মিয়ানমারের রাখাইনে আরাকান আর্মি এখন কার্যত শাসক শক্তি। রোহিঙ্গাদের ওপর তাদের কর, চলাচলের অনুমতি, জোর করে শ্রম এবং জমি দখলের ধরন আন্তর্জাতিক আইনের কঠিন প্রশ্ন তুলেছে। এই গবেষণা প্রতিবেদনে দেখা হয়েছে, রোম সংবিধি অনুযায়ী এসব কাজ মানবতাবিরোধী অপরাধ হয় কি না এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে কীভাবে এ বিষয়ে এগোতে পারে।
প্রেক্ষাপট: কেন এই প্রশ্ন এখন গুরুত্বপূর্ণ
২০২৪ সালে আরাকান আর্মি উত্তর রাখাইনের বুথিডং ও মংডু টাউনশিপ দখলে নেয়। এই দুটি এলাকায় রোহিঙ্গারা সংখ্যাগরিষ্ঠ। দখলের পর থেকে সেখানে অনুমতিপত্র, কর, গ্রামভিত্তিক শ্রমের কোটা এবং জমি জব্দের এক পূর্ণ ব্যবস্থা চালু হয়েছে বলে অভিযোগ আছে।
২১ অক্টোবর ২০২৬ প্রকাশিত একটি আন্তর্জাতিক আইন বিশ্লেষণের দ্বিতীয় অংশে এই ব্যবস্থার আইনি দিক নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। প্রথম অংশে দেখানো হয়েছিল, আরাকান আর্মি রোম সংবিধির ৭ অনুচ্ছেদের অর্থে একটি “সংগঠন”। দ্বিতীয় অংশে প্রশ্ন তোলা হয়েছে, সংগঠনটির কি বেসামরিক মানুষের ওপর হামলার নীতি আছে। আমাদের এই প্রতিবেদন সেই তথ্য ধরে আরও আইনি বিশ্লেষণ যোগ করেছে।
মানবতাবিরোধী অপরাধ কী এবং কীভাবে প্রমাণ হয়
রোম সংবিধির ৭ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, বেসামরিক জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ব্যাপক বা পদ্ধতিগত হামলার অংশ হিসেবে কিছু কাজ করলে তা মানবতাবিরোধী অপরাধ হয়। হত্যা, নির্বাসন, জোর করে স্থানান্তর এবং নিপীড়ন এর মধ্যে পড়ে। যুদ্ধ চলুক বা না চলুক, এই অপরাধ প্রযোজ্য।
৭(২)(ক) অনুচ্ছেদে বলা আছে, হামলা হতে হবে কোনো রাষ্ট্র বা সংগঠনের নীতির অংশ হিসেবে। এই নীতির শর্তটিই সবচেয়ে কঠিন। কারণ কোনো সংগঠন সাধারণত ঘোষণা দিয়ে বলে না যে তারা বেসামরিক মানুষকে আক্রমণ করবে। তাই আদালত কাজ দেখেই নীতি অনুমান করে।
নীতির শর্ত: আদালতের পুরনো রায় কী বলে
গবাগবো মামলায় অভিযোগ প্রমাণে ব্যর্থতার কারণে মামলাটি “নো কেস টু আনসার” পর্যায়ে ভেঙে পড়ে। প্রসিকিউশন তখন নীতির অস্তিত্ব প্রমাণ করতে পারেনি। অথচ আসামির হাতে একটি রাষ্ট্রের ক্ষমতা ছিল। এই মামলা দেখায়, নীতির প্রমাণ কতটা কঠিন হতে পারে।
সাইদ মামলায় আদালত বলেছে, কোনো সংগঠন পদ্ধতিগত হামলা চালালে সাধারণভাবে নীতির শর্ত পূরণ হয়। আল হাসান মামলায় আদালত আরও বলেছে, নীতি আগে থেকে ঠিক থাকতে হবে না। অপরাধীরা কাজ করতে করতেও নীতি তৈরি হতে পারে। বিচারকরা দেখেন কয়েকটি বিষয়। সহিংসতার পুনরাবৃত্ত ধরন, সংগঠনের নিজস্ব সম্পদ ও কাঠামোর ব্যবহার এবং এর পেছনের উদ্দেশ্য।
