বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ হত্যা মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি নিয়ে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। বিচারিক আদালত ও হাইকোর্টে ২৫ আসামির সাজা বহাল থাকলেও মামলাটি এখনো আপিল বিভাগে নিষ্পত্তি হয়নি।
আসামিপক্ষের আইনজীবীদের আশঙ্কা, আপিল বিভাগের কার্যতালিকার জট ও মামলার বর্তমান অবস্থার কারণে শুনানি শুরু হতে আরও চার থেকে পাঁচ বছর সময় লাগতে পারে।
তবে রাষ্ট্রপক্ষ বলছে, আপিল বিভাগে শুনানি শুরু হলে তারা কোনো ধরনের বিলম্ব করবে না। একই সঙ্গে কোনো নির্দোষ ব্যক্তি যেন সাজা না পান, সেটিও নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
বিচারিক আদালত ও হাইকোর্টে বহাল সাজা
২০১৯ সালের ৬ অক্টোবর রাতে বুয়েটের শেরেবাংলা হলে আবরার ফাহাদকে নির্যাতন করে হত্যা করা হয়। তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক প্রকৌশল বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের এই শিক্ষার্থীকে হত্যার ঘটনায় দেশজুড়ে ব্যাপক প্রতিবাদ হয়।
মামলার বিচার শেষে ২০২১ সালের ডিসেম্বরে ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল ১ ২০ আসামিকে মৃত্যুদণ্ড এবং পাঁচজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন।
পরে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের সাজা অনুমোদনের জন্য মামলাটি ডেথ রেফারেন্স হিসেবে হাইকোর্টে যায়। একই সঙ্গে আসামিরা আপিল ও জেল আপিল করেন।
দীর্ঘ শুনানি শেষে হাইকোর্ট ২০২৫ সালের ১৬ মার্চ বিচারিক আদালতের রায় বহাল রাখেন। এর আগে ২৪ ফেব্রুয়ারি মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ রাখা হয়েছিল।
হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে কয়েকজন আসামি আপিল বিভাগে আবেদন করেছেন। তবে এখনো এসব আবেদনের চূড়ান্ত শুনানি হয়নি।
চার থেকে পাঁচ বছর লাগার আশঙ্কা
মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত দুই আসামি মেফতাহুল ইসলাম জিয়ন ও মোর্শেদ অমর্ত্য ইসলামের পক্ষে সুপ্রিম কোর্টে লড়ছেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী আজিজুর রহমান দুলু।
তিনি বলেন, মামলার বর্তমান অবস্থা এবং আপিল বিভাগের কার্যতালিকার জট বিবেচনায় শুনানি শুরু হতে আরও চার থেকে পাঁচ বছর সময় লাগতে পারে।
আইনজীবী দুলুর দাবি, তাঁর দুই মক্কেলই নির্দোষ। তারা দীর্ঘদিন ধরে কারাগারে আছেন।
মেফতাহুল ইসলাম জিয়নের বিষয়ে তিনি বলেন, জিয়ন শারীরিকভাবে অক্ষম ছিলেন এবং তাঁর হাতের লিগামেন্ট ছেঁড়া ছিল। এমন অবস্থায় কারও পক্ষে আবরারকে পিটিয়ে হত্যা করা সম্ভব নয় বলে দাবি করেন তিনি।
অন্যদিকে মোর্শেদ অমর্ত্য ইসলাম ঘটনার সময় রাজশাহীতে ছিলেন বলে দাবি করেন এই আইনজীবী। তাঁর ভাষ্য, সিআইডি সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে যে প্রায় ২০ জন শিক্ষার্থীকে চিহ্নিত করেছিল, সেই তালিকাতেও অমর্ত্যের নাম ছিল না।
তবু তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে বলে দাবি করে আইনজীবী বলেন, আপিল বিভাগে পূর্ণাঙ্গ শুনানি হলে তাঁর মক্কেলরা ন্যায়বিচার পাবেন বলে তিনি আশা করেন।
রাষ্ট্রপক্ষের অবস্থান কী
অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেন, প্রকৃত অপরাধীর শাস্তি নিশ্চিত করার পাশাপাশি কোনো নির্দোষ ব্যক্তি যেন সাজা না পান, সেটিও রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়িত্ব।
তিনি বলেন, অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয় কোনো মামলা অন্ধভাবে পরিচালনা করে না। সবার জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত করাই রাষ্ট্রপক্ষের লক্ষ্য।
