রাজধানীর বারিধারা ডিপ্লোম্যাটিক জোনে গাড়িচাপায় এক নির্মাণশ্রমিক নিহতের ঘটনায় অভিযুক্ত ১৭ বছর বয়সী কিশোরকে জামিন দিয়েছেন আদালত। বৃহস্পতিবার সড়ক পরিবহন আইনে করা মামলায় জামিন আবেদনের শুনানি শেষে শিশু আদালত-৮-এর বিচারক মো. আবদুল মোক্তাদির এই আদেশ দেন। আদালতের একজন কর্মচারী বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। এর আগে ৪ থেকে ১৪ অক্টোবরের মধ্যে দুই দফায় কিশোরের জামিন আবেদন নাকচ হয়েছিল।
ঘটনাটি ঘটে গত ২২ সেপ্টেম্বর বিকেল ৫টার দিকে। বারিধারা ১ নম্বর রোডের ফুটপাতে তখন বসে ছিলেন নির্মাণশ্রমিক মেহেদী হাসান মীর। একটি গাড়ি দ্রুতগতিতে ফুটপাতে উঠে তাঁকে আঘাত করে। প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, নীলফামারীর ডোমার উপজেলার সোনাদাড়া গ্রামের বাসিন্দা মেহেদীকে স্থানীয় লোকজন গাড়ির নিচ থেকে উদ্ধার করে কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।
আদালতের নথি অনুযায়ী, অভিযুক্ত কিশোর গুলশানের একটি ইংরেজি মাধ্যম স্কুলের ও-লেভেলের শিক্ষার্থী। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, দুর্ঘটনার পর সে চালকের আসন থেকে বেরিয়ে আসছে। এ ঘটনায় নিহতের বড় ভাই মোক্তাদীর ইসলাম মামলা করেন। কিন্তু ঘটনাস্থল থেকে আটক হওয়ার পরও মামলায় কিশোরের নাম ছিল না। পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ ও গণমাধ্যমে খবর প্রকাশের পর ২৩ সেপ্টেম্বর পুলিশ তাকে গুলশান থেকে গ্রেপ্তার করে।
২৪ সেপ্টেম্বর গুলশান থানার উপপরিদর্শক ও মামলার তদন্ত কর্মকর্তা আরেফিন ইসলাম কিশোরকে আদালতে হাজির করে আটক রাখার আবেদন করেন। আদালত তাকে গাজীপুরের শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
ওই দিন আসামিপক্ষের আইনজীবী আলমগীর হোসেন জানান, ৯ লাখ টাকার বিনিময়ে বিষয়টি নিষ্পত্তি হয়েছে। পরবর্তী জামিন শুনানিতে আপসনামা আদালতে জমা দেওয়া হবে বলেও তিনি জানান। তাঁর ভাষ্য, নিহতের পরিবার আত্মীয়স্বজন ও সাক্ষীদের উপস্থিতিতে কিশোরের পরিবারের কাছ থেকে মোট ৯ লাখ টাকা নিয়েছে এবং পরে আপসনামা করেছে। নথি অনুযায়ী, এর মধ্যে নিহতের দাফন ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানের জন্য ১ লাখ টাকা এবং তাঁর বৃদ্ধ বাবা-মায়ের ভবিষ্যৎ প্রয়োজনে আরও ৮ লাখ টাকা নগদ দেওয়া হয়েছে।
তবে আপসনামার বিবরণ নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। এতে উল্লেখ করা হয়েছে, দুর্ঘটনার সময় আকাশ মারাক নামে একজন গাড়ি চালাচ্ছিলেন এবং কিশোর গাড়ির ভেতরে ছিল। অথচ আদালতে জমা দেওয়া পুলিশের ফরওয়ার্ডিং রিপোর্টে ভিন্ন তথ্য এসেছে। তদন্তকারীরা ঘটনাস্থল ও আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে দেখেছেন, ঘটনার পরপরই ওই কিশোর, যাকে প্রতিবেদনে আইনের সংস্পর্শে আসা শিশু বলা হয়েছে, গাড়ির ডান দিকে চালকের দরজা খুলে বেরিয়ে আসছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তদন্তে প্রাথমিক সত্যতা মিলেছে, যা ঘটনার সঙ্গে কিশোরের সংশ্লিষ্টতার ইঙ্গিত দেয়।
ঘটনাটি দেশের বিচারব্যবস্থা ও সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এনেছে। প্রথমত, প্রভাবশালী পরিবারের সন্তানের ক্ষেত্রে মামলা ও গ্রেপ্তারের প্রক্রিয়া কতটা নিরপেক্ষ থাকে, তা নিয়ে আলোচনা তৈরি হয়েছে। ঘটনাস্থলে আটক হওয়ার পরও প্রথম দিকে মামলায় নাম না থাকা এবং জনরোষের পর গ্রেপ্তারের ঘটনা সেই প্রশ্নকেই জোরালো করেছে। দ্বিতীয়ত, আর্থিক ক্ষতিপূরণের মাধ্যমে আপস এ ধরনের মামলায় কতটা গ্রহণযোগ্য, তা নিয়েও বিতর্কের সুযোগ আছে। নিহত শ্রমিকের দরিদ্র পরিবারের জন্য এই অর্থ বড় সহায়তা হতে পারে। তবে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানির মতো ঘটনায় অর্থের বিনিময়ে নিষ্পত্তি ভবিষ্যতে দায়িত্বহীন গাড়ি চালানোকে উৎসাহিত করতে পারে বলে অনেকে মনে করেন। তৃতীয়ত, আপসনামার তথ্য ও পুলিশের প্রতিবেদনের মধ্যে অসংগতি তদন্ত ও বিচারের ক্ষেত্রে স্পষ্টতা দাবি করে।
উল্লেখ্য, জামিন পাওয়ার অর্থ এই নয় যে অভিযোগ থেকে অব্যাহতি মিলেছে। এটি মামলার প্রাথমিক পর্যায়ের একটি আদেশ মাত্র। অভিযুক্ত কিশোর আইন অনুযায়ী শিশু আদালতের আওতায় রয়েছে। চালকের আসনে প্রকৃতপক্ষে কে ছিল এবং দুর্ঘটনার জন্য কে দায়ী, তা তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই চূড়ান্তভাবে নির্ধারিত হবে। এ বিষয়ে অভিযুক্ত পক্ষ ছাড়া অন্যদের বক্তব্য প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি।

