একটি শিশু একা ঘর ছেড়েছিল। তার একটাই স্বপ্ন ছিল, কোথাও একটু নিরাপদে থাকা। সে ভেবেছিল ইউরোপের মাটিতে পা রাখলেই ভয় শেষ হবে। কিন্তু অভিযোগ অনুযায়ী সেই মাটি থেকেই তাকে সাগরে ঠেলে দেওয়া হয়েছিল। আজ ছয় বছর পরও সে নিজের কষ্টের স্বীকৃতি খুঁজছে।
সামোসে পৌঁছানো এক ক্লান্ত কিশোর
আইনি নথিতে ছেলেটির নাম প্রকাশ করা হয়নি। তাকে ডাকা হয় জি আর জে নামে। তার দাবি অনুযায়ী ২০২০ সালের ৮ সেপ্টেম্বর সে তুরস্কের উপকূল থেকে গ্রিসের সামোস দ্বীপে পৌঁছায়। তখন তার বয়স ১৫ বছর, সঙ্গে ছিল আরেক কিশোর। দুজন কয়েক ঘণ্টা হেঁটে সন্ধ্যায় ভাথি শরণার্থী শিবিরে পৌঁছায়। ক্লান্ত শরীরে সেই রাতে হয়তো তারা একটু শান্তির ঘুমের আশা করেছিল।
পরদিন সকালে গ্রিক কর্মকর্তারা তাদের কাছে আসেন বলে অভিযোগ। কিশোর দুজন নিজেদের বয়স জানায় এবং আশ্রয় চায়। কিন্তু এই কথা কোনো খাতায় লেখা হয়নি। তাদের বলা হয় করোনা কোয়ারেন্টিনে নেওয়া হবে, পরে আবার শিবিরে আনা হবে। বিশ্বাস করে তারা গাড়িতে ওঠে। গাড়ি তাদের নিয়ে যায় জনসাধারণের চোখের আড়ালের পথ দিয়ে বন্দরের দিকে।
অভিযোগ অনুযায়ী বন্দরে তাদের তোলা হয় গ্রিক কোস্ট গার্ডের একটি জাহাজে। মাঝ সাগরে তাদের নামিয়ে দেওয়া হয় একটি ছোট ভেলায়। ভেলায় কোনো ইঞ্জিন ছিল না, দাঁড় ছিল না। লাইফ জ্যাকেট, খাবার আর পানিও ছিল না। মোবাইল ফোন আগেই কেড়ে নেওয়া হয়েছিল, তাই সাহায্য চাওয়ারও উপায় ছিল না। পরে তুর্কি কোস্ট গার্ড দুই কিশোরকে উদ্ধার করে। গ্রিক কর্তৃপক্ষ এই বিবরণ মানেনি। তাদের দাবি, ওই দুই কিশোরকে তারা গ্রিসের মাটিতে পায়নি।
পুশব্যাক কী এবং আইন কী বলে
আন্তর্জাতিক আইনের ভাষায় এই কাজকে বলা হয় পুশব্যাক। অর্থাৎ কোনো দেশ কাউকে আশ্রয়ের আবেদন করতে না দিয়ে গোপনে সীমান্তের বাইরে ঠেলে দেয়। ১৯৫১ সালের জাতিসংঘ শরণার্থী কনভেনশনের ৩৩ নম্বর ধারায় নন রিফুলমেন্টের নীতি আছে। এই নীতি বলে, কাউকে এমন জায়গায় ফেরত পাঠানো যাবে না, যেখানে তার জীবন বা স্বাধীনতা বিপদে পড়তে পারে। গ্রিস এই কনভেনশনের পক্ষ। তাই এই নীতি মানা তার আইনি দায়িত্ব।
এ নিয়ে ইউরোপের আদালত আগেও কড়া কথা বলেছে। ২০১২ সালের হিরসি জামা বনাম ইতালি মামলায় ইউরোপীয় মানবাধিকার আদালতের গ্র্যান্ড চেম্বার বলেছিল, সাগরে আটক মানুষকে কোনো যাচাই ছাড়া ফেরত পাঠানো যায় না। সেই রায় শরণার্থীদের বড় ভরসা হয়েছিল। তাই জি আর জে ২০২১ সালের মার্চে নিজের মামলা নিয়ে এই আদালতেই গিয়েছিলেন। তিনি আশা করেছিলেন, এখানে অন্তত তার কথা শোনা হবে।
ইউরোপীয় মানবাধিকার আদালতের শুনানি ও সিদ্ধান্ত
