দেশের আদালতে এখন জমির শেয়ারভিত্তিক আবাসন প্রকল্প নিয়ে প্রতারণার অভিযোগে ৯ হাজার ৮২৩টি মামলা বিচারাধীন। সুপ্রিম কোর্ট ও সংশ্লিষ্ট আদালতের তথ্য অনুযায়ী, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত এসব মামলায় প্রায় ৪০ হাজার ক্রেতা এবং প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকা জড়িয়ে আছে। এগুলো অভিযোগ, আদালতের রায় নয়। তবু সংখ্যাটি বুঝিয়ে দেয়, কত মানুষের জীবনের সঞ্চয় এক জায়গায় আটকে আছে।
এখানে একটি প্রশ্ন সবাইকে ভাবায়। আবাসন খাতের জন্য আমাদের আলাদা আইন আছে। ক্রেতার সুরক্ষার কথাও সেখানে লেখা আছে। তবু একই জমি কেন দুই তিনজনের কাছে বিক্রি হয়? মামলা কেন বছরের পর বছর ঝুলে থাকে? তাই আইন, তার সীমাবদ্ধতা ও সম্ভাব্য আইনি সমাধান নিয়ে কথা বলা জরুরি।
আবাসন খাতের আলাদা আইনে কী আছে
রিয়েল এস্টেট উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১০ (২০১০ সনের ৪৮ নং আইন) আবাসন ব্যবসাকে নিয়মের মধ্যে আনতে চায়। আইনের ৫ ধারায় প্রতিটি ডেভেলপারকে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে নিবন্ধন নিতে হয়। ঢাকায় সেই কর্তৃপক্ষ রাজউক। ৬ ধারা বলে, প্রকল্প অনুমোদনের আগে কোনো ফ্ল্যাট বা প্লট বিক্রি বা বিক্রির চুক্তি করা যাবে না। ডেভেলপারকে ক্রেতার সামনে প্রকল্পের অনুমোদন এবং জমির মালিকানার দলিল দেখাতে হবে।
টাকা ফেরতের নিয়মও আছে। ১৫ ধারা অনুযায়ী, ডেভেলপার সময়মতো সম্পত্তি দিতে না পারলে ছয় মাসের মধ্যে পুরো টাকা ক্ষতিপূরণসহ ফেরত দিতে হবে। চুক্তিতে ক্ষতিপূরণের হার না থাকলে তা ১৫ শতাংশ। ১৯ থেকে ৩০ ধারায় নানা অপরাধের শাস্তি আছে। ২৪ ধারায় ক্রেতাকে না জানিয়ে অন্যত্র সম্পত্তি বিক্রি করলে সর্বোচ্চ তিন বছরের কারাদণ্ড বা ২০ লাখ টাকা জরিমানা, অথবা দুটোই হতে পারে।
কাগজে এসব ভালো শোনায়। কিন্তু আইন কেমন, তা বোঝা যায় ক্রেতা বিপদে পড়লে কী পান, তা দেখে। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের (টিবিএস) ডিসেম্বর ২০২৫ এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৩১ অক্টোবর ২০২৫ পর্যন্ত ফ্ল্যাট ও প্লটের বিরোধে সালিসের ২৪ হাজার ৪০৩টি আবেদন সারা দেশে নিষ্পত্তির অপেক্ষায় ছিল। এসব বিরোধে প্রায় ১৯ হাজার ৬৩০ কোটি টাকা জড়িত। শুধু ঢাকায় আবেদন ১৭ হাজার ৩০৮টি। এটি ফৌজদারি মামলার সংখ্যা থেকে আলাদা হিসাব। একই বিরোধ দুই হিসাবেই আছে কি না, তা প্রতিবেদনে স্পষ্ট নয়, তাই দুটি সংখ্যা যোগ করা ঠিক হবে না।
একই জমি দুই তিনজনের কাছে কেন বিক্রি হয়
সংক্ষেপে উত্তর হলো, ক্রেতা যে দুই জায়গার নাম শুনে ভরসা পান, তার কোনোটিই জমির মালিকানা বা বিক্রির হিসাব রাখে না। আরজেএসসি কোম্পানির নিবন্ধন দেয়। সনদ প্রমাণ করে, প্রতিষ্ঠানটি কোম্পানি হিসেবে নিবন্ধিত। কোন জমিতে কোন প্রকল্প হচ্ছে, জমির মালিক কে, নকশা অনুমোদিত কি না, তা সেই সনদ বলে না। টিবিএসে আসা হলিস্টিক হোম বিল্ডার্সের ঘটনায় প্রতিষ্ঠানটি আরজেএসসিতে নিবন্ধিত ছিল, কিন্তু রিহ্যাবের সদস্য ছিল না।
