য মাথায় রেখে সংখ্যাগুলো পড়তে হবে।
ঢাকার এলাকাভিত্তিক চিত্র
ডিএমপির তালিকায় চক্রের সংখ্যায় মিরপুর সবার ওপরে। সহিংসতায় এগিয়ে আছে মোহাম্মদপুর। এর মানে হলো, চক্রের সংখ্যা আর সহিংসতার মাত্রা এক জিনিস নয়। কোনো এলাকায় হয়তো ছিনতাই ও চাঁদাবাজি বেশি। অন্য এলাকায় চক্র কম হলেও হামলা ও সংঘর্ষ বেশি হতে পারে। নীতিনির্ধারকদের এই দুই ধরনের এলাকার জন্য আলাদা কৌশল নিতে হবে।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) ২০২৫ সালের সমীক্ষায় দেশে মাদকাসক্ত পাওয়া গেছে প্রায় ৮৩ লাখ। এর মধ্যে পুরুষ ৭৭ লাখ ৬০ হাজার, যা প্রায় ৯৩ দশমিক ৫ শতাংশ। নারী ২ লাখ ৮৫ হাজার, যা প্রায় ৩ দশমিক ৪ শতাংশ। শিশু ও কিশোর আছে ২ লাখ ৫৫ হাজার, যা প্রায় ৩ দশমিক ১ শতাংশ। তিন দল যোগ করলে মোট সংখ্যা প্রায় ৮৩ লাখই হয়। যে সংখ্যাটা খুবই ভয়াবহভাবে বেশি।
শতাংশের হিসাবে শিশু ও কিশোরের অংশ কম মনে হলেও সংখ্যায় এটি আড়াই লাখের বেশি। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মাদক চক্র শিশুদের মাদক বহনের কাজে লাগায়। কারণ শিশুদের কেউ সহজে সন্দেহ করে না এবং কম মজুরিতে তাদের পাওয়া যায়। এই কাজ করতে করতে অনেক শিশু নিজেই আসক্ত হয়ে পড়ে। ফলে একই শিশু একই সঙ্গে অপরাধী ও ভুক্তভোগী হয়ে ওঠে। আইনে এই দুই অবস্থানের স্বীকৃতি আছে, কিন্তু প্রয়োগে সেটা কম দেখা যায়।
আইনি কাঠামো
শিশু আইন ২০১৩
পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, শিশু আইন অনুযায়ী ১৮ বছর বা তার কম বয়সী অপরাধীকে উন্নয়ন কেন্দ্রে পাঠাতে হয়। তাদের বিরুদ্ধে মোবাইল কোর্ট করা যায় না, সাধারণ আদালতে বিচার করা যায় না এবং জেলেও রাখা যায় না। আইনের সাধারণ কাঠামো এই কথার সঙ্গে মেলে। এই আইনে ১৮ বছরের কম বয়সী যে কেউ শিশু। ১৯৭৪ সালের পুরনো শিশু আইনে এই বয়স ছিল ১৬ বছর। ২০১৩ সালে সরকার বয়স বাড়ায়, যা জাতিসংঘ শিশু অধিকার সনদের সঙ্গে মিলিয়ে।
শিশুদের বিচার হয় আলাদা শিশু আদালতে, সাধারণ ফৌজদারি আদালতে নয়। ৯ বছরের নিচের শিশুকে অপরাধী গণ্য করা যায় না। দণ্ডবিধির ৮২ ও ৮৩ ধারাও এই ধারণার সঙ্গে সম্পর্কিত। আইনে প্রতিটি থানায় শিশুবিষয়ক পুলিশ কর্মকর্তা রাখার বিধান আছে। শিশু আসামি হোক বা ভুক্তভোগী, তার মামলা সামলাবেন প্রশিক্ষিত কর্মকর্তা। সংশোধন ও পুনর্বাসনের জন্য আছে শিশু উন্নয়ন কেন্দ্র।
মোবাইল কোর্ট কেন প্রযোজ্য নয়?
মোবাইল কোর্ট আইন ২০০৯ অনুযায়ী নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ঘটনাস্থলেই তাৎক্ষণিক বিচার করে সাজা দিতে পারেন। কিন্তু শিশুর বিচারের জন্য শিশু আইন বিশেষ আদালত ঠিক করে দিয়েছে। শিশু আইনের বিধান অন্য প্রচলিত আইনের ওপর প্রাধান্য পায়। তাৎক্ষণিক বিচারে শিশুর সামাজিক পটভূমি, সংশোধনের সম্ভাবনা বা অভিভাবকের ভূমিকা যাচাই করার সুযোগ থাকে না। এ কারণেই মোবাইল কোর্টে শিশুকে সাজা দেওয়া যায় না।
কারাগারে কেন নয়?
