বিদেশে কঠোর পরিশ্রম করে দেশে টাকা পাঠান প্রবাসীরা। কিন্তু সেই টাকা ও সম্পত্তি নিয়ে দেশে পারিবারিক বিরোধে জড়িয়ে অনেককে বছরের পর বছর আদালতে ঘুরতে হয়।
মামলার পেছনে খরচ হয় কষ্ট করে উপার্জন করা অর্থ। সময়ও যায়। এই ভোগান্তি কমাতে প্রবাসীদের জন্য বিশেষায়িত আদালত গঠনের পরিকল্পনা করছে সরকার।
মঙ্গলবার রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে এক অনুষ্ঠানে এ কথা জানান আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান।
শরণার্থী ও অভিবাসন আন্দোলনবিষয়ক গবেষণা ইউনিটের ৩০ বছর পূর্তি এবং ‘সোনার মানুষ সম্মিলন ২০২৬’ উপলক্ষে অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
দ্রুত মামলা নিষ্পত্তির উদ্যোগ
আইনমন্ত্রী বলেন, বিদেশে উপার্জিত অর্থ দেশে পাঠানোর পর অনেক প্রবাসী পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে অর্থ ও সম্পত্তি নিয়ে বিরোধে জড়িয়ে পড়েন।
এসব বিরোধের মামলা বছরের পর বছর চলতে থাকে। এতে প্রবাসীদের সময় ও অর্থ দুটোই ব্যয় হয়। বাড়ে ভোগান্তিও।
এই সমস্যা সমাধানে প্রবাসীদের জন্য বিশেষায়িত আদালত গঠনের পরিকল্পনা করা হচ্ছে বলে জানান আইনমন্ত্রী। এসব আদালতের মাধ্যমে প্রবাসীদের বিভিন্ন ধরনের মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেওয়া হবে।
তিনি জানান, এ বিষয়ে একটি খসড়া তৈরির কাজ চলছে। উদ্যোগটি বাস্তবায়নে রামরুকে সরকারের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।
২৪ ঘণ্টা আইনি সহায়তা
প্রবাসী বাংলাদেশি ও তাঁদের পরিবারের সদস্যদের আইনি সহায়তার বিষয়েও সরকারের উদ্যোগ তুলে ধরেন আইনমন্ত্রী।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ আইনগত সহায়তা অধিদপ্তরের মাধ্যমে ২৪ ঘণ্টা আইনি সহায়তা দেওয়ার ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। এ জন্য একটি হটলাইনও রয়েছে।
প্রবাসীদের প্রাথমিক আইনি পরামর্শ ও প্রয়োজনীয় সহায়তা দিতে রামরুকে আইনগত সহায়তা অধিদপ্তরের সঙ্গে সমন্বয় করার আহ্বান জানান তিনি।
বিদেশে কম মজুরি নিয়ে উদ্বেগ
দেশের অর্থনীতিতে প্রবাসীদের অবদানের কথাও তুলে ধরেন আইনমন্ত্রী। তিনি বলেন, দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি হলো প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স।
তৈরি পোশাক, কৃষি, পাট ও পাটজাত পণ্য এবং চা রপ্তানির পাশাপাশি বিদেশে বাংলাদেশের শ্রমিকদের কর্মসংস্থানও অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তবে এসব শ্রমিকের কর্মপরিবেশ ও মজুরি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন আইনমন্ত্রী।
সম্প্রতি দুবাই সফরের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, সেখানে বাংলাদেশি শ্রমিকদের কঠোর পরিশ্রম ও দুর্ভোগ তাঁর নজরে এসেছে।
অনেক শ্রমিককে দীর্ঘ সময় কাজ করতে হয়। কর্মস্থলে যাতায়াতেও তাঁদের অনেক সময় ব্যয় হয়। অথচ কোনো কোনো ক্ষেত্রে অন্য দেশের শ্রমিকদের তুলনায় বাংলাদেশিরা কম মজুরি পান।
বাংলাদেশি শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করতে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন আইনমন্ত্রী। এ বিষয়ে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নূরের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন তিনি।
ভুয়া কাগজপত্র নিয়ে সতর্কতা
বিদেশে কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে কিছু অসাধু ব্যক্তি ও রিক্রুটিং এজেন্সির কর্মকাণ্ড নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন আইনমন্ত্রী।
তিনি বলেন, কিছু ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান বিদেশে কর্মসংস্থানের জন্য ভুয়া কাগজপত্র দাখিল করছে। সংশ্লিষ্ট দেশগুলো এসব নথি যাচাই করে আইনি ব্যবস্থা নিচ্ছে।
এর ফলে বাংলাদেশি কর্মীদের ভিসা বাতিল হতে পারে। ভিসা নবায়নেও জটিলতা তৈরি হতে পারে। এ ধরনের অনিয়ম ঠেকাতে ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে আরও সতর্ক ও সক্রিয় হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
রামরুর তিন দশকের কাজের প্রশংসা
অভিবাসী শ্রমিকদের অধিকার ও কল্যাণে ৩০ বছর ধরে কাজ করায় রামরুর প্রশংসা করেন আইনমন্ত্রী।
তিনি বলেন, প্রতিষ্ঠার শুরু থেকেই রামরু অভিবাসী শ্রমিকদের অধিকার ও কল্যাণ নিয়ে কাজ করছে। গত ৩০ বছরে অভিবাসন ও শ্রমিক কল্যাণসংক্রান্ত নীতি তৈরিতেও প্রতিষ্ঠানটি গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা দিয়েছে।
শ্রমিকদের স্বার্থে রামরু ভবিষ্যতে যেসব উদ্যোগ নেবে, সেগুলোর সঙ্গে সরকার থাকবে বলেও আশ্বাস দেন তিনি।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন রামরুর উপদেষ্টা ড. সি. আর. আবরার। উপস্থিত ছিলেন প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নূর এবং বাংলাদেশে নিযুক্ত সুইজারল্যান্ডের রাষ্ট্রদূত রেটো রেংলি।

