বিশ্বের সেরা ৫০০ শহরের তালিকায় এবার জায়গা পায়নি বাংলাদেশের কোনো শহর। যুক্তরাজ্যভিত্তিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান অক্সফোর্ড ইকোনমিকসের ২০২৬ সালের গ্লোবাল সিটিজ ইনডেক্সে গত বছর ৪৮২তম অবস্থানে থাকা ঢাকা এবার নেমে গেছে ৫১৫তমতে। এক বছরে ঢাকা পিছিয়েছে ৩৩ ধাপ। শুধু রাজধানী নয়, দেশের প্রায় সব বড় শহরের অবস্থানই আরও নিচে নেমেছে।
এই সূচকে ১৬৩টি দেশের এক হাজার শহরকে মূল্যায়ন করা হয়েছে। বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে পাঁচটি বিষয়: অর্থনীতি, মানবসম্পদ, জীবনযাত্রার মান, পরিবেশ ও শাসনব্যবস্থা। মোট ১০০ নম্বরের মধ্যে অর্থনীতির জন্য রাখা হয়েছে ৩০, মানবসম্পদ ও জীবনমানের জন্য ২৫ করে এবং পরিবেশ ও শাসনব্যবস্থার জন্য ১০ করে। সূচকে শুধু শীর্ষ ১০০ শহরের স্কোর প্রকাশ করা হয়েছে। বাংলাদেশের কোনো শহর সেই তালিকায় না থাকায় এসব শহরের সামগ্রিক স্কোর জানা যায়নি। শীর্ষ পাঁচ শহর নিউইয়র্ক, লন্ডন, প্যারিস, সিয়াটল ও সান ফ্রান্সিসকো। অর্থনীতির বড় আকার ও শক্তিশালী শ্রমবাজারের কারণে নিউইয়র্ক ও লন্ডন এগিয়ে আছে, আর জীবনযাত্রার মানে ভালো করেছে প্যারিস।
বাংলাদেশের আটটি শহরের মধ্যে অবস্থানের দিক থেকে ঢাকাই সবার ওপরে। তবে পিছিয়ে পড়ার ঘটনা অন্য শহরেও দেখা গেছে। গত এক বছরে সবচেয়ে বেশি পিছিয়েছে রাজশাহী। শহরটি ৬৬ ধাপ নেমে এখন ৭৭৯তম। চট্টগ্রাম ১৪ ধাপ পিছিয়ে হয়েছে ৭৬৩তম। বগুড়া ৩২ ধাপ নেমে ৯২৬তম অবস্থানে। খুলনা রয়েছে ৮১১তম, সিলেট ৮৩৪তম ও ময়মনসিংহ ৮৯৫তম অবস্থানে। দেশের শহরগুলোর মধ্যে শুধু কুমিল্লা আগের বছরের অবস্থান ধরে রেখেছে, ৮৮৩তম।
দক্ষিণ এশিয়ার প্রেক্ষাপটেও বাংলাদেশের শহরগুলো পিছিয়ে। অঞ্চলটির সবচেয়ে এগিয়ে থাকা শহর দিল্লি, বিশ্বে যার অবস্থান ২৬৮তম। এরপর আছে বেঙ্গালুরু ৩১১তম, মুম্বাই ৩৩০তম, চেন্নাই ৩৮১তম ও হায়দরাবাদ ৪২১তম। অর্থাৎ প্রতিবেশী দেশের প্রধান শহরগুলোর সঙ্গে তুলনাতেও বাংলাদেশের কোনো শহর কাছাকাছি নেই।
ঢাকার সামগ্রিক অবস্থান খারাপ হলেও কিছু সূচকে শহরটি তুলনামূলক ভালো করেছে। অর্থনীতির সূচকে বিশ্বে ঢাকার অবস্থান ২৮৬তম। জিডিপির আকার ও প্রবৃদ্ধি, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, মাথাপিছু জিডিপি, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, অর্থনৈতিক বৈচিত্র্য ও জনসংখ্যা বৃদ্ধির ভিত্তিতে এ সূচক তৈরি। এ ক্ষেত্রে চট্টগ্রাম ৭০২তম ও ময়মনসিংহ ৭৩৪তম। মানবসম্পদ সূচকেও ঢাকা এগিয়ে, অবস্থান ১৭৮তম। এরপর খুলনা ৫৪১তম ও রাজশাহী ৫৯৯তম। শিক্ষা, ব্যবসার পরিবেশ ও জনমিতিক প্রবণতার ভিত্তিতে এ সূচকের মূল্যায়ন হয়। তবে এই দুই সূচকের সুবিধা পরিবেশসহ অন্য ক্ষেত্রের দুর্বলতায় ঢাকা সামগ্রিক র্যাংকিংয়ে ধরে রাখতে পারেনি।
