আইনি পরামর্শ, মামলার তথ্য ও অভিযোগ জানাতে সুপ্রিম কোর্টের হেল্পলাইনে মানুষের আগ্রহ বাড়ছে। চলতি বছরের প্রথম নয় মাসে সারা দেশ ও বিদেশ থেকে এই হেল্পলাইনে মোট ৭ হাজার ৩২৮টি ফোনকল এসেছে। সুপ্রিম কোর্ট হেল্পলাইন মনিটরিং সেলের সর্বশেষ তথ্যে এ চিত্র উঠে এসেছে।
মনিটরিং সেলের তথ্য অনুযায়ী, ১ জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর মাসের শেষ দিন পর্যন্ত কলগুলো এসেছে। এসব কলের উদ্দেশ্য ছিল আইনি পরামর্শ নেওয়া, চলমান মামলার খোঁজখবর জানা এবং বিভিন্ন অভিযোগ দাখিল করা। হিসাব করলে নয় মাসে মাসিক গড় দাঁড়ায় প্রায় ৮১৪টি কল। অর্থাৎ প্রতিদিন গড়ে ২৭টির মতো মানুষ এই সেবার দ্বারস্থ হয়েছেন। এতে বোঝা যায়, আদালতসংক্রান্ত তথ্য ও সহায়তার জন্য সাধারণ মানুষের একটি নির্ভরযোগ্য সরাসরি যোগাযোগের মাধ্যমের চাহিদা রয়েছে।
শুধু সেপ্টেম্বর মাসেই হেল্পলাইনে এসেছে ৭৭৪টি কল। এর মধ্যে আইনি পরামর্শের জন্য ফোন করেছেন ১১১ জন। মামলার তথ্য জানতে চেয়ে কল এসেছে ১৮৪টি। সংশ্লিষ্ট সেল জানিয়েছে, এই দুই ধরনের সব কলের তথ্যই সেবাগ্রহীতাদের তাৎক্ষণিকভাবে দেওয়া হয়েছে।
একই মাসে ৩৮০টি কলের ক্ষেত্রে কোনো প্রত্যুত্তর পাওয়া যায়নি। অর্থাৎ হেল্পলাইন নম্বর ১০৩-এ কল করা হলেও সেবাগ্রহীতার পক্ষ থেকে কোনো সাড়া মেলেনি। মোট কলের প্রায় অর্ধেকই এ ধরনের। এই সংখ্যা সেবার মান বা যোগাযোগ-ব্যবস্থার দিকে নজর দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা সামনে আনে। তবে সাড়া না পাওয়ার কারণ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি।
সেপ্টেম্বর মাসের কলের একটি বড় অংশ ছিল অভিযোগসংক্রান্ত। সুপ্রিম কোর্ট ও জেলা আদালতের বিভিন্ন অনিয়ম, দায়িত্বে অবহেলা, সেবা পেতে বিলম্ব এবং অসদাচরণ নিয়ে ২০টি অভিযোগ এসেছে। এর মধ্যে ১৪টি অভিযোগ নিষ্পত্তি করা হয়েছে। এগুলো ছিল বিলম্বে আইনি সেবা পাওয়া, রায়ের কপি না পাওয়া, নথি নিখোঁজ হওয়া এবং দ্রুত নিষ্পত্তির আবেদন-সংক্রান্ত। বাকি ছয়টি অভিযোগ ছিল অনিয়ম, দায়িত্বে অবহেলা ও অসদাচরণ-সংক্রান্ত। এসব বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। রায়ের কপি না পাওয়া বা নথি হারিয়ে যাওয়ার মতো সমস্যা বিচারপ্রার্থীদের ভোগান্তির পরিচিত কারণ। সেগুলোর দ্রুত সমাধানকে হেল্পলাইনের কার্যকারিতার একটি ইতিবাচক দিক হিসেবে দেখা যায়।
একই মাসে আরও ৭৯টি কল এসেছে এমন বিষয়ে, যা সুপ্রিম কোর্টের এখতিয়ারের বাইরে। এসব কলে সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও শাখার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়েছিল। এখতিয়ার না থাকায় সুপ্রিম কোর্ট সরাসরি ব্যবস্থা নিতে পারেনি। তবে হেল্পলাইন থেকে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে, এ ক্ষেত্রে তাঁদের কী করণীয়। এতে বোঝা যায়, অনেক মানুষ কোন প্রতিষ্ঠানে কোন সমস্যার প্রতিকার মেলে, সে বিষয়ে সম্পূর্ণ পরিষ্কার নন। ফলে হেল্পলাইন কার্যত একটি দিকনির্দেশনামূলক কেন্দ্র হিসেবেও কাজ করছে।
সেপ্টেম্বরের কলগুলোর হিসাব মেলালে চিত্রটি আরও স্পষ্ট হয়। ওই মাসের ৭৭৪টি কলের মধ্যে আইনি পরামর্শ ১১১টি, মামলার তথ্য ১৮৪টি, সাড়া না মেলা ৩৮০টি, আদালতসংক্রান্ত অভিযোগ ২০টি এবং এখতিয়ারবহির্ভূত অভিযোগ ৭৯টি। অর্থাৎ বাস্তবে সেবা নিতে চাওয়া কলের চেয়ে সাড়াহীন কলের সংখ্যাই বেশি। আবার মামলার তথ্য জানতে চাওয়ার কল আইনি পরামর্শের কলের চেয়ে বেশি। এ থেকে বোঝা যায়, বিচারপ্রার্থীরা নিজেদের মামলার বর্তমান অবস্থা জানতে সবচেয়ে বেশি আগ্রহী।
প্রধান বিচারপতির নির্দেশে গত বছরের ১১ ডিসেম্বর সুপ্রিম কোর্ট হেল্পলাইন সেন্টারের উদ্বোধন করা হয়। চালুর পর এক বছরও পার হয়নি, এর মধ্যেই হাজার হাজার মানুষ এই সেবা ব্যবহার করেছেন। বর্তমানে ০১৩১৬-১৫৪২১৬ ও ০১৭৯৫-৩৭৩৬৮০ নম্বরে কল ও হোয়াটসঅ্যাপ সেবা চালু আছে। এ ছাড়া ১০৩ নম্বরে অনলাইন সেবা পাওয়া যাচ্ছে।
সার্বিকভাবে হেল্পলাইনটি বিচারপ্রার্থী মানুষ ও আদালতের মধ্যে একটি সরাসরি সেতু হিসেবে কাজ করছে, যেখানে তাৎক্ষণিক তথ্য ও অভিযোগ নিষ্পত্তির সুযোগ রয়েছে। তবে সাড়া না পাওয়া কলের উচ্চ সংখ্যা এবং এখতিয়ার নিয়ে সাধারণ মানুষের অস্পষ্টতা বলছে, সেবার পরিধি ও প্রচারে আরও কাজের জায়গা আছে। সেবার গতি, যোগাযোগের মান এবং কোন সমস্যায় কোথায় যেতে হবে, সে বিষয়ে স্পষ্ট তথ্য পৌঁছে দেওয়া গেলে হেল্পলাইনের উপযোগিতা আরও বাড়বে।

