২০২৬ সালের ৬ জুলাই বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক সমুদ্র সংস্থা আইএমওর তিনটি দায় চুক্তিতে যোগদানের দলিল জমা দিয়েছে। চুক্তিগুলো হলো ১৯৯২ সালের সিভিল লায়াবিলিটি কনভেনশনের প্রটোকল, ২০০১ সালের বাঙ্কার্স কনভেনশন এবং ২০০৭ সালের নাইরোবি ধ্বংসাবশেষ অপসারণ কনভেনশন। সরকারি বক্তব্যে বলা হয়েছে, এতে দীর্ঘ মামলা ছাড়াই ক্ষতিপূরণ পাওয়ার পথ খুলবে। খবরটি আশার। তবে আইনের হিসাবে চুক্তিতে যোগ দেওয়া, চুক্তি কার্যকর হওয়া এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের হাতে টাকা পৌঁছানো তিনটি আলাদা ধাপ। এই তিন ধাপের মাঝখানে এখনো কয়েকটি ফাঁক আছে।
যোগদান আর সুরক্ষা এক কথা নয়
আইএমওর রেকর্ড অনুযায়ী বাঙ্কার্স ও নাইরোবি কনভেনশন বাংলাদেশের জন্য ২০২৬ সালের ৬ অক্টোবর থেকে কার্যকর হওয়ার কথা ছিল। তাই এই দুই চুক্তি এখন চালু থাকার কথা। তেলবাহী জাহাজের ক্ষতিপূরণ নিয়ে ১৯৯২ সালের প্রটোকল কার্যকর হবে আরও পরে, ২০২৭ সালের ৬ জুলাই। অর্থাৎ যোগদানের দিনেই কোনো চুক্তি বাংলাদেশে চালু হয়নি। এই সময়ের ফারাক অনেকেই খেয়াল করেন না।
তবে চুক্তি চালু হলেই কাজ শেষ হয় না। ক্ষতিপূরণ পেতে তিনটি শর্ত একসঙ্গে মিলতে হয়। চুক্তি কার্যকর থাকতে হবে। প্রয়োজনে দ্বিতীয় স্তরের তহবিলে দেশের অংশগ্রহণ থাকতে হবে। আর দেশের নিজের আইনে বিমা সনদ, মামলার নিয়ম, আদালত ও দাবি নিষ্পত্তির ব্যবস্থা থাকতে হবে।
তিন চুক্তি, তিন রকম ঝুঁকি
তিনটি চুক্তি একই কাজ করে না। ১৯৯২ সালের সিভিল লায়াবিলিটি কনভেনশন সমুদ্রগামী ট্যাংকারের বহন করা স্থায়ী তেলের দূষণ নিয়ে কাজ করে। এখানে দায় প্রধানত নিবন্ধিত মালিকের ওপর পড়ে। দুই হাজার টনের বেশি তেল বহনকারী জাহাজকে বাধ্যতামূলক বিমা রাখতে হয়।
বাঙ্কার্স কনভেনশন জাহাজ চালানোর জ্বালানি থেকে হওয়া দূষণ ধরে। এক হাজার গ্রস টনের বেশি জাহাজের জন্য এখানে বিমা লাগে। নাইরোবি কনভেনশন বিপজ্জনক ধ্বংসাবশেষ খুঁজে বের করা, চিহ্নিত করা এবং সরানোর দায় ঠিক করে। তিনশ গ্রস টন বা তার বেশি জাহাজের জন্য এখানেও বিমা সনদ লাগে। কোন দুর্ঘটনায় কোন চুক্তি খাটবে, তা তাই প্রতিবার আলাদা করে দেখতে হয়।
বিমা আছে, কিন্তু মামলার পথ কেমন
এই চুক্তিগুলোর বড় শক্তি হলো বিমা। ক্ষতিগ্রস্ত পক্ষ চাইলে সরাসরি বিমা কোম্পানির বিরুদ্ধে দাবি তুলতে পারে। বন্দর কর্তৃপক্ষও সনদ দেখে বুঝতে পারে, জাহাজের পেছনে আর্থিক নিরাপত্তা আছে কি না। কিন্তু সনদ দেওয়া বা চেনার জন্য দেশে একটি নির্দিষ্ট কর্তৃপক্ষ লাগে। দাবি শোনার আদালত এবং রায় কার্যকর করার নিয়মও লাগে।