রিহ্যাব একটি ব্যবসায়ী সংগঠন। আইনে রিহ্যাবের সদস্যপদ বাধ্যতামূলক বলা হয়নি। ৫(৩)(চ) ধারা অনুযায়ী নিবন্ধনের আবেদনে সদস্যপদের কপি লাগে কেবল তা থাকলে। ২০১৭ সালে ফিনান্সিয়াল এক্সপ্রেসে প্রকাশিত এক মতামত লেখায় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ২১ মে ২০১৭ তারিখের একটি প্রজ্ঞাপনের কথা আছে, যেখানে সব ডেভেলপারের রিহ্যাব সদস্যপদ বাধ্যতামূলক বলা হয়েছিল। ওই প্রজ্ঞাপন এখন কার্যকর কি না, এই গবেষণায় স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি।
সদস্য হলেই যে নিরাপদ, তাও নয়। টিবিএসের আগের এক প্রতিবেদনে রিহ্যাবের তৎকালীন সভাপতি আলমগীর শামসুল আলামিন কাজল এ ধরনের প্রতারণার অস্তিত্ব স্বীকার করেন। ওই প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, এই আইনের অধীনে রিহ্যাব নিজে কোনো ব্যবস্থা নিতে পারে না। অর্থাৎ সংগঠন সদস্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ শুনতে পারে, কিন্তু আইনি শাস্তি দেওয়ার ক্ষমতা তার নেই। সিলেটের সংগঠন সারেগের চেয়ারম্যানও বলেছেন, অভিযুক্তরা সদস্য না হওয়ায় সাংগঠনিক ব্যবস্থার সুযোগ নেই।
আসল ফাঁক আরও গভীরে। আইনে এমন কোনো কেন্দ্রীয় তালিকার বিধান পাওয়া যায় না, যেখানে দেখা যাবে কোন প্রকল্পের কোন ফ্ল্যাট বা শেয়ার কার কাছে বিক্রি হয়েছে। জমির শেয়ার বিক্রিতে ক্রেতাকে শেয়ারের অনুপাতে মালিকানার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। এক ক্রেতা জানতে পারেন না, তাঁর পাশের কেউ একই জমির শেয়ার কিনেছেন কি না। হলিস্টিক হোম বিল্ডার্সের অভিযোগে ৩৬ জন ক্রেতা টাকা দেওয়ার পর জানতে পারেন, একই জমির শেয়ার আরও ৪০ জনের কাছে বিক্রি হয়েছে। এই অভিযোগ এখনো আদালতে প্রমাণিত নয়। তবে আইনি বিশ্লেষণে বিক্রির হিসাবের অভাবটি একটি বড় ফাঁক।
এর সঙ্গে আছে ঝুঁকির হিসাব। অর্থনীতিবিদ গ্যারি বেকারের তত্ত্ব বলে, মানুষ অপরাধের আগে শুধু শাস্তির কঠোরতা দেখে না। ধরা পড়ার আর দোষী সাব্যস্ত হওয়ার সম্ভাবনাও দেখে। ২৪ ধারায় সর্বোচ্চ জরিমানা ২০ লাখ টাকা। অথচ একই জমি তিনজনের কাছে বিক্রি করলে কোটি কোটি টাকা হাতে আসতে পারে। কঠিন শাস্তির চেয়ে নিশ্চিত শাস্তি অনেক বেশি ভয় দেখায়। আমাদের আইনে সেই নিশ্চয়তা কম।
প্রথম সীমাবদ্ধতা: সালিসের লম্বা পথ
আইনের ৩৬ ধারা বিরোধ মেটানোর পথ ঠিক করে দিয়েছে। প্রথমে দুই পক্ষ নিজেরা আপস করার চেষ্টা করবে। না হলে এক পক্ষ সালিসি ট্রাইব্যুনালে যাওয়ার নোটিশ দেবে। নোটিশ পাওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে দুই পক্ষ মিলে ট্রাইব্যুনাল গড়বে। তা না হলে আদালতে মামলা করা যাবে। এই পথের তালিকায় ২৪ ধারার অন্যত্র বিক্রি এবং ২৭ ধারার প্রতারণামূলক অপরাধও আছে। ফলে সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগগুলোও আগে সালিসের ধাপ পার হয়।
