একই পরিবারের একাধিক ব্যক্তি সারের ডিলারশিপ নিতে পারবেন না, সরকারের এই নীতিমালার ওপর হাইকোর্টের দেওয়া স্থিতাবস্থার আদেশ স্থগিত করেছেন আপিল বিভাগের চেম্বার আদালত। ফলে আপাতত নীতিমালা অনুযায়ী ডিলার নিয়োগের প্রক্রিয়া চালানোর পথে আইনি বাধা থাকল না বলে জানিয়েছেন অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল। তবে রিটকারীদের পক্ষ থেকে এ আদেশ নিয়ে কোনো প্রতিক্রিয়া এখনো জানা যায়নি।
আজ বুধবার আপিল বিভাগের চেম্বার বিচারপতি মো. রেজাউল হকের আদালত রাষ্ট্রপক্ষের আবেদনের ওপর শুনানি নিয়ে এ আদেশ দেন। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল ও ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবা জুঁই। রিটকারীদের পক্ষে শুনানি করেন অ্যাডভোকেট ইকরামুল হক টুটুল।
মামলার সূত্রপাত গতকাল মঙ্গলবার। পাঁচজন সার ডিলার নীতিমালার ওই অংশ চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে দুটি রিট করেন। অ্যাটর্নি জেনারেলের ভাষ্য অনুযায়ী, তাঁদের উদ্দেশ্য ছিল বিদ্যমান ডিলারশিপ যেন বাতিল না হয় এবং তাঁরা পারিবারিকভাবে আগের মতোই ব্যবসা চালিয়ে যেতে পারেন। শুনানির পর হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ নীতিমালার কার্যকারিতার ওপর স্থিতাবস্থা দেন। এর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষ গতকালই আপিল বিভাগে আবেদন করে। আজ চেম্বার আদালত নিয়মিত কার্যতালিকার বাইরে এটি শুনে হাইকোর্টের আদেশ স্থগিত করেন।
অ্যাটর্নি জেনারেল জানান, সার ডিলার ও সার বিতরণ নিয়ে ২০০৯ সালে একটি নীতিমালা ছিল। সেখানে একই পরিবারের একাধিক সদস্য ডিলার হতে পারবেন কি না, এমন কোনো বাধ্যবাধকতা ছিল না। তাঁর অভিযোগ, এর সুযোগে স্বামী, স্ত্রী, ছেলে, মেয়ে ও পুত্রবধূর নামে ডিলারশিপ নিয়ে একটি গোষ্ঠী ও পারিবারিক একচেটিয়া ব্যবস্থা গড়ে তোলা হতো। এ অবস্থা বদলাতে ২০২৫ সালের নীতিমালাও সংশোধন করা হয়, যাতে একই পরিবারের সদস্যরা একাধিক ডিলারশিপ না নিতে পারেন। তাঁর ভাষ্যমতে, বর্তমান সরকার আসার পর চলতি বছরের আগস্টে এ সংশোধন হয়েছে।
রাষ্ট্রপক্ষ আদালতকে জানায়, রিটকারীদের চ্যালেঞ্জ করা নীতিমালা এখনো কার্যকর হয়নি। কারণ ডিলার নিয়োগের প্রক্রিয়া চলমান এবং নতুন ডিলারদের ক্ষেত্রে বিতরণের পর্যায় এখনো আসেনি। তবু হাইকোর্ট অন্তর্বর্তী আদেশ দেন। অ্যাটর্নি জেনারেলের মতে, ২০২৬ সালের নীতিমালা অনুযায়ী নিয়োগ চলাকালেও পুরোনো ডিলারদের না সরানোর স্থিতাবস্থা তাঁরা পেয়েছিলেন।
চেম্বার আদালতের আদেশের তাৎপর্য নিয়ে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, এই স্থগিতাদেশের ফলে নীতিমালার ওই বিধান চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে নতুন করে রিট করার সুযোগ আর থাকল না বলে তাঁরা মনে করেন। তিনি বলেন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা, একই পরিবার থেকে একাধিক ব্যক্তিকে সুযোগ না দিয়ে দুর্নীতি বন্ধ করা এবং কৃষকের কাছে সার ঠিকমতো পৌঁছানো নিশ্চিত করাই এই বিধানের উদ্দেশ্য। সরকার যেভাবে নীতিমালা করেছে, সেভাবেই তা বহাল থাকবে।
এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট করা দরকার। চেম্বার আদালতের আদেশ হাইকোর্টের অন্তর্বর্তী স্থিতাবস্থা স্থগিত করেছে। মূল রিটের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি এতে হয়নি। নীতিমালার বৈধতা নিয়ে আদালত এখনো কোনো চূড়ান্ত মত দেননি। অ্যাটর্নি জেনারেল নতুন রিটের সুযোগ না থাকার যে ব্যাখ্যা দিয়েছেন, তা রাষ্ট্রপক্ষের মত। আদেশের লিখিত অনুলিপি প্রকাশের আগে এর আইনি পরিধি নিশ্চিত বলা যায় না।
সার সরবরাহ কৃষির জন্য স্পর্শকাতর। ডিলারশিপ কয়েকটি পরিবারের হাতে কেন্দ্রীভূত থাকলে বিতরণে কৃত্রিম সংকট, দাম বাড়ানো বা সুবিধাভোগী নেটওয়ার্ক তৈরির ঝুঁকি থাকে, এমনটাই সরকারের যুক্তি। অন্যদিকে যাঁরা দীর্ঘদিন ধরে বৈধভাবে ব্যবসা করছেন, তাঁদের পক্ষ থেকে হঠাৎ ডিলারশিপ হারানোর শঙ্কার কথাও উঠেছে। নীতিমালা বাস্তবায়নে বিদ্যমান ডিলারদের ভবিষ্যৎ কী হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
এখন নজর থাকবে রিটকারীরা এ আদেশের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চে যান কি না, সেদিকে। একই সঙ্গে নীতিমালা অনুযায়ী ডিলার নিয়োগ কত দ্রুত শেষ হয় এবং বিদ্যমান পারিবারিক ডিলারদের বিষয়ে সরকার কী সিদ্ধান্ত নেয়, সেটিও দেখার বিষয়।