ফ্রান্সের এরিকা মামলা দেখায়, বিস্তারিত আইনি প্রশ্ন কতটা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। ১৯৯৯ সালে এরিকা ট্যাংকার ডুবে ফ্রান্সের ব্রিটানি উপকূলে তেল ছড়ায়। আপিল আদালত তেল কোম্পানি টোটালকে দেওয়ানি দায় থেকে অব্যাহতি দিয়েছিল। ২০১২ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর ফ্রান্সের সর্বোচ্চ আদালত কুর দ্য কাসাসিঁ সেই অব্যাহতি বাতিল করে। আদালত বলে, চরম অবহেলার প্রমাণ থাকলে টোটালকেও ক্ষতির দায় নিতে হবে। মামলার নম্বর ১০ ৮২.৯৩৮। এই রায়ে বোঝা যায়, শেষ পর্যন্ত আদালতই ঠিক করে কে কতটা দায়ী।
ফান্ড কনভেনশনের বাইরে থাকার ঝুঁকি
বাংলাদেশ এখনো ১৯৯২ সালের ফান্ড কনভেনশনে যোগ দেয়নি। ট্যাংকার দূষণের ক্ষতিপূরণ দুই স্তরে চলে। প্রথম স্তরে জাহাজমালিক ও তাঁর বিমাকারী টাকা দেন। ক্ষতি তার চেয়ে বেশি হলে দ্বিতীয় স্তরে ফান্ড থেকে টাকা আসে। আইওপিসি ফান্ডের হিসাবে প্রথম স্তরের টাকাসহ মোট সর্বোচ্চ সীমা ২০ কোটি ৩০ লাখ এসডিআর। এই অঙ্ক মালিকের টাকার ওপর বাড়তি নয়, তার ভেতরেই ধরা হয়।
ফান্ডের সদস্য হলে খরচও আছে। বছরে দেড় লাখ টনের বেশি তেল আমদানিকারী প্রতিষ্ঠানকে চাঁদা দিতে হয়, সরকারের কোষাগার থেকে সরাসরি নয়। সরকারকে তেল গ্রহণকারীদের হিসাবও জমা দিতে হয়। আইওপিসির সদস্য তালিকায় ভারত, শ্রীলঙ্কা ও মালদ্বীপ দুই কনভেনশনেরই পক্ষ। বাংলাদেশ কেন যোগ দেয়নি, তার স্পষ্ট ব্যাখ্যা প্রকাশ্য তথ্যে পাওয়া যায় না।
স্পেনের প্রেস্টিজ মামলা দেখায়, ফান্ড থাকলেও ক্ষতিপূরণ সীমার মধ্যেই আটকে থাকে। ২০০২ সালে প্রেস্টিজ ট্যাংকার ডুবে স্পেন, ফ্রান্স ও পর্তুগালের উপকূলে তেল ছড়ায়। ২০১৬ সালের জানুয়ারিতে স্পেনের সুপ্রিম কোর্ট ক্যাপ্টেনকে দোষী সাব্যস্ত করে। আদালত বলে, ১৯৯২ সালের ফান্ড কনভেনশন অনুযায়ী ফান্ডও দায়ী। আইওপিসির নথি অনুযায়ী প্রথম স্তরের সীমা ছিল প্রায় ২ কোটি ২৮ লাখ ইউরো, আর দুই স্তর মিলিয়ে সীমা ছিল প্রায় ১৭ কোটি ১৫ লাখ ইউরো। স্পেন সরকার ক্ষতিগ্রস্ত খাতের জন্য আলাদা সহায়তা আইন করেছিল, কারণ আন্তর্জাতিক ক্ষতিপূরণ ক্ষতির বড় অংশ ঢাকতে পারবে না বলে ধারণা ছিল। তাই ফান্ডে যোগ দেওয়া সব সমস্যার সমাধান নয়। কিন্তু ফান্ডের বাইরে থাকলে দ্বিতীয় স্তরের সুরক্ষাই থাকে না।
সুন্দরবনের ঘটনা কী শেখায়
সুন্দরবনের কাছে ওটি সাদার্ন স্টার নামের তেলবাহী নৌযানের দুর্ঘটনায় দেখা গেছে, নিয়ম প্রয়োগের আগে নিয়মের পরিধি বুঝতে হয়। জাতিসংঘ ও বাংলাদেশ সরকারের যৌথ মূল্যায়নে ৩ লাখ ৫৭ হাজার ৬৬৪ লিটার ভারী জ্বালানি তেলের কথা এসেছে। এটি নদীতে ঘটা দুর্ঘটনা ছিল। তাই সিভিল লায়াবিলিটি কনভেনশনের শর্ত, অর্থাৎ সমুদ্রগামী জাহাজের শর্ত, এই ঘটনায় মেলে কি না তা সরকারি নথি থেকে নিশ্চিত হওয়া যায় না।