টিবিএসের ডিসেম্বর ২০২৫ এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাস্তবে ক্রেতা সরাসরি মামলা করতে পারেন না। তাঁকে জেলা জজ আদালতে আবেদন করতে হয়। জজ তিন সদস্যের সালিসি বোর্ড গঠন করেন। সেই বোর্ডের প্রধান সাধারণত অবসরপ্রাপ্ত জেলা জজ হন। এই ব্যবস্থা দ্রুত বিচারের জন্য বানানো হলেও এখন তা দেরির প্রতীক হয়ে উঠেছে বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী আফতাবুল ইসলাম সিদ্দিকী বলেন, সালিস বোর্ডের শুনানি বা প্রতিবেদন জমার কোনো স্পষ্ট সময়সীমা আইনে নেই। তাঁর মতে, জেলা জজের হাতে এমনিতেই হাজার হাজার মামলা থাকে। তাই সালিসে দেরি প্রায় অনিবার্য। তিনি সরাসরি মামলার সুযোগ দিয়ে বিচারের সময়সীমা বেঁধে দেওয়ার কথা বলেছেন। বিকল্প হিসেবে সালিসের দায়িত্ব নিচের আদালতকে দেওয়ার পরামর্শও দিয়েছেন।
ব্যারিস্টার আবদুল হালিমের অভিযোগ আরও কড়া। তাঁর ভাষ্য, ২০১০ সালের আগে ক্রেতারা সরাসরি দেওয়ানি বা ফৌজদারি মামলা করতে পারতেন। তিনি সালিসের কাঠামোকে মূলত দুর্বল বলেন, কারণ সেখানে গ্রেপ্তারি পরোয়ানার সুযোগ নেই এবং রোয়েদাদ কার্যকর করাও কঠিন। ডেভেলপারদের সংগঠনের চাপে আইনটি হয়েছে বলেও তিনি দাবি করেন। অন্যদিকে রিহ্যাবের তৎকালীন সভাপতি ওয়াহিদুজ্জামান বলেছেন, সব অংশীজনের সঙ্গে আলোচনা করে আইন হয়েছে এবং ক্রেতা ও ডেভেলপার উভয়ের জন্য প্রতিকার আছে।
সিনিয়র আইনজীবী আহসানুল করিম সতর্ক করেছেন, বিশেষ আদালত বা ফাস্ট ট্র্যাক ব্যবস্থা ছাড়া এই সংকট আরও বাড়বে। গৃহায়ন ও গণপূর্ত সচিব মো. নজরুল ইসলাম বলেছেন, আদালত বিদ্যমান আইন প্রয়োগ করছে। দেরি কমাতে আইন মন্ত্রণালয় বা সুপ্রিম কোর্টের হস্তক্ষেপ লাগতে পারে বলেও তিনি স্বীকার করেন।
২০১৯ সালের মে মাসে হাইকোর্ট সালিসে যেতে বাধ্য করার বৈধতা নিয়ে রুল জারি করেন। টিবিএসের ডিসেম্বর ২০২৫ এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, সেই রুলের শুনানি তখনো হয়নি। রুলের বর্তমান অবস্থা প্রকাশের আগে যাচাই করা দরকার। আরেকটি ফারাকও চোখে পড়ে। ৩৬(৪) ধারার লেখায় রোয়েদাদের বিরুদ্ধে আদালতে আপত্তির অধিকার নেই বলা হয়েছে। অথচ জালালের ঘটনায় আপত্তি দুই বছর ধরে শুনানির অপেক্ষায়। আইনের পাঠ আর বাস্তব প্রয়োগের এই অমিল আইনজীবীদের মতামত নিয়ে বোঝা দরকার।
দ্বিতীয় সীমাবদ্ধতা: শাস্তি আছে, কিন্তু ভয় নেই
আইনের ৩২ ধারা বলছে, এই আইনের সব অপরাধ আপোষযোগ্য, জামিনযোগ্য এবং অআমলযোগ্য। সহজ কথায়, পুলিশ সাধারণত পরোয়ানা ছাড়া গ্রেপ্তার করতে পারে না। জামিন পাওয়া সহজ। আপস করে মামলা মিটিয়ে ফেলাও যায়। অথচ যেখানে শত শত ক্রেতার টাকা জড়িত থাকতে পারে, সেখানে এই ব্যবস্থা প্রতারকের জন্য যথেষ্ট কঠিন নয় বলে অনেক আইনজীবী মনে করেন।
