একজন মানুষ মারা গেলে স্বজনদের সামনে প্রথমে আসে শোক। কিন্তু ঢাকায় সেই শোক সামলানোর আগেই শুরু হয় আরেক দুশ্চিন্তা। অ্যাম্বুলেন্স কোথা থেকে আসবে, কাফন কিনতে কত লাগবে, লাশ রাখতে ফ্রিজিং ভ্যানের খরচ কত, কবর কোথায় হবে, কবর খুঁড়তে কত টাকা লাগবে, এরপর আত্মীয়স্বজনকে খাওয়ানোর সামর্থ্য আছে কি না।
মৃত্যুর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই একটি পরিবারকে এসব হিসাব করতে হয়। আর এই হিসাব সবচেয়ে কঠিন হয়ে দাঁড়ায় নিম্নবিত্ত ও খেটে খাওয়া মানুষের জন্য। কারণ তাদের হাতে অনেক সময় একসঙ্গে কয়েক হাজার টাকা নগদও থাকে না।
ঢাকার বিভিন্ন কবরস্থান, ফ্রিজিং ভ্যান, কাফনের দোকান ও খাবারের খরচের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, একজন মানুষের দাফনের প্রাথমিক খরচই ১০ হাজার টাকার ওপরে যেতে পারে। কোথাও আবার কবর সংরক্ষণ করতে চাইলে সেই খরচ লাখ থেকে কোটি টাকায় পৌঁছায়।
প্রশ্ন হলো, মৃত্যুর পর এই খরচের ভার সবচেয়ে বেশি কে বহন করছে?
বাবার কোচিংয়ের টাকা দিয়েই বাবার দাফন
মাহমুদ সাজালের বয়স তখন মাত্র ২০ বছর। কলেজে ভর্তির প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন তিনি। হঠাৎ মারা গেলেন তাঁর বাবা।
বাবার মরদেহ বাড়িতে নেওয়া, দাফনের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কেনা, সবকিছু দ্রুত করতে হয়েছিল। তখন বাবাই তাঁর ভর্তি কোচিংয়ের জন্য যে টাকা দিয়েছিলেন, সেই টাকা দিয়েই দাফনের খরচ মেটান সাজাল।
তিনি বলেন, তখন কারও কাছে টাকা ধার করার কথা মাথায় আসেনি।
এই একটি ঘটনাই দেখায়, মৃত্যু শুধু একটি পরিবারকে শোকের মধ্যে ফেলে না। অনেক সময় পরিবারের ভবিষ্যতের জন্য রাখা টাকাও সেদিনই শেষ হয়ে যায়।
মৃত্যুর প্রথম কয়েক ঘণ্টাতেই কয়েক হাজার টাকা
ঢাকায় লাশ পরিবহনের খরচ জায়গাভেদে বদলে যায়। একজন ফ্রিজিং ভ্যান চালকের তথ্য অনুযায়ী, স্কয়ার হাসপাতাল থেকে আজিমপুর কবরস্থানে লাশ নিতে এখন প্রায় ৫ হাজার টাকা লাগে। কোভিডের সময় একই পথের জন্য খরচ ছিল প্রায় ৩ হাজার টাকা।
ঢাকার বাইরে টাঙ্গাইলের মতো কোনো জেলায় লাশ নিতে হলে খরচ দাঁড়ায় ১০ হাজার থেকে ১২ হাজার টাকা। কবরস্থানে অপেক্ষা করতে হলে প্রতি ঘণ্টায় আরও ৫০০ টাকা দিতে হয়।
এরপর আসে কাফনের খরচ।
মোহাম্মদপুর টাউন হল মার্কেটের এক দোকানির হিসাবে, পুরুষের তিন টুকরার কাফনের দাম এখন প্রায় ১১০০ টাকা। পাঁচ বছর আগে তা ছিল প্রায় ৯০০ টাকা।
নারীর পাঁচ টুকরার কাফনের দাম এখন ১৬০০ থেকে ১৭০০ টাকা।
লাশ গোসলের জন্য আতর, কর্পূর ও সাবানের একটি প্যাকেজ কিনতে খরচ হয় ২৫০০ থেকে ৩০০০ টাকা। পাঁচ বছর আগে একই ধরনের প্যাকেজের দাম ছিল ১ হাজার টাকার কম।
ঢাকার বাইরে লাশ নিতে কফিনের প্রয়োজন হলে আরও ১১০০ থেকে ১৫০০ টাকা যোগ হয়। অর্থাৎ মৃত্যুর পর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই একটি পরিবারকে একাধিক খরচ সামলাতে হয়।