শিশু আইনের মূল দর্শন এবং আন্তর্জাতিক নীতি একই কথা বলে। কারাগারে প্রাপ্তবয়স্ক অপরাধীদের সঙ্গে রাখলে শিশু শুধরে যায় না। বরং সে অপরাধজগতের আরও গভীরে চলে যায়। তাই আইন কারাগারকে শেষ বিকল্প হিসেবেও রাখেনি। তার বদলে শিশুর জন্য আলাদা উন্নয়ন কেন্দ্র ঠিক করা হয়েছে।
আইনের মারপ্যাঁচ কি আসলে আছে?
পুলিশ কর্মকর্তারা আইনের জটিলতাকে বাধা বলছেন। কিন্তু কাঠামো ভালো করে দেখলে মনে হয়, সমস্যা আইনের অভাবে নয়, আইন প্রয়োগের ঘাটতিতে। নিচে সমস্যাগুলো আলাদা করে দেখা হলো।
প্রথম সমস্যা কঠোর হওয়ার সুযোগ নেই, ধারণাটি আংশিক সত্য। শিশুদের জন্য মোবাইল কোর্ট, সাধারণ আদালত ও কারাগার নিষিদ্ধ, এটা ঠিক। কিন্তু তার মানে এই নয় যে কোনো ব্যবস্থাই নেওয়া যায় না। শিশু আদালতে মামলা চলে। গ্রেফতার বা আটকের পর শিশুকে উন্নয়ন কেন্দ্রে রাখা যায়। আদালত নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য সংশোধনমূলক আদেশও দিতে পারে। ব্যবস্থা আছে, তবে সেটা শাস্তিমূলক নয়, সংশোধনমূলক।
দ্বিতীয় সমস্যা হলো প্রশিক্ষিত কর্মকর্তার বদলি, একটি প্রশাসনিক ফাঁক। প্রতিবেদনে একটি বড় প্রশাসনিক সমস্যার কথা এসেছে। শিশু অপরাধ সামলানোর প্রশিক্ষণ পাওয়া কর্মকর্তাকে প্রায়ই অন্য জায়গায় বদলি করা হয়। কখনো একই থানায় তাঁকে অন্য দায়িত্ব দেওয়া হয়। ফলে আইনে বিশেষ কর্মকর্তার বিধান থাকলেও বাস্তবে সেই কর্মকর্তাকে পাওয়া যায় না। এটা প্রশাসনিক নীতির ব্যর্থতা। প্রশিক্ষিত কর্মকর্তাকে নির্দিষ্ট মেয়াদ একই দায়িত্বে রাখতে হবে। বদলির জন্য আলাদা নীতিমালাও দরকার।
এছাড়া, শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রের সংখ্যা সীমিত। একদিনে ২০০ থেকে ৩০০ জন আটক হলে সবাইকে কেন্দ্রে রাখা বাস্তবে সম্ভব নয়। যে ব্যবস্থায় সক্ষমতার চেয়ে আটকের সংখ্যা বেশি, সেখানে পুলিশের সামনে দুটি পথ থাকে। হয় ছেড়ে দিতে হয়, নয়তো নিয়ম ভেঙে আটকে রাখতে হয়। দুই পথেই ক্ষতি হয়।ল
আরেকটি সমস্যা হোল ১৮ বছরই শিশু আর প্রাপ্তবয়স্কের আইনি সীমারেখা, তাই বয়স নিয়ে বিতর্ক হয়। জন্মনিবন্ধন সনদ না থাকলে বা সনদে ভুল থাকলে সমস্যা বাড়ে। কোনো প্রাপ্তবয়স্ক আসামি নিজেকে শিশু দাবি করে সুবিধা নিতে পারে। আবার কোনো শিশুকে ভুল করে প্রাপ্তবয়স্ক ধরে আটক বা বিচার করার ঝুঁকিও থাকে। ডিএমপির তালিকার ৩৬ শতাংশ ১৮ বছরের ঠিক ওপরে, অর্থাৎ বড় একটি অংশ সীমারেখার কাছাকাছি। তাই বয়স যাচাইয়ের পদ্ধতি স্বচ্ছ হওয়া জরুরি।
এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কিশোরদের মাদক বহন, দখল ও চাঁদাবাজির কাজে লাগানো হচ্ছে। আইনের সবচেয়ে কার্যকর হাতিয়ার এখানেই আছে। শিশু শিশু আইনের আওতায় পড়লেও যে প্রাপ্তবয়স্ক তাকে ব্যবহার করে, তার বিচার হয় সাধারণ ফৌজদারি আইনে। দণ্ডবিধির ১০৭ ধারায় অপরাধে প্ররোচনা দেওয়া শাস্তিযোগ্য। ১২০ক ও ১২০খ ধারায় ফৌজদারি ষড়যন্ত্রের বিচার হয়। ৩৪ ও ১৪৯ ধারায় অভিন্ন উদ্দেশ্যে করা অপরাধে সবাই দায়ী হয়। চাঁদাবাজি, ছিনতাই ও হত্যার জন্য আছে ৩৮৪, ৩৯২ ও ৩০২ ধারা। মাদক ব্যবসায় জড়িতদের বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন ২০১৮ প্রযোজ্য।
সমাধান কোন পথে?