ক্ষতিগ্রস্ত ক্রেতার জন্য ৩৫ ধারা আরও ছোট ভরসা দেয়। জরিমানা আদায় হলে আদালত তার সর্বোচ্চ অর্ধেক ক্ষতিগ্রস্ত ক্রেতাকে দেওয়ার আদেশ দিতে পারেন। অর্থাৎ ২০ লাখ টাকা জরিমানা হলে ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা। টিবিএসের প্রতিবেদনে সিআইডির তথ্য অনুযায়ী, হলিস্টিক হোম বিল্ডার্সের সাতটি প্রকল্পে ৪৭০ জন গ্রাহকের কাছ থেকে প্রায় ২০০ কোটি টাকা নেওয়ার অভিযোগ আছে। এই অঙ্কের পাশে ১০ লাখ টাকা প্রায় কিছুই নয়। অভিযোগটি এখনো প্রমাণিত নয়, কিন্তু অনুপাতের ব্যবধানটি আইনের দুর্বলতা দেখায়।
ভালো দিকও আছে। ৩১ ধারায় কোম্পানির মালিক, পরিচালক বা কর্মকর্তা জ্ঞাতসারে অপরাধে অংশ নিলে ব্যক্তিগতভাবে দায়ী হবেন। দণ্ডবিধির প্রতারণার ধারায়ও মামলা হচ্ছে, যেখানে সর্বোচ্চ সাত বছরের কারাদণ্ডের বিধান আছে। রিহ্যাবের সাবেক সহসভাপতি কামাল মাহমুদও বলেছেন, এসব ঘটনায় ফৌজদারি আইনে মামলা হচ্ছে। তবে ফৌজদারি পথের নিজস্ব জটিলতা আছে, যার কথা নিচে আসছে।
তৃতীয় সীমাবদ্ধতা: টাকা ফেরতের কোনো নিরাপত্তা নেই
আইনের ১২(১) ধারা বলে, ক্রেতা ব্যাংকের মাধ্যমে টাকা দেবেন। কিন্তু সেই টাকা ডেভেলপার কোথায় রাখবেন এবং কীভাবে খরচ করবেন, সে বিষয়ে আলাদা হিসাবের কোনো শর্ত আইনের পাঠে পাওয়া যায়নি। অর্থাৎ ক্রেতার টাকা প্রকল্পের কাজেই লাগবে, এমন নিশ্চয়তা আইন দেয় না। টাকা অন্য কাজে চলে গেলে ১৫ ধারার ফেরতের অধিকার কাগজেই থেকে যায়। বিধিমালায় এ নিয়ে কিছু আছে কি না, তা আলাদা করে দেখা দরকার।
১৬ ধারা ক্রেতার সম্মতি ছাড়া বিক্রি হয়ে যাওয়া ফ্ল্যাট বন্ধক রাখা নিষিদ্ধ করেছে। ২৩ ধারায় তার শাস্তিও আছে।
সময়মতো ফ্ল্যাট না পেলে ১৫ ধারায় ক্ষতিপূরণসহ টাকা ফেরতের কথা আছে। চুক্তিতে হার না থাকলে ক্ষতিপূরণ ১৫ শতাংশ। কিন্তু বছর পার হওয়ার পর ডেভেলপারের হাতে টাকা আছে কি না, তা আইন দেখে না। প্রকল্পের হিসাব আটকে দেওয়া বা সম্পদ জব্দ করার মতো স্পষ্ট ক্ষমতা কর্তৃপক্ষকে দেওয়া হয়েছে বলে আইনের পাঠে চোখে পড়েনি।
চতুর্থ সীমাবদ্ধতা: নিবন্ধনহীন প্রতিষ্ঠান আর জমির শেয়ারের ফাঁক
আইনের ২(১৫) ধারায় ডেভেলপার মানে ৫ ধারায় নিবন্ধিত ব্যক্তি। ১৫ ধারার টাকা ফেরত এবং ৩৬ ধারার সালিসের পথ এই ডেভেলপার শব্দের ওপরই দাঁড়িয়ে আছে। যে প্রতিষ্ঠান নিবন্ধনই নেয়নি, তার ক্ষেত্রে ক্রেতা এই সুরক্ষা কীভাবে পাবেন, সেটি একটি আইনি প্রশ্ন। ১৯ ধারায় নিবন্ধন ছাড়া ব্যবসা করা অপরাধ। কিন্তু ক্রেতার টাকা ফেরতের আলাদা বিধান সেখানে নেই।
জমির শেয়ার বিক্রির মডেল আইনের ভাষায় পরিষ্কার নয়। ২(১২) ধারায় রিয়েল এস্টেট মানে প্লট, অ্যাপার্টমেন্ট বা ফ্ল্যাটের মতো সম্পত্তি। শেয়ারের মাধ্যমে জমির মালিকানা আর ফ্ল্যাটের প্রতিশ্রুতি একসঙ্গে বিক্রি হলে সেটি এই আইনের কোন ধরনে পড়ে, তা নিয়ে আইনজীবীদের মতামত নেওয়া দরকার।