কবরেও ঢাকার দুই হিসাব
লাশ প্রস্তুত করার পর আসে দাফনের পালা। এখানেও ঢাকায় একক কোনো হিসাব নেই।
ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের কবরস্থান ব্যবস্থাপনায় রয়েছে আলাদা নিয়ম ও আলাদা খরচ। দক্ষিণ সিটির আজিমপুর কবরস্থানে দাফনের নিবন্ধন ফি ১ হাজার টাকা। কবর খোঁড়া, বাঁশ ও চাটাইয়ের জন্য আরও প্রায় ১ হাজার থেকে ১২০০ টাকা লাগে।
সেখানে সাধারণভাবে ১৮ মাস পর একই কবরে আবার দাফন করা হয়।
অন্যদিকে উত্তর সিটির ছয়টি কবরস্থান হলো বনানী, মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী, রায়েরবাজার এবং উত্তরার ৪, ১২ ও ১৪ নম্বর সেক্টর। এখানে সাধারণ মানুষের দাফনের নিবন্ধন ফি ৫০০ টাকা। গরিব ও অসহায় মানুষের জন্য তা ১০০ টাকা। কেউ এই ১০০ টাকাও দিতে না পারলে বিনা মূল্যে দাফনের সুযোগ রয়েছে।
তবে বাঁশ ও কবর খোঁড়ার জন্য আলাদা খরচ আছে। প্রতিটি কবরস্থানে এই খরচের পরিমাণ একই কি না, সে তথ্য পাওয়া যায়নি।
সরকারি তথ্যেও মিলছে না সব হিসাব
দাফনের খরচের সঙ্গে আরেকটি সমস্যা হলো তথ্যের অস্পষ্টতা। দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ওয়েবসাইটে এখনো কবর সংরক্ষণের বিভিন্ন হার দেখা যায়। কিন্তু করপোরেশনের একটি সূত্র বলছে, ওয়েবসাইটটি বহু বছর ধরে নিয়মিত হালনাগাদ করা হয়নি।
ফলে একজন সাধারণ মানুষ ওয়েবসাইট দেখে যে তথ্য নিয়ে কবরস্থানে যাবেন, সেখানে গিয়ে ভিন্ন অঙ্কের মুখোমুখি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। মৃত্যুর পর এমন পরিস্থিতিতে দরদাম বা তথ্য যাচাই করার সুযোগও থাকে না পরিবারের।
ঢাকায় কবরের জায়গাই এখন বড় সংকট
দাফনের খরচ কেন বাড়ছে, তার পেছনে একটি বড় কারণ হলো জায়গার সংকট। বণিক বার্তার এক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, উত্তর সিটি করপোরেশনের হাতে কবরস্থানের জমি রয়েছে ১৯২ একর। দক্ষিণ সিটির হাতে রয়েছে ৫৯ একর।
দক্ষিণের সবচেয়ে বড় কবরস্থান আজিমপুরের আয়তন ৩৭ দশমিক ৫ একর। সেখানে প্রায় ২৫ হাজার কবরের জায়গা রয়েছে। এর মধ্যে ২ হাজার ৬০০ কবর আগে থেকেই সংরক্ষিত।
জাতিসংঘের হিসাব উদ্ধৃত করে ওই প্রতিবেদনে ঢাকার জনসংখ্যা ৩ কোটি ৫০ লাখ বা তার বেশি বলা হয়েছে। এক বিশেষজ্ঞের হিসাবে, এই বিশাল জনগোষ্ঠীর জন্য ঢাকায় প্রায় ৪০০ থেকে ৫০০ একর কবরস্থানের জমি প্রয়োজন। অর্থাৎ বর্তমান জমির প্রায় দ্বিগুণ জায়গা দরকার হতে পারে।
কিন্তু ঢাকায় নতুন জমি পাওয়া কঠিন। জমির দামও অত্যন্ত বেশি।
উত্তরা ৪ নম্বর সেক্টরের নতুন কবরস্থানটি এর একটি উদাহরণ। মাত্র ১ দশমিক ২২৮ একর জমিতে ৫ হাজার কবরের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এটি তৈরি করতে খরচ হয়েছে ৪ কোটি ৬৭ লাখ টাকা। অর্থাৎ নতুন কবরস্থান তৈরি করাও এখন বড় ধরনের ব্যয়ের বিষয়।
দাফনের চেয়ে কবর সংরক্ষণে কেন এত টাকা?