আরাকান আর্মির ক্ষেত্রে পুনরাবৃত্ত ধরন
বুথিডং ও মংডুতে ঘটনার ধরন এক নয়, কিন্তু ছক একই। বুথিডংয়ে উচ্ছেদ হওয়া রোহিঙ্গাদের বড় অংশকে ফিরতে দেওয়া হচ্ছে না। অথচ রোহিঙ্গাদের জোর করা শ্রমে তাদেরই জমিতে অ-রোহিঙ্গা বসতিস্থাপনকারীদের জন্য নতুন গ্রাম তৈরি হচ্ছে। মংডুতে রোহিঙ্গাদের ১১টি পুরনো গ্রামে সরাসরি বসতিস্থাপনকারীদের এনে বসানো হয়েছে।
কর ও চাঁদাবাজি আরও ছড়িয়েছে। মরাউক ইউ, কিয়াউকতাও, পাউকতাও ও মিনব্যা পর্যন্ত এর প্রভাব পৌঁছেছে। আরাকান আর্মি নিজের সম্পদ ব্যবহার করে এই কাজ টিকিয়ে রেখেছে, যেমন রোহিঙ্গাদের কাছ থেকে নেওয়া কৃষিজমি তারা বসতিস্থাপনকারীদের দিচ্ছে। নিজের কাঠামো দিয়েই তারা গ্রামে গ্রামে শ্রম আদায় করছে। এই দুটি বিষয় বিচারকদের দেখা শর্তের সঙ্গে মিলে যায়।
উদ্দেশ্যের প্রমাণ: জাতিসংঘের প্রতিবেদন কী বলছে
জাতিসংঘের মানবাধিকার হাইকমিশনারের দপ্তর বলেছে, আরাকান আর্মির নির্যাতন হয়তো রোহিঙ্গাদের আরও উচ্ছেদ করে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার উদ্দেশ্য থেকে আসছে। হাইকমিশনারের সেপ্টেম্বরের প্রতিবেদনে আরও গুরুতর তথ্য আছে। সেখানে বলা হয়েছে, আরাকান আর্মির কর্মকর্তারা গ্রামের সভায় সরাসরি বলেছেন, যে পরিবার কর দিতে বা নিয়োগের কোটা পূরণ করতে পারবে না, তাদের রাখাইন ছাড়তে হবে।
এই ধরনের মৌখিক বার্তা আইনি দিক থেকে খুব মূল্যবান। কারণ এখানে সংগঠনের কর্মকর্তাদের নিজের মুখেই উদ্দেশ্য প্রকাশ পেয়েছে। নীতির শর্ত প্রমাণে আদালত সাধারণত এমন সাক্ষ্যই খোঁজে।
নিরাপত্তার যুক্তি, “বিচ্ছিন্ন ইউনিট” তত্ত্ব ও সমান আচরণের দাবি
আরাকান আর্মির নিরাপত্তা উদ্বেগ পুরোপুরি বানানো নয়। ২০২৪ সালে কিছু রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠী জান্তার সঙ্গে জোট বেঁধেছিল। সেনাবাহিনী হাজার হাজার রোহিঙ্গা পুরুষকে জোর করে বা প্ররোচনায় মিলিশিয়ায় নিয়েছিল। তবে সাইদ মামলায় আদালত মেনেছে, সেলেকা বাহিনী অস্ত্র খুঁজতে অভিযান চালিয়েছিল। এরপরও আদালত সেই অভিযানকে বৈধ বলেনি। কারণ অভিযানের ধরন, লক্ষ্য জনগোষ্ঠী এবং অপরাধের ছক বিবেচনায় তা বৈধ ছিল না।
একটি উপগ্রহ সমীক্ষা বলছে, ২০২৪ সালের এপ্রিল ও মে মাসে প্রায় ২,৪০০ কাঠামো পুড়েছে জান্তা ও তাদের রোহিঙ্গা সহযোগীদের হাতে। প্রতিশোধ হিসেবে আরাকান আর্মি পুড়িয়েছে আরও প্রায় ৮,৫০০টি। নিরাপত্তা উদ্বেগ এই মাত্রার ধ্বংস ব্যাখ্যা করে না। শুধু রোহিঙ্গাদের ওপর কর বা রাখাইন পরিবারের জন্য জোর করা শ্রমে বসতি তৈরিও ব্যাখ্যা করে না।