জীবনযাত্রার মানে দেশের শহরগুলোর মধ্যে সবচেয়ে এগিয়ে রাজশাহী। বিশ্বে শহরটির অবস্থান ৫৪২তম। এরপর আছে খুলনা ৬১২তম ও চট্টগ্রাম ৬৫৩তম। মানুষের সার্বিক জীবনমান, আর্থিক ও স্বাস্থ্যগত অবস্থা এবং নাগরিক সুবিধা পাওয়ার সুযোগ বিবেচনায় এ সূচক তৈরি হয়।
সবচেয়ে বড় দুর্বলতা দেখা গেছে পরিবেশ সূচকে। এ ক্ষেত্রে দেশের শহরগুলোর মধ্যে এগিয়ে থাকা সিলেটও রয়েছে ৭৩৫তম অবস্থানে। সবচেয়ে খারাপ অবস্থা খুলনার, ৯৭৪তম। ঢাকা ৯৩০তম, ময়মনসিংহ ৯৪০তম ও চট্টগ্রাম ৯২৪তম। একসময় সবুজ ও পরিচ্ছন্ন শহর হিসেবে পরিচিত রাজশাহীর অবস্থানও এখন ৮৫২তম।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক এম মিজানুর রহমান বলেন, রাজশাহীর পরিবেশ দিন দিন খারাপ হচ্ছে। বায়ুদূষণ অনেক বেড়েছে, নগরীর বড় বড় গাছ কাটা পড়েছে, তীব্র গরমে জনজীবন বিপন্ন হয়ে পড়ে। বরেন্দ্র এলাকায় পানির সংকট দীর্ঘদিনের, নদীগুলোও দূষিত হচ্ছে।
নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স অ্যান্ড ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট বিভাগের চেয়ারম্যান ড. মো. মহিনুজ্জামান বলেন, ঢাকা ও চট্টগ্রামে জলাবদ্ধতা ও পানির সংকট একসঙ্গে দেখা যায়। বৃষ্টিতে রাস্তা ডুবে যায়, অথচ বাসাবাড়িতে প্রয়োজনীয় পানির অভাব থাকে। এতে শহরগুলোর পরিবেশগত ঝুঁকির মাত্রা বোঝা যায়।
নগরজীবনের চাপের পেছনে জনসংখ্যা ও আবাসনের বিষয়টিও আছে। গবেষণা প্রতিষ্ঠান র্যাপিডের চেয়ারম্যান ড. আবদুর রাজ্জাকের মতে, শহরগুলো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ছাড়া বিশৃঙ্খলভাবে গড়ে উঠেছে। নগরায়ণের কারণে সামনে শহরে আবাসনের প্রয়োজন আরও বাড়বে। কিন্তু পরিবেশের মান ও নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত না করা গেলে ঘনবসতি ও অপ্রতুল সেবা বড় ঝুঁকি তৈরি করবে। অর্থনীতিতে ধীরগতি থাকলে আবাসন খাতের চাপ সামলানো আরও কঠিন হবে বলেও তিনি মনে করেন।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক ড. আখতার মাহমুদের হিসাবে, দেশের জিডিপির প্রায় ৬০ শতাংশ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ঢাকাকেন্দ্রিক। নদীভাঙন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, গ্রামীণ দারিদ্র্য ও বেকারত্বের কারণে বিপুলসংখ্যক মানুষ কাজের খোঁজে ঢাকায় আসেন। তাঁদের বড় অংশ বস্তি বা ভাসমান এলাকায় থাকেন। তিনি বলেন, ঢাকার চাপ কমাতে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিকেন্দ্রীকরণ জরুরি। জেলা, উপজেলা ও পৌরসভায় বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান এবং মানসম্মত শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা বাড়ানো গেলে রাজধানীমুখী জনস্রোত কমবে। তাঁর হিসাবে, দেশে বর্তমানে প্রায় ৮৮ লাখ আবাসনের ঘাটতি রয়েছে। সহজ শর্তে, কম সুদে ও দীর্ঘমেয়াদি ঋণ দেওয়া গেলে অনেকে নিজস্ব আবাসনের সুযোগ পাবেন। একই সঙ্গে জমির বাজারে সরকারি হস্তক্ষেপও দরকার, কারণ জমির দাম অস্বাভাবিক বাড়ায় অ্যাপার্টমেন্টের নির্মাণ ও বাজারমূল্য বাড়ছে।