কবরের জায়গার সংকট থেকেই আসে আরেকটি বড় প্রশ্ন। একটি কবর সংরক্ষণ করতে এত টাকা কেন লাগবে?
উত্তর সিটি করপোরেশনের তৎকালীন মেয়র আতিকুল ইসলাম বলেছিলেন, এই বাড়তি ফি দাফনের জন্য নয়, কবর সংরক্ষণের জন্য। তাঁর যুক্তি ছিল, সবাই কবর সংরক্ষণ করে রাখলে নতুন করে দাফনের জায়গা পাওয়া যাবে না।
বনানী কবরস্থানের মহুরি হারুন অর রশিদও একই কারণের কথা জানিয়েছেন। ২০২৩ সালের নীতিমালায় উত্তর সিটি করপোরেশন ১৫ বছরের কবর সংরক্ষণ ফি ২৪ লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে সর্বোচ্চ ১ কোটি টাকা এবং ২৫ বছরের ফি ৪৫ লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে সর্বোচ্চ দেড় কোটি টাকা করে।
তবে বনানী কবরস্থানের মহুরির হিসাবে বর্তমানে ১৫ বছরের জন্য প্রায় ৩ কোটি টাকা এবং ২৫ বছরের জন্য প্রায় ৪ কোটি ৫০ লাখ টাকা লাগে। মিরপুরে ১৫ ও ২৫ বছরের জন্য যথাক্রমে ২০ লাখ ও ৩০ লাখ টাকা এবং রায়েরবাজারে ১০ লাখ ও ১৫ লাখ টাকা লাগার তথ্য পাওয়া গেছে।
তবে বিভিন্ন সূত্রে পাওয়া অঙ্কের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। তাই বর্তমান হার কবরস্থানের অফিস থেকেই নিশ্চিত করা প্রয়োজন। উত্তর সিটির ছয়টি কবরস্থানেই আগাম কবর সংরক্ষণ বন্ধ রয়েছে। তবে জায়গা থাকলে সীমিত পরিসরে অনুমতি নিয়ে সংরক্ষণের সুযোগ রয়েছে।
নগর পরিকল্পনাবিদ আখতার মাহমুদের মতে, সংরক্ষণ নিরুৎসাহিত করতেই ফি এত বেশি রাখা হয়েছে। তবে শুধু ফি বাড়িয়ে কবরস্থানের জায়গার সংকটের সমাধান হবে না বলেও তিনি মত দিয়েছেন।
একজন মানুষের দাফনে অন্তত ১০ হাজার টাকা
এবার একটি পরিবারের প্রাথমিক খরচের হিসাব করা যাক।
আজিমপুরে একজন পুরুষের দাফনের ক্ষেত্রে ফ্রিজিং ভ্যান, কাফন, গোসলের সামগ্রী, নিবন্ধন এবং কবর খোঁড়ার খরচ মিলিয়ে প্রায় ১০ হাজার ৬০০ থেকে ১১ হাজার ৩০০ টাকা লাগে।
এটি উপরের তথ্যের ভিত্তিতে করা হিসাব। এর মধ্যে খাবারের খরচ ধরা হয়নি।
অর্থাৎ পরিবারের কেউ মারা যাওয়ার পর শুধু দাফনের প্রস্তুতি নিতেই ১০ হাজার টাকার বেশি প্রয়োজন হতে পারে। আর যদি লাশ ঢাকার বাইরে নিতে হয়, তাহলে খরচ আরও বাড়বে।
সবচেয়ে বেশি চাপে দিনমজুর ও নিম্নআয়ের পরিবার
একজন উচ্চ আয়ের মানুষের জন্য ১০ হাজার টাকা হয়তো বড় অঙ্ক নয়। কিন্তু যাঁর আয় প্রতিদিনের কাজের ওপর নির্ভরশীল, তাঁর জন্য এই টাকা জোগাড় করা কঠিন।
দিনমজুর, রিকশাচালক, পোশাকশ্রমিক কিংবা নিম্নআয়ের অন্য কোনো পরিবারের কথা ভাবুন। তাঁদের হাতে হয়তো সারা মাসের সঞ্চয়ও নেই। অথচ মৃত্যুর পর অ্যাম্বুলেন্স, কাফন, গোসল ও দাফনের টাকা কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই দিতে হয়।
সময় নিয়ে সস্তা সেবা খোঁজার সুযোগ থাকে না। দরদাম করার সুযোগও সীমিত। তখন অনেক পরিবার আত্মীয়স্বজনের কাছে যায়। প্রতিবেশীর কাছ থেকে ধার নেয়। কেউ সন্তানের পড়াশোনার জন্য রাখা টাকা খরচ করে।