মামলাটির শুনানি হয় ২০২৪ সালের ৪ জুন। এটি ছিল গ্রিসের পুশব্যাক নিয়ে আদালতের প্রথম শুনানি। ২০২৫ সালের ৭ জানুয়ারি আদালত দুটি সিদ্ধান্ত দেয়। এ আর ই বনাম গ্রিস মামলায় (আবেদন নম্বর ১৫৭৮৩/২১) আদালত কনভেনশনের একাধিক লঙ্ঘন খুঁজে পায়। কিন্তু জি আর জে বনাম গ্রিস মামলায় (আবেদন নম্বর ১৫০৬৭/২১) আদালত আবেদনটি গ্রহণযোগ্য নয় বলে জানায়। আদালতের মতে, তিনি সামোসে থাকার এবং সেখান থেকে ফেরত পাঠানোর প্রাথমিক প্রমাণ দিতে পারেননি, তাই তিনি ক্ষতিগ্রস্ত পক্ষ হিসেবে গণ্য হননি।
এখানেই প্রশ্নটা কঠিন হয়ে ওঠে। কারণ আদালত নিজেই বলেছে, ওই সময়ে গ্রিসের দ্বীপগুলো থেকে তুরস্কে পুশব্যাকের একটি ধারাবাহিক চর্চা থাকার জোরালো ইঙ্গিত আছে। আদালত এ-ও মেনেছে যে পুশব্যাক প্রমাণ করা খুব কঠিন, কারণ এটি গোপনে ঘটে। এল মাসরি বনাম মেসিডোনিয়া মামলার মতো আগের রায়ে আদালত বলেছিল, রাষ্ট্র যখন সব তথ্য নিজের হাতে রাখে, তখন আবেদনকারীর বিস্তারিত ও সঙ্গতিপূর্ণ বক্তব্য এবং পরিস্থিতিগত প্রমাণ পেলে প্রমাণের দায় রাষ্ট্রের ওপর যেতে পারে। সমালোচকদের প্রশ্ন, এই মামলায় সেই নীতি কেন পুরোপুরি কাজে লাগল না।
যে প্রমাণগুলো ছিল
প্রমাণ একেবারে কম ছিল না, এমনটাই বলছেন তার পক্ষের আইনজীবী ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো। তাদের তথ্য অনুযায়ী সামোসে পৌঁছানোর ছবি ও ভিডিও সঙ্গীরা একটি বেসরকারি সংস্থার কাছে পাঠিয়েছিলেন। তুর্কি কোস্ট গার্ডের প্রকাশ করা উদ্ধারের ভিডিওতে দুই কিশোরকে দেখা গিয়েছিল। শিবিরের এক আশ্রয়প্রার্থী সেই ভিডিওতে তাদের চিনেছিলেন। গ্রিসের নিজস্ব স্বচ্ছতা কর্তৃপক্ষের খোঁজেও গ্রিক কর্মকর্তাদের বক্তব্যের সঙ্গে নথির অমিল ধরা পড়েছিল বলে জানা যায়।
আদালতের সন্দেহ এবং একটি শিশুর প্রতি প্রশ্ন
তবু আদালত তার বক্তব্যে কিছু অসঙ্গতি দেখেছে। পরে দেওয়া একটি সাক্ষাৎকারে একটি বিষয়ের উল্লেখ ছিল না। সামোসে তোলা তার নিজের কোনো ছবিও ছিল না। অথচ ছবি তোলার ফোনটাই তো কেড়ে নেওয়া হয়েছিল। একটি ১৫ বছরের শিশুর কাছে নিখুঁত কাগজপত্র আশা করা কতটা ন্যায্য, সেই প্রশ্ন এখন আইনজীবী ও গবেষকদের মুখে মুখে। আরও কষ্টের কথা, বিশ্লেষকদের মতে রায়ের এক জায়গায় ওই কিশোরদের পুরুষ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। একটি শিশুর শৈশব যেন এক শব্দেই মুছে গেল।
পরে মিলেছিল আশ্রয়ের স্বীকৃতি
এই কাহিনির একটি দিক আরও মন ভারী করে। গবেষকদের লেখা অনুযায়ী প্রায় এক বছর পর জি আর জে গ্রিসে ঢুকতে পারেন এবং আশ্রয় চান। পরে তিনি শরণার্থী হিসেবে স্বীকৃতিও পান। অর্থাৎ তার সুরক্ষার প্রয়োজন কখনো অস্বীকার করা হয়নি। যে সুরক্ষা তিনি এক বছর আগে চেয়েছিলেন, সেটাই পরে তাকে দেওয়া হলো। শুধু ২০২০ সালের সেই দিনের কষ্টের বিচার আজও বাকি।
জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিটির দরজায়
