ছেলেকে খুঁজতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গিয়েছিলেন তাসলিমা আক্তার। জরুরি বিভাগে ছেলেকে পেলেন না। চিকিৎসকের দেখানো একটি ছবিতে বুঝলেন, ছেলে সেখানে নেই।
এরপর তাঁকে নেওয়া হলো মর্গে।
সেখানে সারি সারি মরদেহ। তাসলিমার ভাষ্য অনুযায়ী, তিন থেকে চারশ মরদেহ পড়ে ছিল সেখানে। মুখ দেখে সন্তানকে চেনার উপায় ছিল না। শেষ পর্যন্ত পরনের পোশাক দেখে ছেলে মোহাম্মদ ইসমাইলকে শনাক্ত করেন তিনি। মাথায় গুলির ক্ষত ছিল ইসমাইলের।
সোমবার ১২ অক্টোবর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ১ এ এসব কথা বলতে গিয়ে বারবার কান্নায় ভেঙে পড়েন তাসলিমা। ২০২৪ সালের জুলাই আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের সময় রাজধানীর মোহাম্মদপুরে নয়জন হত্যার মামলায় তিনি দশম সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দেন।
ট্রাইব্যুনালের সদস্য বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরীর একক বেঞ্চে তাঁর সাক্ষ্য রেকর্ড করা হয়। প্রসিকিউশনের পক্ষে শুনানি করেন প্রসিকিউটর তারেক আবদুল্লাহ।
এ মামলায় সাবেক মন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানক ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপসসহ ২৮ জন আসামি রয়েছেন।
আন্দোলনে গিয়ে আর ফেরেননি ইসমাইল
তাসলিমার বাড়ি কিশোরগঞ্জের ভৈরব উপজেলায়। বর্তমানে তিনি মোহাম্মদপুরে থাকেন।
তাঁর জবানবন্দি অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই জুমার নামাজ ও দুপুরের খাবার শেষে বিকেল ৩টার দিকে বাসা থেকে বের হন ইসমাইল। আল্লাহ করিম মসজিদের পাশে গ্লাস ফ্যাক্টরির সামনে আন্দোলনে যোগ দেন তিনি।
সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে ইসমাইলের বন্ধু মনির তাসলিমাকে ফোন করেন। তিনি জানান, আল্লাহ করিম মসজিদের সামনে ইসমাইলকে দেখা গেছে। তাঁকে বাসায় ফিরে যেতে বলা হয়।
কিন্তু বাসায় ফেরেননি ইসমাইল। এরপর ইসমাইলের খালা আকলিমা তাঁকে ফোন করেন। কয়েকবার ফোন দেওয়ার পর তাঁর বন্ধু কালু ফোন ধরেন।
তাসলিমার জবানবন্দি অনুযায়ী, কালু তখন বলেন, ইসমাইল গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। তাঁকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হচ্ছে।
এই খবর পেয়ে তাসলিমা পরিবারের সদস্যদের নিয়ে রওনা হন হাসপাতালে।
রাস্তায়ও গুলির ঘটনা দেখেন
তাসলিমা বলেন, তাঁরা ঢাকা উদ্যান থেকে রিকশায় করে হাসপাতালে যাচ্ছিলেন। পথে বিভিন্ন জায়গায় আগুন জ্বলতে দেখেন।
তাঁর অভিযোগ, পথে কয়েকজন ব্যক্তির হাতে অস্ত্র ছিল। তাঁদের মধ্যে কমিশনার আসিফ, কমিশনার রাজিব, জাহাঙ্গীর কবির নানক, তাপস ও বিপ্লবদের নাম তিনি উল্লেখ করেন।
তাসলিমার দাবি, তাঁর সামনে একজনকে গুলি করে হত্যা করা হয়। তবে এসব অভিযোগ তাঁর দেওয়া জবানবন্দির অংশ। আদালতে অভিযোগগুলোর সত্যতা এখনো প্রমাণিত হয়নি।
হাসপাতালে খুঁজেও পাননি ছেলে
তাসলিমা জানান, রাত ১০টার দিকে তাঁরা ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পৌঁছান। জরুরি বিভাগে গিয়ে গুলিবিদ্ধ অনেক মানুষকে দেখতে পান। তাঁদের কেউ জীবিত ছিলেন, কেউ মারা গেছেন।
তিনি হাসপাতালের বিভিন্ন জায়গায় ছেলেকে খুঁজতে থাকেন।
একপর্যায়ে একজন চিকিৎসকের কাছে ছেলের কথা জানান। চিকিৎসক তাঁকে জরুরি বিভাগে নিয়ে যান। সেখানে ছেলেকে না পেয়ে চিকিৎসক মোবাইলে কিছু ছবি দেখান।
ছবিতে ইসমাইলকে শনাক্ত করেন তাসলিমা। এরপর চিকিৎসক তাঁকে মর্গে নিয়ে যান।
সেখানেই দেখেন শত শত মরদেহ পড়ে আছে। তাসলিমার ভাষ্য অনুযায়ী, একটির ওপর আরেকটি মরদেহ ছিল। মুখ দেখে সন্তানকে চেনা সম্ভব হচ্ছিল না। শেষ পর্যন্ত ছেলের পরনের পোশাক দেখে ইসমাইলকে শনাক্ত করেন তিনি।
লাশ পেতে অপেক্ষা করতে হয়
তাসলিমা বলেন, ইসমাইলের মাথায় গুলি লেগেছিল। ছেলের মরদেহ চাইলেও তখন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তা দিতে রাজি হয়নি। তাঁকে জানানো হয়, সংশ্লিষ্ট থানার ওসি এলে মরদেহ দেওয়া হবে।
পরদিন সকাল ১১টার দিকে মোহাম্মদপুর থানার সাইফুল নামের এক কর্মকর্তা হাসপাতালে আসেন। এরপর সন্ধ্যা ৭টার দিকে ইসমাইলের মরদেহ পরিবারের কাছে দেওয়া হয়।
তাসলিমার ভাষ্য অনুযায়ী, হাসপাতাল থেকে মামলা করবেন না বলে তাঁর কাছ থেকে স্বাক্ষর নেওয়া হয়েছিল। পরে ছাতা মসজিদে ইসমাইলের গোসল ও জানাজা হয়। এরপর আজিমপুর কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়।
ছেলের হত্যার বিচার চান মা
জবানবন্দির একপর্যায়ে ইসমাইলকে হত্যার জন্য সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, শেখ ফজলে নূর তাপস, জাহাঙ্গীর কবির নানকসহ কয়েকজনের নাম উল্লেখ করেন তাসলিমা।
তিনি আরও কয়েকজন ব্যক্তিকে দায়ী করেন। তবে এসব অভিযোগও এখনো আদালতে প্রমাণিত হয়নি। ছেলের কথা বলতে গিয়ে বারবার কান্নায় ভেঙে পড়েন তাসলিমা। তাঁর একটাই দাবি, ছেলে ইসমাইল হত্যার বিচার।
মামলায় গ্রেপ্তার চারজন
এই মামলায় এখন পর্যন্ত চার আসামি কারাগারে রয়েছেন। তাঁরা হলেন নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের মোহাম্মদপুর থানা শাখার সভাপতি নাঈমুল হাসান রাসেল, সহসভাপতি সাজ্জাদ হোসেন, আনসার সদস্য ওমর ফারুক এবং যুবলীগকর্মী ফজলে রাব্বি।
মামলার অন্য আসামিরা পলাতক রয়েছেন।