আইওপিসির পরিচালক জানিয়েছিলেন, এই ঘটনায় ফান্ডের জড়িত হওয়ার সম্ভাবনা কম। দূষণ ভারতের সীমানায় ঢুকলে বিষয়টি ফান্ডের আওতায় আসতে পারত, এটুকুই তাঁর বক্তব্য ছিল। তিনি কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেননি। কয়লা ও ফ্লাই অ্যাশ দুই চুক্তির বাইরে থাকে। আবার সব নদীর নৌযানও চুক্তির সংজ্ঞায় পড়ে না।
বাঙ্কার্স কনভেনশন উপকূলীয় এলাকায় জ্বালানি ছড়ানোর ঘটনায় বেশি কাজে লাগতে পারে। ২০২৪ সালের অক্টোবরে চট্টগ্রামের বহির্নোঙরে এমটি বাংলার সৌরভে আগুন লেগেছিল। নৌবাহিনী জানিয়েছে, তাদের তৎপরতায় অপরিশোধিত তেল কর্ণফুলী নদী ও বঙ্গোপসাগরে ছড়ায়নি। সেটি পূর্ণ দূষণের ঘটনা ছিল না। তবে ট্যাংকার ঝুঁকি যে বাংলাদেশের জন্য বাস্তব, তা এই ঘটনা মনে করিয়ে দেয়।
দেশের আইন কতটা তৈরি
সমুদ্র আইন নিয়ে জাতিসংঘ কনভেনশন ইউএনক্লজের ১৯২ ও ১৯৪ অনুচ্ছেদ রাষ্ট্রকে সমুদ্র পরিবেশ রক্ষা এবং দূষণ ঠেকাতে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেয়। ২৩৫ অনুচ্ছেদ ক্ষতিপূরণের সুযোগ রাখার কথাও বলে। এটি অবশ্য কোনো নির্দিষ্ট দায় চুক্তিতে যোগ দিতে বাধ্য করে না। ২০২৪ সালের ২১ মে আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইন ট্রাইব্যুনাল আইটলস পরামর্শমূলক মতামতে বলেছে, সতর্কতার দায়িত্ব পালন করতে রাষ্ট্রের নিজস্ব ব্যবস্থা লাগে। সেই ব্যবস্থায় আইন, প্রশাসনিক পদ্ধতি এবং প্রয়োগের কাঠামো থাকতে হবে। এটি ৩১ নম্বর মামলার মতামত, যার ২৩৫ অনুচ্ছেদে কথাটি আছে।
বাংলাদেশের সরকারি আইন ডাটাবেসে এখনো ১৯৮৩ সালের মার্চেন্ট শিপিং অধ্যাদেশ আছে। এর ৪৭১ ও ৪৭২ ধারায় জাহাজমালিকের দায়সীমার সাধারণ নিয়ম আছে। কিন্তু অধ্যাদেশটি এই তিন চুক্তির অনেক আগের। ২০০০ সালের অ্যাডমিরালটি আইনে হাইকোর্ট বিভাগকে অ্যাডমিরালটি আদালত করা হয়েছে। তবে আদালত থাকলেই চুক্তির সব অধিকার ও পদ্ধতি তৈরি হয়ে যায় না।
একজন ক্ষতিগ্রস্ত দাবিদারের জানা দরকার, কোন আদালতে যাবেন, বিমা কোম্পানি কী কী আপত্তি তুলতে পারবে, নোটিশ কীভাবে যাবে এবং দায়সীমার তহবিল কীভাবে হবে। বিদেশি সনদ ও রায়ের স্বীকৃতি কীভাবে মিলবে, তাও জানা দরকার। এসব নিয়ম লিখিত না থাকলে চুক্তির অধিকার কাগজেই থেকে যায়। আইএমওও বলেছে, চুক্তিগুলো দেশে দেশে একইভাবে প্রয়োগ হওয়া জরুরি।
জেলে ও ছোট ব্যবসায়ীর হাতে টাকা পৌঁছাবে কীভাবে
আইনের ভাষা থাকলেই ক্ষতিপূরণ চলে আসে না। দাবি বুঝে নেওয়ার জন্য একটি কার্যকর ব্যবস্থা লাগে। আইওপিসি সদস্য দেশগুলোকে আগে থেকে প্রস্তুতির পরামর্শ দেয়। বিমাকারী ও ফান্ডের সঙ্গে সমন্বয়, ক্ষতিগ্রস্ত সম্প্রদায়ের সঙ্গে যোগাযোগ এবং দ্রুত দাবি নিষ্পত্তির পদ্ধতি এর মধ্যে পড়ে।