৬(৪) ধারা ডেভেলপারকে ক্রেতার সামনে অনুমোদন ও জমির দলিল দেখাতে বলে। এই নিয়ম ভাঙলে আলাদা শাস্তি কী হবে, তা চোখে পড়েনি। ৫(৬) ধারা নিবন্ধিত ডেভেলপারদের তালিকা প্রকাশ করতে বলেছে। কিন্তু প্রকল্প ধরে ধরে তালিকা বা বিক্রির তথ্য সংরক্ষণের কথা আইনে নেই।
আইনের ৪ ধারায় কর্তৃপক্ষও একটি নয়। ঢাকায় রাজউক, অন্য শহরে সিটি কর্পোরেশন বা পৌরসভা, আর বাকি এলাকায় জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ। এমন ভাগাভাগিতে সারা দেশের প্রকল্পের হিসাব এক জায়গায় জমা হয় না। টিবিএসের তথ্য ভাগ করে দেখা যায়, ঢাকায় মামলাপ্রতি গড় অর্থ প্রায় ৭৬ লাখ টাকা। সিলেটে তা প্রায় ৩ কোটি ৮০ লাখ এবং মুন্সিগঞ্জে প্রায় ২ কোটি ৮০ লাখ টাকা। কারণ নিশ্চিত নয়, তবে ঢাকার বাইরে তদারকি কতটা শক্ত, সেই প্রশ্ন ওঠে।
আদালতে কি পথ খোলা?
ফৌজদারি পথে দণ্ডবিধির প্রতারণার ধারায় মামলা হয়। সেখানে সর্বোচ্চ সাত বছরের কারাদণ্ডের বিধান আছে। কিন্তু আসামিপক্ষ আদালতে সালিসের যুক্তি তুলতে পারে। তখন প্রশ্ন ওঠে, ফৌজদারি মামলা চলবে কি না। এ নিয়ে ২০২৬ সালের একটি রায় লক্ষ করার মতো।
হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি মো. বশির উল্লাহ ১৮ মে ২০২৬ তারিখে ফৌজদারি আপিল ১০৪৭৫/২০১৮ মামলার রায় দেন। মামলাটি ছিল এক ডেভেলপার কোম্পানির এমডির ফেরত আসা চেক নিয়ে, নেগোশিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্টস অ্যাক্টের ১৩৮ ধারায়। আসামিপক্ষ বলেছিল, বিরোধ সালিসযোগ্য, তাই সাজা টেকে না। আদালত বলেছেন, চেকটি নির্মাণ চুক্তির সরাসরি বিরোধ থেকে আসেনি। সেটি পরের আপস থেকে আসা আলাদা আর্থিক দায়। তাই ৩৬ ধারা এখানে বাধা হয়নি। রায়টি ওই মামলার তথ্যের ওপর দাঁড়িয়ে। সব আবাসন বিরোধে সালিসের বাধা নেই, এমন সাধারণ নিয়ম এখান থেকে বলা যায় না।
কোম্পানি আইনের পথও আছে। মাহবুব অ্যান্ড কোম্পানি তাদের প্রকাশনায় জানিয়েছে, ড. সৈয়দ মোস্তফা মালেক বনাম রাসেল লজ হোল্ডিংস লিমিটেড মামলায় হাইকোর্টের কোম্পানি বেঞ্চ একটি আবাসন কোম্পানিকে অবসায়নের পথে নিয়েছে। ওই প্রকাশনা অনুযায়ী, আদালত বলেছে, রিয়েল এস্টেট আইনের সালিস ধারা অবসায়নের আবেদনে বাধা নয়। কোম্পানি বছরের পর বছর কাজ না করলে আদালত তার আসল উদ্দেশ্য শেষ হয়ে গেছে বলে ধরতে পারেন। তবে মামলাটি ছিল জমির মালিকের পক্ষে, ফ্ল্যাট ক্রেতার নয়। ওই ফার্মই আবেদনকারীর পক্ষে ছিল। রায়ের বিস্তারিত নিজ উদ্যোগে যাচাই করা যায়নি।
একটি প্রকল্পে শত শত ক্রেতা থাকলে প্রত্যেকের আলাদা মামলায় সময় ও খরচ দুটোই বাড়ে। দেওয়ানি কার্যবিধির ১ নম্বর আদেশের ৮ নম্বর বিধিতে একই স্বার্থের বহু মানুষের পক্ষে একজন বা কয়েকজনের মামলা করার সুযোগ আছে। আবাসন বিরোধে এটি কাজে লাগবে কি না, ৩৬ ধারার বাধা মাথায় রেখে বিশেষজ্ঞ আইনজীবীদের কাছ থেকে জেনে নেওয়া ভালো।
অন্যান্য দেশের আইনি সমাধান কি?
