মিরপুরের রাড্ডা এমসিএইচ এফপি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনায় বিএনপির সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির পদত্যাগকে ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন আইনজীবীরা।
তবে তাঁদের মতে, শুধু দলীয় ব্যবস্থা নিলে হবে না। অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত করতে হবে। তদন্তে অপরাধের প্রমাণ মিললে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে।
আইনজ্ঞরা বলছেন, রাজনৈতিক পরিচয় বা পদমর্যাদা যেন কোনোভাবেই বিচারের পথে বাধা না হয়। অপরাধের অভিযোগ যার বিরুদ্ধেই উঠুক, তদন্তের পর প্রমাণ পাওয়া গেলে তাকে আইনের আওতায় আনতে হবে।
রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে কী ঘটেছিল
গত ২৪ সেপ্টেম্বর রাতে মিরপুরের ১ নম্বরে রাড্ডা এমসিএইচ এফপি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে।
অভিযোগ রয়েছে, দুই শতাধিক ব্যক্তি দেশীয় অস্ত্র ও বিভিন্ন সরঞ্জাম নিয়ে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ঢোকেন। পরে ভারী যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে একটি পাকা ও তিনটি আধা পাকা ভবন ভেঙে ফেলা হয়।
ঘটনার পর সেখানে ‘সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতি লিমিটেড’ নামের একটি সাইনবোর্ড টানিয়ে দেওয়া হয়।
এ ঘটনায় বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ ওঠে। আলোচনায় আসে সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির নামও।
তখন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানিয়েছিলেন, ঘটনাটি তদন্ত করা হচ্ছে। তদন্তে মিষ্টির সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া গেলে তাঁর বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
পদত্যাগের আগে দলীয় ব্যবস্থা
রাড্ডার ঘটনার পর ৩০ সেপ্টেম্বর রাতে ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির ৫১ সদস্যের আহ্বায়ক কমিটি বিলুপ্ত করা হয়। ওই কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক ছিলেন মিষ্টি।
একই রাতে বিএনপি, ছাত্রদল, স্বেচ্ছাসেবক দল ও শ্রমিক দলের বিভিন্ন পর্যায়ের ১৪ নেতাকর্মীকে বহিষ্কার করা হয়। দলীয় বিজ্ঞপ্তিতে রাড্ডা হামলার কথা সরাসরি উল্লেখ করা হয়নি। সেখানে দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গ ও অনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগের কথা বলা হয়।
এরপর ১ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্দেশে সংসদ সদস্য পদ থেকে পদত্যাগ করেন ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি।
স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনায় এখন পর্যন্ত ১৯ জনকে গ্রেপ্তার করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
সমিতির সঙ্গে মিষ্টির পুরোনো সম্পর্ক
রাড্ডা সেন্টারে হামলার পর ‘সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতি লিমিটেড’ নিয়েও আলোচনা শুরু হয়।
তথ্য অনুযায়ী, ২০০৬ সালে শাহআলী থানার ৮ নম্বর ওয়ার্ডের কমিশনার থাকার সময় মিষ্টি ওই সমিতির সভাপতি ছিলেন। ২০০৪ সালে রাড্ডা সেন্টারের জায়গাটি সমিতির নামে বরাদ্দ চেয়ে করা আবেদনের নথিতেও তাঁর নাম সভাপতি হিসেবে ছিল।
তবে বর্তমানে ওই সমিতির সঙ্গে কোনো সম্পর্ক নেই বলে জানিয়েছেন মিষ্টি। তিনি স্বীকার করেছেন, কমিশনার থাকাকালে সমিতির সভাপতি ছিলেন এবং জমি বরাদ্দের জন্য আবেদন করেছিলেন।
তবে রাড্ডা সেন্টারে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের সঙ্গে নিজের সম্পৃক্ততার অভিযোগ তিনি অস্বীকার করেছেন।
দলীয় ব্যবস্থার পাশাপাশি মামলা চান আইনজীবীরা
সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সংবিধান সংরক্ষণ কমিটির সাধারণ সম্পাদক ও জ্যেষ্ঠ আইনজীবী সৈয়দ মামুন মাহবুব বলেন, রাড্ডার ঘটনার পর প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেওয়া পদক্ষেপ প্রশংসনীয়।
তাঁর মতে, এর মাধ্যমে একটি বার্তা গেছে যে ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীরাও অপরাধ করলে ছাড় পাবেন না।
তবে শুধু দলীয় সিদ্ধান্তে বিষয়টি শেষ করা উচিত নয় বলে মনে করেন তিনি। তাঁর ভাষ্য, অভিযোগের সঙ্গে যারাই জড়িত থাকুন, তদন্ত করে প্রমাণ পাওয়া গেলে তাঁদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে।
সরকারের কোনো কর্মকর্তা বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেলেও একইভাবে তদন্ত ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেন এই আইনজীবী।
অপরাধের অভিযোগে কাউকে ছাড় নয়
সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী সুব্রত চৌধুরী বলেন, বিএনপির নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, দখলবাজি বা সন্ত্রাসের অভিযোগ উঠলে সাংগঠনিক ব্যবস্থার পাশাপাশি ফৌজদারি আইনেও ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
তাঁর মতে, কোনো ব্যক্তি দলের শীর্ষ নেতা বা সংসদ সদস্য হলেও অপরাধের অভিযোগ থাকলে তাঁকে ছাড় দেওয়ার সুযোগ নেই।
তবে অভিযোগ প্রমাণের আগে কাউকে অপরাধী হিসেবে বিবেচনা না করার বিষয়েও গুরুত্ব দিয়েছেন আইনজীবীরা। তদন্তের মাধ্যমে অভিযোগ যাচাই করে আইন অনুযায়ী পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়ার কথা তাঁরা বলেছেন।
আইনের শাসনের ধারাবাহিকতা চান আইনজীবীরা
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার মো. সাইফুল ইসলাম উজ্জ্বল বলেন, দেশে প্রতিদিন অনেক ঘটনা ঘটে। নতুন ঘটনা সামনে এলে আগের ঘটনাগুলো অনেক সময় আলোচনার বাইরে চলে যায়। এতে কিছু অপরাধী আইনের আওতার বাইরে থেকে যাওয়ার সুযোগ পান।
তাঁর মতে, নিজ দলের একজন সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত তৈরি করেছে। তবে মিষ্টির বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে যাওয়া উচিত নয়।
তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি সংসদ সদস্য, দলীয় নেতা বা সাধারণ নাগরিক যেই হোন, আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া উচিত বলে মনে করেন তিনি।
পদত্যাগকে ইতিবাচক উদ্যোগ বলছেন অ্যাটর্নি জেনারেল
অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল মিষ্টির পদত্যাগকে প্রধানমন্ত্রীর কঠোর অবস্থানের বার্তা হিসেবে দেখছেন।
তিনি বলেন, কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে প্রয়োজনে দলীয় পদ বা সংসদ সদস্য পদও ছাড়তে হতে পারে। মিষ্টির পদত্যাগের ঘটনায় এমন একটি বার্তা পাওয়া গেছে।
তবে তিনি জানান, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এর আগে বলেছিলেন, পুলিশের তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হলে মিষ্টির বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেওয়া হবে এবং সেই অনুযায়ী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
পদত্যাগের পাশাপাশি বিচারও চান আইনজ্ঞরা
সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী অ্যাডভোকেট আবু হেনা রাজ্জাকী বলেন, মিষ্টির পদত্যাগ ইতিবাচক হলেও এখানেই বিষয়টি শেষ হওয়া উচিত নয়।
রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলা, ভাঙচুর বা এতে ইন্ধন দেওয়ার অভিযোগ তদন্ত করে সত্যতা পাওয়া গেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।
আইনজ্ঞদের মত হলো, রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলার ঘটনায় দলীয় সিদ্ধান্তের পাশাপাশি নিরপেক্ষ তদন্তও জরুরি। তদন্তে অপরাধের প্রমাণ মিললে রাজনৈতিক পরিচয় বা ক্ষমতার প্রভাব বিবেচনা না করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে।