মাহমুদ সাজালের মতো কারও ক্ষেত্রে সেই টাকা হয়তো আবার সন্তানের ভবিষ্যতের জন্যই রাখা ছিল। এখানেই দাফনের খরচ শুধু আর্থিক সমস্যা থাকে না। এটি একটি পরিবারের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাকেও নাড়িয়ে দিতে পারে।
গরিবদের জন্য সুবিধা আছে, কিন্তু সীমিত
উত্তর সিটি করপোরেশনের ১০০ টাকা এবং বিনা মূল্যে দাফনের ব্যবস্থা নিম্নআয়ের পরিবারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সহায়তা।
কিন্তু এই সুবিধা মূলত দাফনের নিবন্ধন ফিকে ঘিরে। অ্যাম্বুলেন্সের টাকা, কাফনের টাকা, গোসলের সামগ্রী কিংবা লাশ পরিবহনের অন্যান্য খরচ তখনও পরিবারকেই বহন করতে হয়।
এই খরচগুলোর জন্য সিটি করপোরেশনের কোনো সহায়তা রয়েছে কি না, সে বিষয়ে তথ্য পাওয়া যায়নি। ফলে কবরের নিবন্ধন ফি কম হলেও একটি দরিদ্র পরিবারের মোট খরচ খুব বেশি কমে যাচ্ছে না।
সমস্যার আরেক নাম তথ্যের ঘাটতি
এই প্রতিবেদনে আরও একটি বিষয় সামনে এসেছে। দাফনের খরচ সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য ও হালনাগাদ তথ্য এক জায়গায় পাওয়া কঠিন।
কোনো কবরস্থানে কত টাকা লাগে, কবর সংরক্ষণের বর্তমান হার কত, গরিব পরিবারের জন্য কী সুবিধা রয়েছে, কোথায় বিনা মূল্যে দাফন করা যায়, এসব তথ্য সহজে পাওয়া গেলে পরিবারের ওপর অন্তত একটি চাপ কমত।
কিন্তু ওয়েবসাইটে পুরোনো তথ্য থাকলে কিংবা বিভিন্ন জায়গায় ভিন্ন অঙ্ক পাওয়া গেলে বিপদে পড়তে হয় সাধারণ মানুষকেই।
কী করা যেতে পারে
প্রথম কাজ হতে পারে প্রতিটি কবরস্থানে দাফন ও অন্যান্য সেবার হালনাগাদ মূল্যতালিকা প্রকাশ করা। সেই তালিকা কবরস্থানের প্রবেশপথে দৃশ্যমানভাবে টাঙানোর পাশাপাশি সিটি করপোরেশনের ওয়েবসাইটেও নিয়মিত হালনাগাদ করা দরকার।
দ্বিতীয়ত, নিম্নআয়ের মানুষের জন্য শুধু কবরের নিবন্ধন নয়, অ্যাম্বুলেন্স, কাফন ও অন্যান্য জরুরি খরচেও সহায়তার ব্যবস্থা করা যায় কি না, তা বিবেচনা করা প্রয়োজন।
তৃতীয়ত, দীর্ঘমেয়াদে ঢাকার কবরস্থানের জায়গার সংকট মোকাবিলায় নতুন পরিকল্পনা দরকার। বণিক বার্তার প্রতিবেদনে কিছু শহরের সবুজ কবরস্থান ও বহুতল কবরের ব্যবস্থার কথা এসেছে। ঢাকার জন্য কোন ব্যবস্থা বাস্তবসম্মত, সেটি নগর পরিকল্পনাবিদ, সিটি করপোরেশন ও সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের আলোচনার বিষয়।
তবে যে পথই নেওয়া হোক, আলোচনার কেন্দ্রে থাকা দরকার সাধারণ পরিবার। কারণ একজন মানুষ মারা যাওয়ার পর তাঁর স্বজনের হাতে থাকে না সময়, থাকে না মানসিক শক্তি। থাকে শুধু প্রিয়জনকে শেষবারের মতো সম্মানের সঙ্গে বিদায় জানানোর তাগিদ।
সেই বিদায় যেন টাকার অভাবে আরও একটি কষ্টে পরিণত না হয়, সেটিই এখন ঢাকার কবর ব্যবস্থাপনার বড় প্রশ্ন।