এই প্রস্তুতি না থাকলে সবচেয়ে বিপদে পড়েন জেলে আর ছোট উপকূলীয় ব্যবসায়ীরা। ক্ষতির অধিকার তাঁদের থাকে, কিন্তু প্রমাণ করার মতো কাগজ বা হিসাবের পদ্ধতি থাকে না। সাদার্ন স্টারের পর যৌথ মূল্যায়নেও দুর্বল নৌযান ব্যবস্থাপনা, খুব কম তেল দূষণ প্রস্তুতি এবং সংস্থাগুলোর অস্পষ্ট দায়িত্বের কথা এসেছে। একটি দাবি নিষ্পত্তির কর্মসূচি এবং দক্ষ কর্মীর প্রয়োজনের কথাও ওঠে।
দায়সীমা নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটেনি
নাইরোবি কনভেনশনের ৩(২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী বাংলাদেশ চুক্তির এলাকা তার ভূখণ্ড ও আঞ্চলিক সমুদ্র পর্যন্ত বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে। এটি একটি সঠিক ও ইতিবাচক সিদ্ধান্ত। কিন্তু সীমার প্রশ্ন এখনো খোলা আছে। বাঙ্কার্স ও নাইরোবি দুই চুক্তিতেই ১৯৭৬ সালের সামুদ্রিক দাবির দায়সীমা কনভেনশন বা এলএলএমসির অধীনে দায় সীমিত করার অধিকার রাখা হয়েছে।
আইএমওর ২০২৬ সালের আগস্টের তালিকায় বাংলাদেশ এলএলএমসি বা এর ১৯৯৬ সালের প্রটোকলের পক্ষ হিসেবে নেই। তাই দেশের নিজস্ব সীমা কত এবং বিমা সনদে কোন অঙ্ক বসবে, তা আইনে স্পষ্ট করতে হবে। ১৯৮৩ সালের অধ্যাদেশের সীমা টাকায়, আর আন্তর্জাতিক সীমা এসডিআরে। অঙ্ক অস্পষ্ট হলে সনদ থাকবে, কিন্তু দাবিদার ও বিমাকারী কেউ নিশ্চিত হবেন না।
এখন দরকার
আইনের কাঠামো থেকেই করণীয়গুলো বোঝা যায়। প্রথমে প্রতিটি চুক্তির জন্য আলাদা আইন ও বিধি দরকার। সেখানে সনদ, সরাসরি মামলা, আদালতের এখতিয়ার, দায়সীমার তহবিল, রায়ের স্বীকৃতি এবং সময়সীমা পরিষ্কার থাকতে হবে।
দ্বিতীয়ত, ফান্ড কনভেনশনে যোগের বিষয়টি খরচ ও দায়িত্বসহ যাচাই করতে হবে। তেল আমদানিকারীদের তথ্য জমা ও চাঁদার কাঠামোও ভাবতে হবে। তৃতীয়ত, আধুনিক আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে মিল রেখে দায়সীমার নিয়ম ঠিক করতে হবে। চতুর্থত, ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ ও সরকারি সংস্থার জন্য দাবি জানানোর একটি সহজ পদ্ধতি চালু করতে হবে।
বাংলাদেশ সঠিকভাবেই চুক্তির পথে এগিয়েছে, এ কথা সত্য। কিন্তু একটি দেশের সুরক্ষা মাপতে হয় অন্য জায়গায়। দুর্ঘটনার পর একজন ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ কত দ্রুত ও কত সহজে ক্ষতিপূরণ পাচ্ছেন, সেটাই আসল মাপকাঠি। ফান্ডের স্তর, দেশীয় আইন, দায়সীমা ও দাবি নিষ্পত্তির ব্যবস্থা তৈরি না হওয়া পর্যন্ত চুক্তি শুধু দায়িত্বের তালিকা হয়ে থাকবে। ক্ষতিপূরণের নিশ্চয়তা তখনো আসবে না।