“বিচ্ছিন্ন ইউনিট” যুক্তিও টেকে না। দুই বছর ধরে গ্রাম প্রশাসনের মাধ্যমে নিখুঁতভাবে চালানো ব্যবস্থা কোনোভাবেই বিচ্ছিন্ন আচরণ নয়। আরাকান আর্মি দাবি করে, তারা সবার জন্য শাসন করে। তাদের সমর্থক একটি সংবাদমাধ্যম বলেছে, দলে মুসলমানরাও আছেন এবং ৫,০০০ এর বেশি মুসলিম কর্মচারীর খবর আছে। কিন্তু হাইকমিশনার বলেছেন, আরাকান আর্মির ঘোষিত অন্তর্ভুক্তিমূলক শাসননীতির বিপরীতে নির্যাতন চলছে।
সমান আচরণের দাবিও আইনে প্রতিরক্ষা নয়। আল হাসান মামলায় তিম্বুকতুর জঙ্গি নিয়ন্ত্রিত ইসলামি আদালত সব আসামির সঙ্গে সমান আচরণ করেছিল। তবু আদালত বলেছে, এ ধরনের প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে দমন ছিল পুরো প্রকল্পের অন্তর্নিহিত ও স্পষ্ট অংশ। তাই তা সংগঠনের নীতির প্রমাণ।
কেন নিপীড়ন অপরাধটি সবচেয়ে মানানসই
২০২২ সালের শেষে কক্সবাজারে ৪০০ এর বেশি রোহিঙ্গা বেঁচে যাওয়া মানুষকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, তাদের কাছে ন্যায়বিচারের মানে কী। ৮৬ শতাংশ নিজে থেকে বলেছেন, নাগরিকত্ব। গবেষকরা সিদ্ধান্ত টেনেছেন, মিয়ানমারে নাগরিকত্ব এমন এক ন্যায়বিচার, যা কোনো আন্তর্জাতিক আদালত দিতে পারে না।
আদালত নাগরিকত্ব দিতে পারে না। কিন্তু উত্তর রাখাইনের রোহিঙ্গাদের ওপর যে কর্তৃপক্ষ এখন শাসন চালাচ্ছে, তার আচরণ বিচার করতে পারে। ৭ অনুচ্ছেদের তালিকা ধরলে আরাকান আর্মির কাজ সবচেয়ে বেশি মেলে ৭(১)(জ) ধারার নিপীড়নের সঙ্গে। এই অপরাধে তিনটি উপাদান লাগে। মৌলিক অধিকার গুরুতরভাবে কেড়ে নেওয়া, শিকারদের পরিচয়ের কারণে তা করা এবং তালিকাভুক্ত আরেকটি কাজের সঙ্গে সংযোগ থাকা। এখানে সেই কাজটি নির্বাসন ও জোর করে স্থানান্তর।
নির্বাসনের অভিযোগ আলাদাভাবেও আনা যেত। তবু নিপীড়ন বেশি মানানসই। কারণ যেসব পদক্ষেপ এককভাবে অপরাধ নয়, সেগুলোও এর আওতায় আসে। আল হাসান মামলায় আদালত বলেছে, বৈষম্যমূলক আদেশ, নীতি বা বিধি যদি মৌলিক অধিকার লঙ্ঘন করে এবং যথেষ্ট গুরুতর হয়, তা নিপীড়ন। তিম্বুকতুতে জঙ্গিরা দৈনন্দিন জীবনে যেসব বিধি চাপিয়েছিল, আদালত সেগুলোকেই নিপীড়ন বলেছে।
পরিচয়ের শর্ত ও “সবাই কষ্ট পাচ্ছে” যুক্তি
হাইকমিশনারের প্রতিবেদন স্পষ্ট। সেখানে বলা হয়েছে, কিছু পদক্ষেপ শুধুমাত্র রোহিঙ্গাদের লক্ষ্য করে নেওয়া হয়েছে। আরাকান আর্মির এলাকার সাধারণ বাসিন্দাদের রাখাইন ছাড়তে কয়েকটি সুপারিশপত্র লাগে। রোহিঙ্গাদের পাশের গ্রামে যেতেও টাকা দিয়ে অনুমতি কিনতে হয়। জমি জব্দ, মসজিদ ভাঙা এবং গ্রামের নাম বদলের খবর এর চেয়েও এগিয়ে যায়। নাম বদল হলে মানচিত্র থেকে রোহিঙ্গা নাম মুছে যাবে।