এই সমস্যা শুধু আমাদের নয়। ভারত, মালয়েশিয়া ও দুবাই আলাদা পথে একই সমস্যা সামলাতে চেয়েছে। তাদের আইনের মূল কথা তিনটি। ক্রেতার টাকা আলাদা করে সুরক্ষিত রাখা, বিক্রির তথ্য খোলা রাখা এবং বিরোধ দ্রুত নিষ্পত্তি করা।
ভারতের রিয়েল এস্টেট (রেগুলেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট) আইন ২০১৬, যা সংক্ষেপে রেরা নামে পরিচিত, সবচেয়ে বেশি আলোচিত। প্রকল্পের তথ্য ওয়েবসাইটে প্রকাশ করতে হয়। ক্রেতার কাছ থেকে পাওয়া টাকার অন্তত ৭০ শতাংশ আলাদা ব্যাংক হিসাবে রাখতে হয়। সেখান থেকে টাকা তোলা যায় প্রকৌশলী, স্থপতি ও চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টের সনদ পেলে, এবং কেবল জমি ও নির্মাণ খরচে।
সময়মতো দখল না দিলে ১৮ ধারায় ক্রেতা সুদসহ টাকা ফেরত চাইতে পারেন। অভিযোগ শোনে রাজ্যের রেরা কর্তৃপক্ষ। আইনে অভিযোগ ও আপিল ৬০ দিনের মধ্যে শেষ করার কথা আছে। আপিল যায় আপিল ট্রাইব্যুনালে, তারপর হাইকোর্টে। বাস্তবে এই সময়সীমা কতটা মানা হয়, তা যাচাই করা যায়নি। ৭০ শতাংশ হিসাবেরও সীমা আছে। এনএলআইইউ ল জার্নালে বিনমা কুমার বনসাল ও হর্ষ বনসালের এক লেখায় দেখানো হয়েছে, দেউলিয়া প্রক্রিয়ায় এই হিসাব ক্রেতার টাকা কতটা রক্ষা করে, তা নিয়ে জটিলতা আছে।
মালয়েশিয়ায় ১৯৬৬ সালের হাউজিং ডেভেলপমেন্ট (কন্ট্রোল অ্যান্ড লাইসেন্সিং) আইনে ডেভেলপারকে লাইসেন্স নিতে হয়। বিজ্ঞাপন ও বিক্রির আগে অনুমতিও লাগে। ক্রেতার টাকা যায় আলাদা হাউজিং ডেভেলপমেন্ট অ্যাকাউন্টে। ২০০২ সালের ডিসেম্বরে আইন সংশোধন করে গৃহ ক্রেতাদের দাবি নিষ্পত্তির আলাদা ট্রাইব্যুনাল গড়া হয়।
সেই ট্রাইব্যুনালে আবেদনের ফি শুরু মাত্র ১০ রিঙ্গিত থেকে। শুনানির প্রথম দিন থেকে সম্ভব হলে ৬০ দিনের মধ্যে রায় দিতে হয়। রায় আদালতের রায়ের মতোই কার্যকর। রায় না মানলে জাতীয় গৃহায়ন বিভাগ ব্যবস্থা নিতে পারে এবং কালো তালিকা প্রকাশ করা হয়। সীমাবদ্ধতাও আছে। একেকটি দাবির সর্বোচ্চ সীমা ৫০ হাজার রিঙ্গিত, আবেদন করতে হয় ১২ মাসের মধ্যে, আর বড় অঙ্কের প্রতারণায় আদালতেই যেতে হয়।