আইন সংস্কারের দিক থেকে
সংস্কারের প্রথম কাজ ১৮ থেকে ২১ বছর বয়সীদের জন্য মাঝামাঝি একটি কাঠামো তৈরি করা। প্রথমবার অপরাধ করলে তারা কারাদণ্ডের বদলে প্রবেশন, সমাজসেবা ও সংশোধনমূলক কর্মসূচির সুযোগ পাবে। দ্বিতীয় কাজ, শিশুকে অপরাধে ব্যবহারকারীর জন্য আলাদা ও কঠোর শাস্তির স্পষ্ট বিধান করা এবং সেটা কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা। তৃতীয় কাজ, বয়স যাচাইয়ের স্বচ্ছ নিয়ম বানানো।
প্রশাসনিক ও অবকাঠামোগত দিক থেকে
পুলিশ সদর দপ্তর শিশুবিষয়ক কর্মকর্তাকে নির্দিষ্ট মেয়াদ একই দায়িত্বে রাখার নীতিমালা করতে পারে। সরকার জেলাভিত্তিক শিশু উন্নয়ন কেন্দ্র ও শিশু আদালত বাড়াতে পারে, যাতে প্রতিটি জেলার সক্ষমতা তৈরি হয়। আটক, মামলা, শিশু আদালতে পাঠানো ও পুনর্বাসনের সংখ্যা নিয়মিত প্রকাশ করাও জরুরি। এই তথ্য ছাড়া অভিযানের ফল বোঝা যাবে না।
সংখ্যা ও আইন মিলিয়ে কী বোঝা যায়
সংখ্যা আর আইন পাশাপাশি রাখলে চারটি বিষয় পরিষ্কার হয়। প্রথমত, সমস্যার একটি বড় অংশ ১৮ থেকে ২০ বছর বয়সীদের মধ্যে। তাদের ক্ষেত্রে শিশু আইন প্রযোজ্যই নয়। তাই শুধু শিশু আইনকে দোষ দিয়ে পুরো সংকটের ব্যাখ্যা হয় না। দ্বিতীয়ত, শিশু আইনের কাঠামো আছে। কিন্তু কর্মকর্তাদের স্থায়িত্ব, কেন্দ্রের সংখ্যা ও আদালতের সক্ষমতার অভাবে সেই কাজ ঠিক মতো হচ্ছে না।
তৃতীয়ত, শিশুকে ব্যবহারকারী প্রাপ্তবয়স্কদের বিরুদ্ধে সাধারণ আইনে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ আগে থেকেই আছে। কিন্তু অভিযানের গতি দেখে মনে হয়, ধরা পড়ছে মূলত মাঠের কিশোররা। চতুর্থত, অভিযানে দিনে ২০০ থেকে ৩০০ আটকের সংখ্যা এক জিনিস। পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়ার তথ্য আরেক জিনিস। শেষের তথ্য না পেলে সাফল্য বা ব্যর্থতার মূল্যায়ন করা সম্ভব নয়।
শেষ কথা, কিশোর অপরাধ দমনে শিশুদের কারাগারে পাঠালে সমস্যা কমবে, এমন প্রমাণ নেই। বরং অপরাধজগতের সঙ্গে তাদের পরিচয় আরও গভীর হওয়ার ঝুঁকি থাকে। আইনি লড়াইয়ের সবচেয়ে জোরালো জায়গা হলো যারা শিশুকে ব্যবহার করছে, তাদের বিচার করা। একই সঙ্গে শিশু আইনের কাঠামোকে কার্যকর করতে হবে।
অভিযান ধরপাকড় দিয়ে শুরু হতে পারে। কিন্তু টেকসই সমাধান আসবে প্রশিক্ষিত জনবল, পর্যাপ্ত সংশোধন কেন্দ্র, মাদকচক্র দমন এবং ১৮ থেকে ২০ বছর বয়সীদের জন্য বিশেষ কাঠামোর মধ্য দিয়ে।