মানুষের ক্ষেত্রেও একই চিত্র। হাইকমিশনার বলেছেন, আরাকান আর্মি সেনাবাহিনীর নীতির প্রতিচ্ছায়া হয়ে রোহিঙ্গা পরিচয় অস্বীকার করছে। তারা রোহিঙ্গাদের “বাঙালি” বলে ডাকে। ২০১৯ সালে আইসিসির বিচারকরাও মেনেছেন, এই গোষ্ঠী জাতিগত ও ধর্মীয় কারণে লক্ষ্যবস্তু হয়েছে।
আরাকান আর্মি কিছু মুসলমানকে কাজে রাখে বলে এই শর্ত ভাঙে না। আল হাসান মামলায় আদালত বলেছে, কোনো ধর্মের সবার ওপর নির্যাতন হতে হবে, আইনে এমন শর্ত নেই। হিন্দু ও মরো গ্রামবাসীকেও জোর করে শ্রমে লাগানো হয়েছে। আরাকান আর্মি কখনো এই চর্চা স্বীকার করলে হয়তো এটাকে নির্বিচার নির্যাতনের প্রমাণ হিসেবে দেখাবে। কিন্তু নিপীড়নে শুধু একটি গোষ্ঠীর কষ্ট পাওয়া জরুরি নয়। জোর করা শ্রম অনেকের ওপর পড়লেও মনগড়া কর ও গ্রামে গ্রামে অনুমতিপত্রের বোঝা শুধু রোহিঙ্গাদের ওপর। রোহিঙ্গাদের জমি অন্যদের হাতে যাচ্ছে, যার মধ্যে মরো ও খুমি বসতিস্থাপনকারীও আছেন।
এভাবে রোহিঙ্গারা নিজেদের পরিচয়ের কারণেই চলাফেরা, জমির মালিকানা, ধর্মপালন, উপার্জন এবং নিজের শ্রমের ওপর অধিকার হারাচ্ছে। একটি পদক্ষেপ আলাদা করে দেখলে কষ্টের মতো লাগতে পারে। কিন্তু একটি গোষ্ঠীর ওপর সব একসঙ্গে পড়লে তা মৌলিক অধিকারের গুরুতর লঙ্ঘন হয়ে দাঁড়ায়।
আন্তর্জাতিক আইনের অন্যান্য দিক
নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার বিষয়ক আন্তর্জাতিক চুক্তি আইসিসিপিআরের ১২ অনুচ্ছেদে চলাচলের স্বাধীনতার কথা আছে। ২৭ অনুচ্ছেদ সংখ্যালঘুদের নিজস্ব ধর্ম ও সংস্কৃতি পালনের অধিকার দেয়। আরাকান আর্মির পাশে এই রাষ্ট্রীয় চুক্তির সরাসরি দায় না থাকলেও, কার্যত শাসনক্ষমতা হাতে থাকলে মানবাধিকারের এই মানদণ্ড তাদের ওপর প্রযোজ্য বলে আন্তর্জাতিক আইনে মত আছে।
জোর করে শ্রমের বিষয়ে আইএলও জোরপূর্বক শ্রম কনভেনশন, ১৯৩০ (নম্বর ২৯) গুরুত্বপূর্ণ। মিয়ানমার এই কনভেনশনে স্বাক্ষরকারী রাষ্ট্র। যুদ্ধ আইনের ক্ষেত্রে জেনেভা কনভেনশনের কমন আর্টিকেল ৩ এবং রীতিগত মানবিক আইন সশস্ত্র গোষ্ঠীর ওপরও বাধ্যবাধকতা আনে। এর মধ্যে বেসামরিক মানুষের সঙ্গে মানবিক আচরণ এবং জোর করে স্থানান্তরের নিষেধাজ্ঞা আছে।
