পুরান ঢাকার আদালতপাড়ায় প্রতিদিন মানুষের ভিড় লেগেই থাকে। বিচারপ্রার্থী, আইনজীবী, আদালতের কর্মকর্তা ও কর্মচারী মিলিয়ে স্বাভাবিক সময়ে প্রতিদিন ৫০ হাজারের বেশি মানুষের যাতায়াত হয় সেখানে।
কিন্তু সেই তুলনায় জায়গা খুবই কম। নেই পর্যাপ্ত বসার জায়গা। আদালতের এজলাস, রেকর্ডরুম, নকলখানা ও সেরেস্তারও সংকট রয়েছে। গাড়ি রাখার জায়গা নেই। পর্যাপ্ত লিফট ও টয়লেটের ব্যবস্থাও নেই।
দীর্ঘদিনের এই ভোগান্তি কমাতে পুরান ঢাকার নিম্ন আদালত সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা করছে সরকার। পরিকল্পনা অনুযায়ী, নবাব আবদুল গণি রোডের বর্তমান সচিবালয় এলাকায় নেওয়া হবে নিম্ন আদালত। আর সচিবালয় সরিয়ে নেওয়া হবে শেরেবাংলা নগরের পুরোনো বাণিজ্য মেলার মাঠে।
সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও দপ্তর এরই মধ্যে এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের কাজ শুরু করেছে।
২৪ একর জমিতে নতুন সচিবালয়
গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের অধীন গণপূর্ত অধিদপ্তর শেরেবাংলা নগরের পুরোনো বাণিজ্য মেলার মাঠে নতুন সচিবালয়ের জন্য একটি লে আউট বা নকশা তৈরি করেছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রায় ২৪ একর জমির ওপর সচিবালয়ের বিভিন্ন ভবন নির্মাণের প্রস্তাব করা হয়েছে। তৈরি করা লে আউট সরকারপ্রধানের পছন্দ হয়েছে বলেও জানিয়েছেন আন্তমন্ত্রণালয় বৈঠকে অংশ নেওয়া কর্মকর্তারা।
প্রকল্পটি বাস্তবায়নে সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে ৩ হাজার ৪০৯ কোটি ৪৪ লাখ ২৯ হাজার টাকা। প্রস্তাব অনুযায়ী, ২০২৬ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৯ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হবে।
এটি ২০২৬ থেকে ২০২৭ অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে অননুমোদিত নতুন প্রকল্পের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
একনেকে তোলার প্রস্তুতি
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রকল্পটি দ্রুত জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির সভায় উপস্থাপনের প্রস্তুতি চলছে। অনুমোদন পেলে নির্ধারিত পরিকল্পনা অনুযায়ী এর বাস্তবায়ন শুরু হবে।
গণপূর্ত অধিদপ্তর এরই মধ্যে প্রকল্পের প্রয়োজনীয় তথ্য ও ব্যাখ্যা গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ে জমা দিয়েছে। গত বৃহস্পতিবার মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনা ও উন্নয়ন শাখা থেকে এসব তথ্য পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছে।
৮ অক্টোবর পাঠানো ওই চিঠিতে ‘ঢাকার শেরেবাংলা নগরে বাংলাদেশ সচিবালয় স্থাপন’ প্রকল্পটি ২০২৬ থেকে ২০২৭ অর্থবছরের এডিপিতে অননুমোদিত নতুন প্রকল্পের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য, প্রকল্পটি এডিপির ওই তালিকায় না থাকায় এখনো এর প্রক্রিয়াকরণ করা যাচ্ছে না। তাই তালিকায় অন্তর্ভুক্তির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
কেন সরাতে হচ্ছে পুরান ঢাকার আদালত
পুরান ঢাকার আদালতপাড়ায় বর্তমানে ১১৮টি আদালত রয়েছে। এসব আদালতে প্রায় সাড়ে চার লাখ ফৌজদারি মামলা এবং দেড় লাখ দেওয়ানি মামলা বিচারাধীন।
এত বিপুলসংখ্যক মামলার বিপরীতে আদালতপাড়ার অবকাঠামো পর্যাপ্ত নয়। সব আদালতের জন্য আলাদা এজলাসও নেই। কোথাও কোথাও একাধিক আদালতকে একই এজলাস ভাগাভাগি করে বিচারকাজ পরিচালনা করতে হয়।
মামলার নথি সংরক্ষণের জন্য রেকর্ডরুম, নকলখানা ও সেরেস্তারও পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই। বিচারপ্রার্থীদের জন্য বসা বা বিশ্রামের জায়গাও খুব সীমিত।
আদালত প্রাঙ্গণে আইনজীবী ও বিচারপ্রার্থীদের জন্য পর্যাপ্ত বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা নেই। টয়লেটের সংখ্যাও প্রয়োজনের তুলনায় কম। ভবনে ওঠানামার জন্য পর্যাপ্ত লিফট নেই। নেই গাড়ি পার্কিংয়ের পর্যাপ্ত জায়গা।
বিচারপ্রার্থীদের ভোগান্তি দীর্ঘদিনের
ঢাকা আইনজীবী সমিতির সভাপতি আনোয়ার জাহিদ ভূঁইয়া বলেন, পুরান ঢাকার সংকীর্ণ এলাকায় আদালতের প্রয়োজনীয় অবকাঠামো তৈরি করা কঠিন। আদালত বড় কোনো জায়গায় নেওয়া হলে আইনজীবী ও বিচারপ্রার্থীরা সুবিধা পাবেন।
আদালতে নিয়মিত আসা বিচারপ্রার্থী কাজী হায়দার আলী বলেন, আদালতপাড়ায় ভোগান্তির শেষ নেই। আইনজীবীদের বসার ব্যবস্থা থাকলেও বিচারপ্রার্থীদের বসার তেমন জায়গা নেই।
তাঁর ভাষ্য, অনেক সময় ঘণ্টার পর ঘণ্টা আদালতের বারান্দায় বসে থাকতে হয়। এমনও দিন গেছে, পুরো দিন দাঁড়িয়ে থাকতে হয়েছে। নতুন জায়গায় আদালত স্থানান্তর হলে এই সংকট অনেকটাই কমবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা। এ বিষয়ে গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী খালেকুজ্জামান চৌধুরীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি মন্তব্য করতে রাজি হননি।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মো. জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকির সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