দুবাইয়ে ২০০৭ সালের ৮ নম্বর আইনে প্রতিটি প্রকল্পের জন্য আলাদা এসক্রো হিসাব বাধ্যতামূলক। ডেভেলপাররা সরকারি নিবন্ধনে তালিকাভুক্ত হন। ২০০৮ সালের ১৩ নম্বর আইনে সব নির্মাণাধীন প্রকল্পের বিক্রি দুবাই ল্যান্ড ডিপার্টমেন্টের অন্তর্বর্তী নিবন্ধনে তুলতে হয়। আইন সংস্থাগুলোর প্রকাশনা বলছে, এতে একই ইউনিট দুইবার বিক্রি ঠেকানো যায়। একটি প্রকাশনা অনুযায়ী, ওই নিবন্ধনের বাইরের লেনদেন বাতিল বলে গণ্য হয়। বাতিল প্রকল্পের নিষ্পত্তির জন্য বিশেষ ট্রাইব্যুনালের কথাও একটি রিয়েল এস্টেট প্রতিষ্ঠানের ব্লগে এসেছে।
দুবাই একটি ছোট নগর রাষ্ট্র। সেখানে একটি নিবন্ধন ব্যবস্থায় সব জমি আনা সহজ। আমাদের মতো বিশাল ভূমি ব্যবস্থায় তা হুবহু মেলে না। তবে বিক্রির নিবন্ধনের ধারণাটি শেখার মতো। তিন দেশের পাশে রাখলে আমাদের আইনে চারটি ফারাক চোখে পড়ে।
দ্রুত বিচারের জন্য আলাদা আদালত
ফ্ল্যাট ক্রেতার বিরোধে তিন ধরনের কাজ থাকে। কাগজ যাচাই, টাকার হিসাব আর দখল। সাধারণ ফৌজদারি আদালত এসব নিয়ে আলাদা সময় দিতে পারে না। তাই সিনিয়র আইনজীবী আহসানুল করিম বিশেষ আদালত বা ফাস্ট ট্র্যাক ব্যবস্থার কথা বলেছেন। তাঁর সতর্কতা, এমন ব্যবস্থা ছাড়া ক্রেতাদের ব্যর্থ হওয়ার ধারা চলতেই থাকবে। বাংলাদেশে অর্থঋণ আদালতের মতো বিশেষ আদালতের অভিজ্ঞতাও আছে।
এমন আদালত বা ট্রাইব্যুনাল গড়লে চারটি বিষয় আইনেই লিখে দেওয়া দরকার। প্রথমত, ক্রেতার সরাসরি অভিযোগ করার অধিকার। সালিস চাইলে দুই পক্ষ বেছে নেবে, বাধ্যতামূলক হবে না। দ্বিতীয়ত, নির্দিষ্ট সময়সীমা। মালয়েশিয়ায় শুনানির প্রথম দিন থেকে ৬০ দিনের কথা আছে। আমাদের বাস্তবতায় প্রথমে ১৮০ দিনের মতো একটি সীমা ভাবা যেতে পারে। তৃতীয়ত, অন্তর্বর্তী আদেশের ক্ষমতা, যেমন প্রকল্পের বিক্রি বন্ধ বা ব্যাংক হিসাব জব্দ। চতুর্থত, রায় কার্যকর করার জোর।
নতুন আদালত গড়তে সময় লাগবে। এর মধ্যে চলতি ব্যবস্থাতেও কিছু করা যায়। আফতাবুল ইসলাম সিদ্দিকী সালিসের দায়িত্ব জেলা জজের বদলে নিচের আদালতকে দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছেন। সুপ্রিম কোর্ট চাইলে আবাসন সালিসের জন্য নির্দিষ্ট আদালত ঠিক করার কথা ভাবতে পারে। শুনানির সময়সূচি অনলাইনে প্রকাশ করা যায়। যে প্রকল্পে ক্রেতা অনেক, সেগুলো একসঙ্গে শুনলে সময় বাঁচে।
একটি সতর্কতাও জরুরি। বিশেষ আদালত নিজে জাদু নয়। বিচারক, কর্মচারী, ডিজিটাল নথি আর সময়সীমা ছাড়া নতুন আদালতেও জট তৈরি হতে পারে। ঢাকার বাইরের ক্রেতা যেন সহজে অভিযোগ করতে পারেন, সেই ব্যবস্থাও থাকতে হবে।
আইনি সমাধান কী?