গণহত্যা প্রতিরোধ কনভেনশনের বিষয়ও আছে। গাম্বিয়া বনাম মিয়ানমার মামলায় আন্তর্জাতিক বিচার আদালত আইসিজের রায় অপেক্ষমাণ। তবে আইসিজি রাষ্ট্রের দায় বিচার করে, ব্যক্তি বা সশস্ত্র গোষ্ঠীর নয়। তাই আরাকান আর্মিকে সরাসরি এই আদালতে আনা যাবে না। এই রায় যে রাষ্ট্রকে বাধ্য করবে, সেই মিয়ানমার এখন উত্তর রাখাইন নিয়ন্ত্রণ করে না। অথচ ২০১৭ সালের অভিযান ওই এলাকাতেই হয়েছিল। নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবর্তনও সেখানেই হতে হবে।
আইসিসির এখতিয়ারের সীমা ও বাংলাদেশের ভূমিকা
মিয়ানমার রোম সংবিধির সদস্য নয়। আদালত বিরোধী জাতীয় ঐক্য সরকারের ২০২১ সালের এখতিয়ার গ্রহণের ঘোষণার ওপর কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। এখানেই বাংলাদেশের ভূমিকা সামনে আসে। বাংলাদেশ ২০১০ সালে রোম সংবিধি অনুমোদন করেছে এবং সদস্য রাষ্ট্র। ২০১৮ সালে আইসিসির বিচারকরা রায় দিয়েছেন, যে নির্বাসন অসদস্য রাষ্ট্রে শুরু হয়ে সদস্য রাষ্ট্রে শেষ হয়, তা আদালতের এখতিয়ারের মধ্যে পড়ে। একই যুক্তি নিপীড়নের মতো অন্য অপরাধেও খাটতে পারে, যার একটি উপাদান সদস্য রাষ্ট্রের মাটিতে ঘটে।
প্রসিকিউটর মিন অং হ্লাইংয়ের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা চেয়ে যে আবেদন করেছেন, তাতেও এই যুক্তি আছে। তাতে মিয়ানমারে এবং আংশিকভাবে বাংলাদেশে নিপীড়ন চালানোর অভিযোগ আনা হয়েছে। বিচারকরা এ বিষয়ে এখনো প্রকাশ্যে সিদ্ধান্ত দেননি।
যুদ্ধাপরাধের ক্ষেত্রে এই পথ বন্ধ। কারণ যুদ্ধাপরাধের কোনো উপাদান বাংলাদেশের মাটিতে ঘটে না। নাসাওর পাড়া শিবিরে বেঁচে যাওয়া মানুষকে সরানোর আদেশ, যা ৮(২)(ঙ)(৮) ধারায় বাস্তুচ্যুতির আদেশ হিসেবে অভিযোগ করা যেত, মিয়ানমারের ভেতরেই সম্পূর্ণ অপরাধ হয়ে গেছে। রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে পাঠানোর আদেশও সীমান্ত পার হওয়ার আগেই সম্পূর্ণ অপরাধ।
এই কারণে আইসিসির এখতিয়ারে একটি জবাবদিহির ফাঁক থেকে যাচ্ছে। এশিয়া প্যাসিফিক সিম্পোজিয়ামে একজন বিশেষজ্ঞ বলেছেন, আরাকান আর্মির মতো অরাষ্ট্রীয় সশস্ত্র গোষ্ঠীর অপরাধে জবাবদিহির ফাঁক রয়ে গেছে। ফাঁকটি বাস্তব। তবে আদালত তার একটি অংশ পার হওয়ার পথ ইতিমধ্যে পেয়েছে।
নির্বাসনের নতুন তথ্য: বাংলাদেশে নতুন ঢল
মিয়ানমারের জন্য স্বাধীন তদন্ত প্রক্রিয়া বলেছে, আরাকান আর্মির আচরণে বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের নতুন ঢল তৈরি হয়েছে। হাইকমিশনারের হিসাবে, ২০২৪ সালের শুরু থেকে প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে নতুন করে নিবন্ধিত হয়েছে। এর পেছনে আরাকান আর্মির হুমকি ও জোর করে নিয়োগ আংশিকভাবে দায়ী।