ইউরোপের আদালতের দরজা বন্ধ হওয়ার পর জি আর জে এখন জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিটির কাছে ব্যক্তিগত অভিযোগ জমা দিয়েছেন। কমিটি নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার বিষয়ক আন্তর্জাতিক চুক্তি বা আইসিসিপিআর এর বাস্তবায়ন দেখে। এই চুক্তির ১৬ নম্বর ধারা প্রত্যেক মানুষকে আইনের চোখে ব্যক্তি হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার অধিকার দেয়। পুশব্যাকের আসল কৌশলই হলো মানুষকে আইনের বাইরে ঠেলে দেওয়া, যাতে সে কোথাও নালিশ করতে না পারে। আর ২৪ নম্বর ধারার ১ উপধারা প্রত্যেক শিশুর জন্য বিশেষ সুরক্ষা নিশ্চিত করে। শিশু অধিকার কনভেনশনের ৩ নম্বর ধারাও বলে, শিশুর সর্বোত্তম স্বার্থ সবার আগে দেখতে হবে।
তবে এই পথ সহজ নয়। কমিটির মতামত আদালতের রায়ের মতো বাধ্যতামূলক নয়। কমিটি আগে ফেরহাতি ও ফেরহাতি বনাম আলজেরিয়া মামলায় বলেছে, রাষ্ট্র যখন সব তথ্য নিজের কাছে রাখে এবং ঠিকঠাক ব্যাখ্যা দেয় না, তখন অভিযোগকারীর কথার ওজন বেশি হবে। কিন্তু কমিটির প্রমাণ বিচারের যুক্তিকে অনেকে অস্পষ্ট বলেও সমালোচনা করেছেন। তবু এই সিদ্ধান্ত নৈতিক চাপ তৈরি করতে পারে, আর পুশব্যাকের মামলায় প্রমাণের মান কেমন হবে, তার একটি স্পষ্ট দিক দেখাতে পারে।
জবাবদিহির অভাব ও যাঁরা সত্য তুলে ধরেছেন
এই লড়াইয়ের চারপাশের ছবিটাও স্বস্তির নয়। প্রতিবেদনগুলো অনুযায়ী ছয় বছরে গ্রিসে পুশব্যাকের দায়ে কোনো কর্মকর্তার বিচার হয়নি। উল্টো যাঁরা এসব ঘটনা নথিভুক্ত করেছেন, তাঁদের কয়েকজন এখন নিজেরাই বিচারের মুখে। গ্রিক হেলসিঙ্কি মনিটরের প্রতিষ্ঠাতা পানাইওতে দিমিত্রাস এবং এজিয়ান বোট রিপোর্টের প্রতিষ্ঠাতা টমি ওলসেন অভিবাসীদের প্রবেশে সহায়তার অভিযোগে মামলায় আছেন। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এই মামলাকে প্রতিবাদী কণ্ঠ থামানোর রাজনৈতিক চেষ্টা বলে বর্ণনা করেছে। অভিযোগগুলো আদালতে প্রমাণিত হয়নি, তবে প্রশ্নটা সবার সামনে রয়ে গেছে।
বাংলাদেশের জন্য এই ঘটনার শিক্ষা
আমাদের জন্যও এই ঘটনা দূরের গল্প নয়। বাংলাদেশ আইসিসিপিআর, শিশু অধিকার কনভেনশন এবং নির্যাতনবিরোধী কনভেনশনের পক্ষ। বাংলাদেশ ১৯৫১ সালের শরণার্থী কনভেনশনে যুক্ত নয়। তবু নির্যাতনের মুখে কাউকে ফেরত না পাঠানোর নীতিকে অনেক আইনজ্ঞ প্রথাগত আন্তর্জাতিক আইনের অংশ বলে মনে করেন। রোহিঙ্গা সংকট আমাদের শিখিয়েছে, আশ্রয়প্রার্থী মানুষের জীবন কতটা অনিশ্চিত হতে পারে। সংবিধানের ৩১ ও ৩২ অনুচ্ছেদও আইনের আশ্রয় এবং জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতার অধিকার নিশ্চিত করে।
জি আর জে বলেছেন, তিনি ন্যায়বিচার চান, যাতে আর কারও সঙ্গে এমন না হয়। তিনি প্রতিশোধের কথা বলেননি। তিনি শুধু চান, তার কষ্ট সত্য বলে স্বীকৃতি পাক। মানবাধিকার কমিটির সিদ্ধান্ত যা-ই হোক, এই লড়াই একটি প্রশ্ন রেখে যাবে। রাষ্ট্র যদি নিজের কাজের সব চিহ্ন মুছে ফেলতে পারে, তাহলে একজন শিশু কীভাবে প্রমাণ দেবে যে সে সত্যিই কষ্ট পেয়েছে?