নগর পরিকল্পনাবিদেরা বলছেন, শুধু নতুন অবকাঠামো গড়লেই শহরের সমস্যা মিটবে না। বিদ্যমান অবকাঠামোর দক্ষ ব্যবস্থাপনাও জরুরি। এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যেতে বেশি সময় লাগা, কাছাকাছি ভালো স্কুল-কলেজ না থাকা কিংবা বায়ু ও পানির মান কমে যাওয়া মানুষের জীবনযাত্রার পাশাপাশি শহরের উৎপাদনশীলতাকেও প্রভাবিত করে। অতিরিক্ত ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা পরিবেশবান্ধবভাবে পুনর্গঠন এবং নতুন অবকাঠামো নির্মাণে জনস্বাস্থ্য ও উৎপাদনশীলতাকে গুরুত্ব দেওয়ার কথাও তাঁরা বলছেন।
দেশের বড় শহরগুলোয় ‘আরবান হিট আইল্যান্ড’ পরিস্থিতিও তৈরি হয়েছে। এতে শহর দিনে ও রাতে অতিরিক্ত উত্তপ্ত থাকে। তাপমাত্রা বাড়ার ফলে মানুষের কাজের সক্ষমতা কমে এবং ডেঙ্গু ও হামসহ নানা রোগের প্রাদুর্ভাব বাড়তে পারে। এর প্রভাব পড়ে নগরবাসীর সামগ্রিক জীবনমানের ওপর।
তবে ঢাকার বর্তমান অবস্থাকে উন্নয়ন প্রক্রিয়ার একটি পর্যায় হিসেবে দেখছেন রাজউকের প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ মোহাম্মদ আশরাফুল ইসলাম। তাঁর ভাষ্য, উন্নয়নের সময় বিশ্বের অনেক শহরই পরিবেশগতভাবে খারাপ অবস্থার মধ্য দিয়ে গেছে। চীন ও জাপানের শহরের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, উন্নয়নকাজ শেষ হওয়ার পর ইটভাটা বন্ধসহ নানা উদ্যোগ নেওয়া হলে বায়ুদূষণ কমতে পারে, তখন পরিবেশ সূচকে শহরগুলোর অবস্থানও ভালো হবে। ড্যাপে পরিকল্পিত শহর গড়ার যেসব সুপারিশ ও মানদণ্ড দেওয়া হয়েছে, সেগুলো বাস্তবায়ন করা গেলে শহরকে আরও বাসযোগ্য ও কার্যকর করা সম্ভব বলেও তিনি মনে করেন।
এই সূচকের ফল আলাদা কোনো ঘটনা নয়। এর আগে ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের ২০২৬ সালের গ্লোবাল লিভেবিলিটি ইনডেক্সে ঢাকা বিশ্বের তৃতীয় বসবাসের অযোগ্য শহর হিসেবে স্থান পেয়েছে। দুটি আলাদা আন্তর্জাতিক সূচকেই রাজধানীসহ দেশের শহরগুলোর পরিবেশ, নাগরিক সুবিধা ও জীবনমান নিয়ে উদ্বেগের চিত্র উঠে এসেছে।
বিশ্লেষণে দেখা যায়, ঢাকা অর্থনীতি ও মানবসম্পদে এগিয়ে থাকলেও পরিবেশ ও নাগরিক সুবিধার দুর্বলতা সেই সুবিধা মুছে দিচ্ছে। একটি শহরের মান শুধু অর্থনীতির আকার দিয়ে মাপা যায় না। বাতাসের মান, পানি, যানজট, আবাসন ও সুশাসনও সমান গুরুত্বপূর্ণ। এই বাস্তবতায় সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, পরিকল্পিত উন্নয়ন ও পরিবেশ ব্যবস্থাপনায় সরকার ও নগর কর্তৃপক্ষ কতটা দ্রুত পদক্ষেপ নেয়। তা না হলে আগামী বছরগুলোতেও বৈশ্বিক তালিকায় বাংলাদেশের শহরগুলোর পিছিয়ে পড়ার ধারা অব্যাহত থাকার আশঙ্কা রয়েছে।