নির্বাসনে বন্দুক তাক করতে হবে, এমন নয়। অপরাধের উপাদান নির্দেশিকা বলে, জবরদস্তিমূলক পরিবেশের সুযোগ নিয়েও মানুষকে জোর করে নির্বাসিত করা যায়। আরাকান আর্মি ঠিক এমন পরিবেশ তৈরি করেছে। রোহিঙ্গাদের কাছ থেকে সীমান্ত পার হতে কয়েকশ ডলার নেওয়া হলেও সেই যাত্রা স্বেচ্ছায় হয়ে যায় না। এসব নির্বাসন আরাকান আর্মির চৌকির মধ্য দিয়ে গিয়ে বাংলাদেশে শেষ হয়। ২০১৮ সালের যুক্তি অনুযায়ী, এগুলো আইসিসির এখতিয়ারেই আসে। নিপীড়নও একই এখতিয়ারের সুবিধা পেতে পারে, যা মানুষকে তাড়িয়ে দেওয়া সন্ত্রাস ও লালফিতার কাছে পর্যন্ত ফিরে যায়।
চলমান তদন্তে আরাকান আর্মির জায়গা আছে কি
২০১৯ সালে তদন্তের অনুমতি দেওয়ার সময় বিচারকরা বলেছিলেন, প্রসিকিউটর আবেদনে উল্লেখ করা ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ নন। পরবর্তী অপরাধও তদন্তের আওতায় আসে, যদি তা পরিস্থিতির সঙ্গে যথেষ্ট সংযুক্ত হয়। আরাকান আর্মির চাপে আবার বাংলাদেশে ঢুকে পড়া রোহিঙ্গারা এই শর্ত পূরণ করবে বলে মনে হয়। ২০১৭ সালে খালি হওয়া গ্রামে আরাকান আর্মির বসতি স্থাপনও একই শর্তে পড়ে। কারণ এতে ২০১৭ সালের বিতাড়িতদের ফেরা আটকে থাকে। ২০১৮ সালের রায়ে ইঙ্গিত আছে, ফেরা আটকানোও আংশিকভাবে বাংলাদেশে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধ হতে পারে।
২০১৯ সালে আরাকান আর্মি উত্তর রাখাইন শাসন করত না। এখন করে। আইসিসির প্রসিকিউটরের দপ্তর প্রকাশ্যে বলেনি, তদন্ত এই গোষ্ঠী পর্যন্ত যায় কি না। ২০২৭ সালের প্রস্তাবিত বাজেটে দপ্তর বলেছে, বাংলাদেশের ভূখণ্ডে ঘটা অপরাধ নিয়ে তদন্ত পর্যায় শেষ হওয়ার পথে। আরাকান আর্মির নির্বাসন এই বর্ণনার মধ্যে মানায়। ফোর্টিফাই রাইটস ২০২৫ সালের জুলাই ও ২০২৬ সালের এপ্রিলে দপ্তরকে অনুরোধ করেছে, যেন গোষ্ঠীটির অপরাধ তদন্তের আওতায় আনা হয়। তদন্ত পর্যায় বন্ধ হওয়ার আগে দপ্তরের তা করা উচিত। না করলে অন্তত কারণ ব্যাখ্যা করা উচিত।
ব্যক্তির দায় ও বিচারের বিকল্প পথ
রোম সংবিধি রাষ্ট্র বা সংগঠনের নয়, ব্যক্তির বিচার করে। ২৫ অনুচ্ছেদে আদেশ দেওয়া, প্ররোচনা দেওয়া ও সহায়তার দায় আছে। ২৮ অনুচ্ছেদে কমান্ডারের দায় আছে, যা অধীনস্থদের অপরাধ আটকাতে ব্যর্থ নেতাদের ওপর পড়ে। ২৭ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, সরকারি পদ বা নেতৃত্বের অবস্থান দায় থেকে মুক্তি দেয় না। ফলে আরাকান আর্মির নেতারা শাসক হিসেবে নিজেদের দাবি করলেও কর্মকাণ্ডের দায় এড়াতে পারবেন না।
