দেশের কনসার্ট, নাটক, বাউল গান, নৌকা বাইচসহ শান্তিপূর্ণ সাংস্কৃতিক আয়োজন নির্বিঘ্নে করার সুযোগ এবং ঢাকায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গ্রাফিতি সংরক্ষণের নির্দেশনা চেয়ে হাইকোর্টে রিট করা হয়েছে।
সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও এতে অংশ নেওয়া শিল্পী, আয়োজক এবং দর্শকদের নিরাপত্তায় সুনির্দিষ্ট নীতিমালা বা স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর প্রণয়নেরও আবেদন করা হয়েছে। পাশাপাশি সাংস্কৃতিক আয়োজনে হুমকি, হামলা বা ভাঙচুরের ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা চাওয়া হয়েছে।
বুধবার সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী সাদ্দাম হোসেন অভি সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদের অধীনে জনস্বার্থে নিজে আবেদনকারী হয়ে রিটটি করেন।
রিটে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব, আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব, সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব, তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের সচিব এবং পুলিশের মহাপরিদর্শককে বিবাদী করা হয়েছে।
আইনজীবীর বক্তব্য
রিট করার পর সাদ্দাম হোসেন অভি বলেন, দেশের সংস্কৃতি, সাহিত্য ও শিল্পচর্চা নানা ধরনের বাধার মুখে পড়ছে। তাঁর দাবি, বিভিন্ন সাংস্কৃতিক আয়োজনের ক্ষেত্রে একটি গোষ্ঠী আপত্তি তুলে অনুষ্ঠান বন্ধ বা স্থগিত করার চেষ্টা করছে।
তিনি বলেন, কনসার্ট, বাউল গান বা লোকজ উৎসবের আয়োজন হলেই কোথাও কোথাও ‘তৌহিদী জনতা’ পরিচয়ে একটি গোষ্ঠী বাধা দিচ্ছে এবং হামলা বা ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গ্রাফিতি মুছে ফেলার চেষ্টার প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতির ওপর এ ধরনের হস্তক্ষেপ গ্রহণযোগ্য নয়।
আইনজীবীর ভাষ্য, সংবিধানের ২৩ অনুচ্ছেদে দেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণ এবং জাতীয় ভাষা, সাহিত্য ও শিল্পকলার বিকাশ নিশ্চিত করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের ওপর দেওয়া হয়েছে। তাই কনসার্ট, নাটক, সিনেমা, গানসহ সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড এবং রবীন্দ্রনাথের গ্রাফিতির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রের কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।
রিটে যেসব ঘটনার উল্লেখ
রিট আবেদনে বলা হয়েছে, আইনসম্মত সাংস্কৃতিক আয়োজন বিভিন্ন ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর চাপের কারণে বাতিল বা স্থগিত হওয়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
এতে ২০২৬ সালের কয়েকটি ঘটনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। মে মাসে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় স্থানীয় বিরোধিতার মুখে ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ চলচ্চিত্রের প্রদর্শনী স্থগিত হওয়ার বিষয়টি আবেদনে তুলে ধরা হয়েছে।
২৫ জুন ঢাকায় ভারতীয় শিল্পী অনুপম রায়ের কনসার্টও ‘অনিবার্য পরিস্থিতি ও সরকারি নির্দেশনা’র কারণে স্থগিত করা হয় বলে আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ছাড়া ১৮ আগস্ট ব্রাহ্মণবাড়িয়া পুলিশ লাইন্সে একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষের কথা বলা হয়েছে। পরদিন কিশোরগঞ্জের পুরাতন স্টেডিয়ামে ব্যান্ড অ্যাশেজ ও সংগীতশিল্পী নোবেলের নির্ধারিত কনসার্ট ধর্মীয় আপত্তি ও প্রশাসনিক হস্তক্ষেপের কারণে বাতিল হওয়ার তথ্যও আবেদনে রয়েছে।