আপিল শুনানিতে বিলম্ব প্রসঙ্গে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, বিচারিক আদালতের মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হাইকোর্টে বহাল থাকলে দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদেরই আপিল বিভাগে যাওয়ার প্রাথমিক দায়িত্ব থাকে। সেখানে রাষ্ট্রপক্ষ বিবাদী হিসেবে থাকে।
তিনি বলেন, রাষ্ট্রপক্ষের কারণে মামলার শুনানি বিলম্বিত হওয়ার সুযোগ নেই।
অ্যাটর্নি জেনারেল আরও বলেন, একজন নিরপরাধ ব্যক্তিও যেন অন্যায়ের শিকার না হন, সেটি নিশ্চিত করা জরুরি। কারও সাজা তার অপরাধের তুলনায় বেশি হয়ে গেছে কি না বা হাইকোর্টের রায়ে কোনো আইনি ত্রুটি আছে কি না, তা আপিল বিভাগ পর্যালোচনা করবে।
বিচারক সংকট ও মামলার জট
মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে বিচারক সংকট ও বিচারাধীন মামলার সংখ্যা বড় বাধা বলে উল্লেখ করেন অ্যাটর্নি জেনারেল।
তবে জনগুরুত্বপূর্ণ মামলাগুলোর আপিল দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য তাঁর কার্যালয় কাজ করছে বলে জানান তিনি।
হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ
হাইকোর্টের রায়ে বলা হয়, ভিন্নমত পোষণ করা কোনো অপরাধ নয়। রাজনৈতিক পরিচয় বা সন্দেহের কারণে কাউকে পরিকল্পিতভাবে মারধর করে হত্যা গ্রহণযোগ্য নয়।
আদালত বুয়েটের আবাসিক হলে রাজনৈতিক আধিপত্য এবং গেস্টরুমে নির্যাতনের সংস্কৃতির সমালোচনা করেন। এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি বন্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির প্রয়োজন বলেও পর্যবেক্ষণে উল্লেখ করা হয়।
ঘটনার সময় সেখানে থাকা আসামিদের কেউ আবরারকে রক্ষা করতে বা নির্যাতন বন্ধ করতে এগিয়ে আসেননি বলেও আদালতের পর্যবেক্ষণে উঠে আসে।
আদালত আরও বলেন, দীর্ঘ সময় ধরে এমন ঘটনা চললেও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও হল কর্তৃপক্ষ যথাযথভাবে এগিয়ে না আসা সামগ্রিক ব্যর্থতার প্রকাশ।
মৃত্যুদণ্ড বহাল ২০ আসামি
হাইকোর্টে মৃত্যুদণ্ড বহাল থাকা ২০ আসামি হলেন মেহেদী হাসান রাসেল, মো. অনিক সরকার, মেহেদী হাসান রবিন, ইফতি মোশাররফ সকাল, মো. মনিরুজ্জামান মনির, মো. মেফতাহুল ইসলাম জিয়ন, মো. মাজেদুর রহমান মাজেদ, মো. মুজাহিদুর রহমান, খন্দকার তাবাককারুল ইসলাম তানভীর, হোসাইন মোহাম্মদ তোহা, মো. শামীম বিল্লাহ, এ এস এম নাজমুস সাদাত, মোর্শেদ অমর্ত্য ইসলাম, মুনতাসির আল জেমি, মো. শামসুল আরেফিন রাফাত, মো. মিজানুর রহমান, এস এম মাহমুদ সেতু, মোর্শেদ উজ জামান মণ্ডল জিসান, এহতেশামুল রাব্বি তানিম এবং মুজতবা রাফিদ।
যাবজ্জীবন বহাল পাঁচজন
যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বহাল থাকা পাঁচ আসামি হলেন মুহতাসিম ফুয়াদ হোসেন, মো. আকাশ হোসেন, মুয়াজ আবু হুরায়রা, অমিত সাহা ও ইশতিয়াক আহমেদ মুন্না।
বিচারিক আদালতের রায়ের সময় তিন আসামি পলাতক ছিলেন। তারা হলেন মোর্শেদ উজ জামান মণ্ডল জিসান, এহতেশামুল রাব্বি তানিম ও মুজতবা রাফিদ।
কারাগার থেকে পালিয়ে আত্মসমর্পণ
২০২৪ সালের ৬ আগস্ট ছাত্র জনতার অভ্যুত্থানের পর গাজীপুরের কাশিমপুর হাই সিকিউরিটি কেন্দ্রীয় কারাগারে অস্থিতিশীল পরিস্থিতির সুযোগে কয়েকজন বন্দি পালিয়ে যান। তাদের মধ্যে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি মুনতাসির আল জেমিও ছিলেন।
পরে ২০২৪ সালের ৮ সেপ্টেম্বর তিনি ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল ১ এর বিচারক মো. রফিকুল ইসলামের আদালতে আত্মসমর্পণ করেন।
আদালত তাঁর জামিন আবেদন নাকচ করে আবার কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
আবরার হত্যা মামলায় দুই ধাপে সর্বোচ্চ সাজা বহাল হয়েছে। তবে আপিল বিভাগের শুনানি শেষ না হওয়ায় মামলাটির বিচারিক প্রক্রিয়া এখনো পুরোপুরি শেষ হয়নি। ফলে দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়ার পর চূড়ান্ত নিষ্পত্তির জন্য এখন সর্বোচ্চ আদালতের শুনানির দিকেই তাকিয়ে আছেন সংশ্লিষ্টরা।