আইসিসির বাইরেও পথ আছে। আর্জেন্টিনার আদালত সার্বজনীন এখতিয়ারের ভিত্তিতে মিয়ানমারের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে মামলা চালিয়েছে। বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইন, ১৯৭৩ মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের জন্য তৈরি হলেও তা মূলত দেশের ভেতরের ঘটনার জন্য। তাই সীমান্তের ওপারের অপরাধে এর প্রয়োগ নিয়ে আইনি প্রশ্ন আছে।
বাংলাদেশের জন্য কূটনৈতিক ও আইনি বার্তা
আরাকান আর্মি নিজেকে রাখাইনের সরকার হিসেবে স্বীকৃতি পেতে চায়। তাদের দাবির ভিত্তি দাঁড়িয়েছে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে চালানো প্রশাসনের শক্তির ওপর, যা বেশ বিদ্রূপাত্মক। বাংলাদেশ ও রাখাইনে প্রবেশের চেষ্টায় থাকা জাতিসংঘের সংস্থাগুলোর ব্যবহারিক কারণে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে হতে পারে। তবে আলোচনা যাই হোক, সরকারের ক্ষমতা ব্যবহার করলে সেই নামে করা কাজের জবাবও দিতে হয়। আরাকান আর্মি এক দিনের অনুমতিপত্রেও নিজের নাম সই করেছে, যা রোহিঙ্গাদের পাশের গ্রামে যেতে কিনতে হয়।
গবেষণার মূল পাওয়া তথ্য
প্রথমত, আরাকান আর্মির কর, অনুমতিপত্র, শ্রম ও জমি জব্দের ছক দীর্ঘদিন ধরে চলছে এবং সংগঠিত। এটি নীতির শর্ত পূরণের পক্ষে জোরালো প্রমাণ। দ্বিতীয়ত, জাতিসংঘের প্রতিবেদনে কর্মকর্তাদের মৌখিক হুমকি উদ্দেশ্য প্রমাণে সহায়ক। তৃতীয়ত, নিপীড়ন অপরাধটি এই আচরণের সঙ্গে সবচেয়ে বেশি মেলে।
চতুর্থত, নিরাপত্তার যুক্তি, বিচ্ছিন্ন ইউনিট তত্ত্ব এবং সমান আচরণের দাবি আদালতের আগের রায়ের আলোকে দুর্বল। পঞ্চমত, আইসিসির এখতিয়ার মূলত বাংলাদেশের মাটির সঙ্গে সংযোগের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। তাই নির্বাসন ও তার সঙ্গে জড়িত নিপীড়ন আইসিসির আওতায় আসতে পারে। ষষ্ঠত, যুদ্ধাপরাধের ক্ষেত্রে এই পথ বন্ধ, তাই একটি জবাবদিহির ফাঁক রয়ে গেছে। সপ্তমত, প্রসিকিউটরের দপ্তরের উচিত তদন্ত শেষ করার আগে আরাকান আর্মিকে এর আওতায় আনা বা না আনার কারণ জানানো।
রোহিঙ্গাদের ন্যায়বিচারের দাবি এখন আর শুধু মিয়ানমার সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে সীমাবদ্ধ নেই। উত্তর রাখাইনে নতুন শাসক শক্তিও এখন আইনের কাঠগড়ার কাছে এসে দাঁড়িয়েছে। আইনের ভাষায় তাদের কাজ নিপীড়ন ও নির্বাসনের অভিযোগ টানে। বাংলাদেশ সদস্য রাষ্ট্র এবং সবচেয়ে বড় আশ্রয়দাতা হিসেবে এই আইনি পথে কেন্দ্রীয় ভূমিকায় আছে। আদালত এই সুযোগ কাজে লাগাবে কি না, তা এখন প্রসিকিউটরের দপ্তরের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে।

