আইনের শাসনের সূচকে দুই ধাপ এগিয়েছে বাংলাদেশ। ২০২৬ সালের সূচকে ১৪৩টি দেশ ও বিচারব্যবস্থার মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১২৩তম। আগের বছর অবস্থান ছিল ১২৫তম।
ওয়ার্ল্ড জাস্টিস প্রজেক্টের প্রকাশিত ‘আইনের শাসন সূচক ২০২৬’ এ তথ্য উঠে এসেছে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ রয়েছে চতুর্থ অবস্থানে। এ অঞ্চলে শীর্ষে নেপাল। এরপর রয়েছে শ্রীলঙ্কা ও ভারত। বাংলাদেশের পরে রয়েছে পাকিস্তান ও আফগানিস্তান।
অবস্থান দুই ধাপ এগোলেও বাংলাদেশের স্কোর এখনো বৈশ্বিক গড়ের নিচে। ২০২৫ সালে বাংলাদেশের স্কোর ছিল ০.৩৯১। এবার তা বেড়ে হয়েছে ০.৩৯৩। এক বছরের ব্যবধানে স্কোর বেড়েছে ০.৬ শতাংশ।
এই উন্নতির ফলে বিশ্বের ১৫টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশও রয়েছে, যাদের আইনের শাসনের সূচকে সবচেয়ে বেশি অগ্রগতি হয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের অগ্রগতি সবচেয়ে বেশি।
আট মানদণ্ডে মূল্যায়ন
আইনের শাসনের সূচকে দেশগুলোকে আটটি মানদণ্ডের ভিত্তিতে ০ থেকে ১ স্কোরের মধ্যে মূল্যায়ন করা হয়। এগুলো হলো সরকারি ক্ষমতার ওপর সীমাবদ্ধতা, দুর্নীতির অনুপস্থিতি, উন্মুক্ত সরকার, মৌলিক অধিকার, আইনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা, নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রয়োগ, দেওয়ানি বিচার এবং ফৌজদারি বিচার।
বাংলাদেশ এবার আটটি মানদণ্ডের মধ্যে তিনটিতে উন্নতি করেছে। এগুলো হলো সরকারি ক্ষমতার ওপর সীমাবদ্ধতা, দুর্নীতির অনুপস্থিতি এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রয়োগ।
অন্য পাঁচটি মানদণ্ডে বাংলাদেশের অবস্থানের অবনতি হয়েছে।
মৌলিক অধিকার ও দেওয়ানি বিচারে পিছিয়ে
বাংলাদেশের সবচেয়ে দুর্বল অবস্থান মৌলিক অধিকার সূচকে। এই মানদণ্ডে বাংলাদেশের স্কোর ০.৩০। ১৪৩ দেশের মধ্যে অবস্থান ১৩৩তম।
আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে মানুষের মৌলিক অধিকার কতটা সুরক্ষিত, তা এই মানদণ্ডে বিবেচনা করা হয়।
দেওয়ানি বিচারেও বাংলাদেশের অবস্থান দুর্বল। এ ক্ষেত্রে স্কোর ০.৩৬ এবং অবস্থান ১৩২তম। নাগরিকদের অভিযোগ ও বিরোধ দেওয়ানি বিচারব্যবস্থার মাধ্যমে কতটা কার্যকরভাবে নিষ্পত্তি করা যায়, তা এই সূচকে পরিমাপ করা হয়।
নিয়ন্ত্রক সংস্থার কার্যকারিতায় বাংলাদেশের স্কোর ০.৪০। অবস্থান ১২৪তম। ফৌজদারি বিচারে স্কোর ০.৩২ নিয়ে বাংলাদেশ রয়েছে ১১৭তম স্থানে।
দুর্নীতি ও সরকারি জবাবদিহি
ঘুষ, অনুচিত প্রভাব এবং সরকারি সম্পদের অপব্যবহারের মতো বিষয় বিবেচনা করা হয় ‘দুর্নীতির অনুপস্থিতি’ মানদণ্ডে। এতে বাংলাদেশের স্কোর ০.৩৫ এবং অবস্থান ১১৩তম।
সরকারি ক্ষমতার ওপর আইনি জবাবদিহি ও নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি বিবেচনা করা হয় ‘সরকারি ক্ষমতার ওপর সীমাবদ্ধতা’ মানদণ্ডে। এতে বাংলাদেশের স্কোর ০.৩৮ এবং অবস্থান ১১১তম।
বাংলাদেশের সবচেয়ে ভালো অবস্থান ‘উন্মুক্ত সরকার’ মানদণ্ডে। এখানে স্কোর ০.৪১ এবং অবস্থান ১০৬তম।
সরকারের স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং নীতি নির্ধারণে জনগণের অংশগ্রহণের বিষয়গুলো এই মানদণ্ডে বিবেচনা করা হয়।
আইনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তায় বাংলাদেশের স্কোর ০.৬৩। এই মানদণ্ডে অবস্থান ১০৭তম। সমাজ ব্যক্তি ও সম্পত্তির নিরাপত্তা কতটা নিশ্চিত করতে পারছে, তা এখানে মূল্যায়ন করা হয়।
পাঁচ বছরে সামগ্রিক অবনতি
এক বছরে স্কোর সামান্য বাড়লেও গত পাঁচ বছরের হিসাবে বাংলাদেশের আইনের শাসনের পরিস্থিতি পুরোপুরি ইতিবাচক নয়।
ওয়ার্ল্ড জাস্টিস প্রজেক্টের কান্ট্রি প্রোফাইল অনুযায়ী, ২০২১ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে বাংলাদেশের আইনের শাসনের সামগ্রিক স্কোর ০.৮ শতাংশ কমেছে। এই সময়ে স্কোর ০.৪০ থেকে কমে প্রায় ০.৩৯ হয়েছে।
পাঁচ বছরে আটটি মানদণ্ডের ছয়টিতেই অবনতি হয়েছে।
এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি অবনতি হয়েছে দেওয়ানি বিচারে। এই খাতে অবনতি হয়েছে ৪.২ শতাংশ। এরপর উন্মুক্ত সরকারে ২.৮ শতাংশ, মৌলিক অধিকারে ১.৫ শতাংশ, নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রয়োগে ০.৯ শতাংশ, ফৌজদারি বিচারে ০.৭ শতাংশ এবং দুর্নীতির অনুপস্থিতিতে ০.২ শতাংশ অবনতি হয়েছে।
অন্যদিকে সরকারি ক্ষমতার ওপর সীমাবদ্ধতা এবং আইনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা মানদণ্ডে যথাক্রমে ২.৩ শতাংশ ও ০.৬ শতাংশ উন্নতি হয়েছে।
ফলে সাম্প্রতিক সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান দুই ধাপ এগোলেও দীর্ঘমেয়াদি হিসাবে আইনের শাসনের বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে এখনো চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে।

