২০১৫ সালের পহেলা বৈশাখে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি এলাকায় নববর্ষ উদ্যাপন চলাকালে নারীদের ওপর সংঘটিত শ্লীলতাহানির ঘটনায় দেশজুড়ে নিন্দা ও ক্ষোভের ঝড় ওঠে। সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া, জনমনে আতঙ্ক এবং পুলিশের প্রতি অভিযোগের মুখে ঘটনাটিকে কেন্দ্র করে তদন্ত ও বিচার কার্যক্রম শুরু হয়। সেই সময় শাহবাগ থানার উপ-পরিদর্শক আবুল কালাম আজাদ বাদী হয়ে নারী লাঞ্ছনার অভিযোগে মামলা দায়ের করেন।
ঘটনার ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণ করে আটজন লাঞ্ছনাকারীকে চিহ্নিত করা হয়। তাদের ধরিয়ে দিতে এক লাখ টাকা করে পুরস্কার ঘোষণা করেছিলেন তৎকালীন আইজিপি এ কে এম শহীদুল হক। এরপরও ২০১৫ সালের ডিসেম্বর মাসে তদন্ত কর্মকর্তা ডিবি পুলিশের উপ-পরিদর্শক দীপক কুমার দাস চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেন, যেখানে কোনো আসামিকে শনাক্ত করতে না পারার কথা বলা হয়। তবে ওই প্রতিবেদন গ্রহণ না করে মামলাটি পুনরায় তদন্তের নির্দেশ দেন ঢাকার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-৩ এর বিচারক জয়শ্রী সমাদ্দার এবং দায়িত্ব দেওয়া হয় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনকে (পিবিআই)।
পিবিআই তদন্ত চালানোর সময় ২০১৬ সালের ২৯ জানুয়ারি রাজধানীর চকবাজারের খাজির দেওয়ান এলাকা থেকে গ্রেফতার করা হয় কামাল (৩৫) নামের একজনকে, যিনি ওই এলাকায় পরিবারসহ বসবাস করতেন এবং পেশায় কাঁচামাল ব্যবসায়ী ছিলেন। কামালকে গ্রেফতারের পর দুইদিনের রিমান্ডে নেওয়া হয় এবং পরে কারাগারে পাঠানো হয়। ছয় মাস কারাবাসের পর তিনি জামিনে মুক্তি পান এবং মামলার বিচার চলাকালীন তিনি ধীরে ধীরে গুরুতর স্বাস্থ্য জটিলতায় পড়েন। আইনজীবী ও সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, কামাল ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ছিলেন এবং এক পর্যায়ে তার দুই চোখের দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে যায়। পায়ে পচন ধরার কারণে এক পা সম্পূর্ণ অকেজো হয়ে পড়ে।
২০১৬ সালের ৯ ডিসেম্বর পিবিআই তদন্ত শেষে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেয়। যেখানে বলা হয়, আটজন লাঞ্ছনাকারীর মধ্যে শুধু কামালকে শনাক্ত করা গেছে বাকি সাতজনকে শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। তাদের পাওয়া গেলে সম্পূরক অভিযোগপত্র দেওয়া হবে বলে উল্লেখ করা হয়। মামলায় মোট ৩৪ জন সাক্ষী রাখা হলেও সাক্ষ্যগ্রহণ প্রক্রিয়া বারবার পিছিয়ে যায়। অভিযোগ গঠনের প্রায় সাত বছর পরও মাত্র ৯ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ সম্ভব হয়। অনেক সাক্ষীর বিরুদ্ধে জামিন অযোগ্য গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেও আদালতে হাজির করানো যায়নি। রাষ্ট্রপক্ষ সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ ঘোষণা করলে যুক্তি উপস্থাপন শেষে আদালত ২০২৪ সালের ৩১ জানুয়ারি রায়ের দিন ধার্য করে। তবে রায় প্রস্তুত না হওয়ায় দিন পিছিয়ে ১৩ ফেব্রুয়ারি নির্ধারণ করা হয়। সে দিন রাষ্ট্রপক্ষ থেকে মামলাটি রায় ঘোষণার তালিকা থেকে সরিয়ে পুনরায় সাক্ষ্যগ্রহণের আবেদন জানানো হয় যা আদালত মঞ্জুর করে। এরপরও নতুন কোনো সাক্ষী হাজির না হওয়ায় বিচার প্রক্রিয়া আবারও বিলম্বিত হয়।
দীর্ঘ এই বিচারিক প্রক্রিয়ার পর সম্প্রতি মামলার রায় ঘোষণা করেন নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মো. শওকত আলী। রায়ে বলা হয়, মামলার একমাত্র আসামি কামালের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়নি। ফলে তাকে খালাস দেওয়া হয়।
রাষ্ট্রপক্ষের পাবলিক প্রসিকিউটর শরিফ উদ্দিন মামুন বলেন, “আমরা এ মামলায় নতুন দায়িত্ব পেয়েছি। পুরো বিষয়টি এখনও খতিয়ে দেখিনি। পরে আনুষ্ঠানিকভাবে মন্তব্য করব।” অন্যদিকে আসামিপক্ষের আইনজীবী আনিছুর রহমান বলেন, “আমার মক্কেল কামাল সম্পূর্ণ নির্দোষ। তাকে ভিত্তিহীনভাবে ফাঁসানো হয়েছিল। তদন্ত কর্মকর্তাসহ যেসব সাক্ষী আদালতে সাক্ষ্য দিয়েছেন তারা কেউই কামালের বিরুদ্ধে কোনো নির্দিষ্ট অভিযোগ আনতে পারেননি। তাই বিচারক সঠিকভাবেই তাকে খালাস দিয়েছেন।”
এ মামলার দীর্ঘসূত্রতা ও সাক্ষ্যগ্রহণে বিলম্ব, রাষ্ট্রপক্ষের দুর্বল প্রস্তুতি এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের অনুপস্থিতি বিচারপ্রক্রিয়ার গতিকে মন্থর করে তোলে। কামালের গ্রেফতার, শারীরিক দুর্দশা ও বিচারিক হয়রানি প্রশ্ন তোলে তদন্ত প্রক্রিয়ার নির্ভরযোগ্যতা ও রাষ্ট্রপক্ষের দায়বদ্ধতা নিয়ে। দীর্ঘ সময় পর পাওয়া এই রায় শুধু একটি মামলার নিষ্পত্তি নয় বরং বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থার কাঠামো ও এর দুর্বলতাগুলোকে নতুন করে ভাববার সুযোগ তৈরি করেছে।