আগস্টে সিলেটের বিয়ানীবাজারে সোনাই নদী এবং ১৮ সেপ্টেম্বর গোলাপগঞ্জে কুশিয়ারা নদীতে নৌকা বাইচ আয়োজনের বিরুদ্ধেও ‘তৌহিদী জনতা’ পরিচয়ে আপত্তি ও বিক্ষোভের কথা বলা হয়েছে।
দেশের বিভিন্ন স্থানে পালাগান, বাউল গান, নাটক ও চলচ্চিত্র প্রদর্শনীতে বাধা এবং ঢাকায় রবীন্দ্রনাথের গ্রাফিতি মুছে ফেলার চেষ্টার বিষয়ও রিটে উল্লেখ করা হয়েছে।
বেসরকারি গোষ্ঠীর ‘ভেটো’ দেওয়ার সুযোগ নেই, দাবি
রিটের যুক্তিতে বলা হয়েছে, জনশৃঙ্খলা বা শালীনতার কারণে কর্তৃপক্ষ আইন অনুযায়ী কোনো অনুষ্ঠান নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। তবে কোনো ব্যক্তি বা বেসরকারি গোষ্ঠীর আইনসম্মত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান বন্ধ করার আইনগত ক্ষমতা নেই।
আবেদনে আরও বলা হয়েছে, কোনো অনুষ্ঠানের বিষয়ে আপত্তি থাকলে তা আইনসম্মত উপায়ে জানানো যেতে পারে। কিন্তু হুমকি বা বলপ্রয়োগ করে অনুষ্ঠান বন্ধ করা বেআইনি।
রিটে রাষ্ট্রের দায়িত্ব হিসেবে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়টিও তুলে ধরা হয়েছে। বলা হয়েছে, কোনো অনুষ্ঠানে হুমকি এলে পুলিশের দায়িত্ব হবে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা দেওয়া এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা। চাপের মুখে অনুষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া নয়।
আবেদনে আরও বলা হয়েছে, সাংস্কৃতিক আয়োজনের নিরাপত্তা নিয়ে নির্দিষ্ট এসওপি না থাকায় শিল্পী ও আয়োজকদের অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়তে হচ্ছে।
সংবিধানের যেসব অনুচ্ছেদ উল্লেখ
রিটে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণের পাশাপাশি নাগরিকের মৌলিক অধিকারের বিষয়টিও তুলে ধরা হয়েছে।
এতে সংবিধানের ২৩ অনুচ্ছেদে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণ, ২৭ অনুচ্ছেদে আইনের দৃষ্টিতে সমতা, ৩১ অনুচ্ছেদে আইনের আশ্রয় লাভের অধিকার, ৩২ অনুচ্ছেদে জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতা, ৩৭ অনুচ্ছেদে সমাবেশের স্বাধীনতা এবং ৩৯ অনুচ্ছেদে চিন্তা, বিবেক ও বাকস্বাধীনতার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
আবেদনে বলা হয়েছে, এসব বিষয়ে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ও এসওপি প্রণয়নের অনুরোধ জানিয়ে গত ৩ সেপ্টেম্বর সংশ্লিষ্টদের আইনি নোটিশ দেওয়া হয়েছিল। কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়ায় পরে হাইকোর্টে রিট করা হয়।
রিটে কী চাওয়া হয়েছে
রিটে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিষ্ক্রিয়তা কেন আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারির আবেদন করা হয়েছে।
পাশাপাশি রুলের নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত অন্তর্বর্তী নির্দেশনা হিসেবে দেশের যেকোনো এলাকায় কনসার্ট, নাটক, বাউল গান, ঐতিহ্যবাহী নৌকা বাইচ, পহেলা বৈশাখসহ শান্তিপূর্ণ সাংস্কৃতিক আয়োজনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার নির্দেশনা চাওয়া হয়েছে।
এসব আয়োজনে অংশ নেওয়া শিল্পী, আয়োজক ও দর্শকদেরও তাৎক্ষণিক নিরাপত্তা দেওয়ার নির্দেশনা চাওয়া হয়েছে।