সমাধান শুধু নতুন আইনে নয়। কিছু কাজ বিদ্যমান আইনেই সম্ভব। বাকিগুলোর জন্য সংশোধনী লাগবে।
প্রথম সংশোধন হওয়া উচিত টাকার সুরক্ষা। প্রতিটি প্রকল্পের জন্য আলাদা ব্যাংক হিসাব বাধ্যতামূলক করা যায়। সেখান থেকে টাকা উঠবে নির্মাণের ধাপ অনুযায়ী, স্বাধীন প্রকৌশলী ও হিসাবরক্ষকের সনদ পেলে। ভারতের ৭০ শতাংশ নিয়ম আর দুবাইয়ের এসক্রো, দুটি মডেলই খতিয়ে দেখা যায়। এতে ক্রেতার টাকা অন্য কাজে যাওয়া কঠিন হয়।
দ্বিতীয় সংশোধন হতে পারে বিক্রির কেন্দ্রীয় নিবন্ধন। প্রকল্পের জমির দলিল, অনুমোদন নম্বর এবং বিক্রি হওয়া প্রতিটি ফ্ল্যাট বা শেয়ারের তালিকা অনলাইনে এক জায়গায় থাকবে। নতুন ক্রেতা টাকা দেওয়ার আগে দেখবেন, ওই ইউনিট আগে কাউকে বিক্রি হয়েছে কি না। দুবাইয়ের অন্তর্বর্তী নিবন্ধন সিস্টেম এই ধারনার সাথে মিলে যায়। জমির শেয়ার বিক্রির মতো মডেলকে আইনে স্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত করাও জরুরি। তাহলে এই নিবন্ধন সেসব ক্ষেত্রেও খাটবে।
তৃতীয় সংশোধন শাস্তি ও ক্ষমতা নিয়ে। ২৪ ও ২৭ ধারার অপরাধে জরিমানা ২০ লাখ টাকায় আটকে না রেখে প্রতারণার অঙ্কের সঙ্গে মিলিয়ে ঠিক করার কথা ভাবা যায়। ক্ষতিগ্রস্ত ক্রেতাকে আগে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার ব্যবস্থাও থাকা উচিত। এখন ৩৫ ধারায় জরিমানার সর্বোচ্চ অর্ধেক দেওয়া যায়। অভিযুক্ত ডেভেলপারের প্রকল্প হিসাব জব্দ বা নিবন্ধন স্থগিত করার ক্ষমতা কর্তৃপক্ষকে দেওয়া যায়। মালয়েশিয়ার হাউজিং কন্ট্রোলারের এমন ক্ষমতার কথা সেখানকার সংগঠনের প্রতিবেদনে এসেছে।
চতুর্থ সংশোধন বিরোধ নিষ্পত্তি নিয়ে। ৩৬ ধারার বাধ্যতামূলক সালিস বদলে ক্রেতাকে সরাসরি ট্রাইব্যুনালে যাওয়ার অধিকার দেওয়া যায়। সালিস থাকবে ঐচ্ছিক পথ। ফৌজদারি অপরাধে আপসের আগে আদালতের অনুমতির কথাও ভাবা যায়, যাতে চাপে পড়ে আপস না হয়।
পঞ্চম বিষয় আরজেএসসি ও রিহ্যাবের ভূমিকা। আবাসন ব্যবসার ক্ষেত্রে কোম্পানির তথ্যের সঙ্গে রাজউকের আবাসন নিবন্ধনের তথ্য যুক্ত করার কথা ভাবা যায়। রিহ্যাব সদস্যপদের তালিকা প্রকাশ্য রাখা যায়। কিন্তু আসল দায় সরকারি কর্তৃপক্ষের। ব্যবসায়ী সংগঠন আইনি শাস্তি দিতে পারে না।
ক্রেতার জন্য করণীয়
আইন সংশোধন হতে সময় লাগবে। তার আগে ক্রেতার নিজের সুরক্ষার কিছু কাজ আছে। রিহ্যাবের সভাপতি ড. মো. আলী আফজাল বলেছেন, কেনার আগে দেখতে হবে প্রতিষ্ঠান রিহ্যাবের সদস্য কি না, প্রকল্পে রাজউকের অনুমোদন আছে কি না এবং জমির কাগজ ঠিক আছে কি না। আইনের ৬(১) ধারা অনুযায়ী প্রসপেক্টাসে নিবন্ধন নম্বর এবং অনুমোদিত নকশার স্মারক নম্বর ও তারিখ থাকার কথা। সেটিও মিলিয়ে নিন। আরজেএসসির সনদকে প্রকল্পের অনুমোদন ভাববেন না।
জমির মালিকানা যাচাইয়ে খতিয়ান, দলিল ও মালিকানার ধারাবাহিকতা সংশ্লিষ্ট দপ্তর থেকে নিজে দেখুন। টাকা দেবেন ব্যাংকের মাধ্যমে, কারণ ১২(১) ধারাও তাই বলে। চুক্তির সময়সীমা, ক্ষতিপূরণের হার আর বিরোধ নিষ্পত্তির ধারা ভালো করে বুঝে নিন। কাগজ দেখাতে দেরি, নকশার নম্বর না দেওয়া আর তাড়াহুড়ো করে টাকা চাওয়া, এগুলো সতর্ক হওয়ার সংকেত। অভিযোগ থাকলে রিহ্যাব, রাজউক এবং প্রয়োজনে আদালতে একসঙ্গে অভিযোগ জানানো যায়।
Joydip Ghosh
Legal Specialist

