মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় জামায়াত নেতা এটিএম আজহারুল ইসলামের মৃত্যুদণ্ডের রায়ের বিরুদ্ধে আপিলের শুনানি মঙ্গলবার, ২২ এপ্রিল আপিল বিভাগের কার্যতালিকায় অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে। এ বিষয়ে সোমবার (২১ এপ্রিল) বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরীর নেতৃত্বে আপিল বিভাগের তিন সদস্যবিশিষ্ট বেঞ্চ এ আদেশ দেন।
আদালতে আসামিপক্ষে শুনানির জন্য আবেদন করেন আইনজীবী ব্যারিস্টার এহসান আবদুল্লাহ সিদ্দিকী ও মোহাম্মদ শিশির মনির। রাষ্ট্রপক্ষে উপস্থিত ছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান। তিনি আদালতকে জানান, এর আগেও ২০ ফেব্রুয়ারি এ আবেদনের শুনানির জন্য কার্যতালিকায় রাখা হয়েছিল, তবে সেদিন শুনানি সম্ভব হয়নি। বিষয়টির গুরুত্ব বিবেচনায় আবারও শুনানির জন্য দিন ধার্য করা প্রয়োজন বলে তিনি মত দেন।
প্রসঙ্গত গত ২৬ ফেব্রুয়ারি সর্বোচ্চ আদালত এটিএম আজহারুল ইসলামের রিভিউ আবেদন গ্রহণ করে মূল আপিল শুনানির অনুমতি দেন। আদালত একইসঙ্গে আসামিপক্ষকে দুই সপ্তাহের মধ্যে আপিলের সারসংক্ষেপ জমা দেওয়ার নির্দেশ দেন। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় এটিই প্রথম, যেখানে রিভিউ পেরিয়ে মূল আপিল শুনানির অনুমতি দেওয়া হয়েছে।
রিভিউ আবেদনের প্রথম দিনের শুনানি শেষ হয় ২৫ ফেব্রুয়ারি। এর আগে ২৩ ফেব্রুয়ারি শুনানির জন্য দিন ধার্য করা হয়েছিল, এবং তা নির্ধারণ করেছিলেন বিচারপতি মো. আশফাকুল ইসলামের নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগ। সেই সময় আদালতে উপস্থিত ছিলেন চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম এবং আসামিপক্ষে আইনজীবী শিশির মনির।
তবে ২৩ জানুয়ারি এই রিভিউ আবেদনের শুনানি পিছিয়ে ২০ ফেব্রুয়ারি নির্ধারণ করা হয়, কারণ বেঞ্চে এক বিচারপতি অনুপস্থিত ছিলেন। সে সময় আদেশ দেন প্রধান বিচারপতি ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদের নেতৃত্বাধীন চার সদস্যের আপিল বেঞ্চ।
এই মামলার ইতিহাসে উল্লিখিত ঘটনা শুরু হয় ২০১৪ সালের ৩০ ডিসেম্বর, যখন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল এটিএম আজহারুল ইসলামকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড দেন। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে রংপুর অঞ্চলে সংঘটিত একাধিক মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে এই রায় ঘোষণা করা হয়। অভিযোগে বলা হয়, তিনি ১২৫৬ জনকে হত্যা বা গণহত্যা, ১৭ জনকে অপহরণ, একজন নারীকে ধর্ষণ, ১৩ জনকে আটক ও নির্যাতন এবং বহু ঘরে লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের মতো নয় ধরনের অপরাধের ছয়টিতে সরাসরি সম্পৃক্ত ছিলেন।
এই মামলার রায়ে ১ নম্বর অভিযোগ ছাড়া বাকি পাঁচটি অভিযোগে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। তবে জামায়াতে ইসলামী শুরু থেকেই এই রায়কে ‘প্রহসন’ বলে আখ্যায়িত করে আসছে।
২০১৫ সালের ২৮ জানুয়ারি জামায়াত নেতা আজহারুল ইসলামের পক্ষ থেকে এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করা হয়। তার আইনজীবীরা একে ১১৩টি যুক্তির ভিত্তিতে চ্যালেঞ্জ করেন এবং খালাস দাবি করেন। আপিল বিভাগের সংশ্লিষ্ট শাখায় দাখিল করা হয় ৯০ পৃষ্ঠার মূল আপিলসহ মোট ২৩৪০ পৃষ্ঠার আপিল দলিল।
এরপর ২০১৯ সালের ২৩ অক্টোবর আপিল বিভাগ পূর্বের রায় বহাল রেখে মৃত্যুদণ্ড নিশ্চিত করেন। তৎকালীন প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ এই রায় দেন। পরবর্তীতে এ রায়ের বিরুদ্ধে রিভিউ আবেদন দাখিল করেন এটিএম আজহারুল ইসলাম, যার ভিত্তিতেই বর্তমানে শুনানি প্রক্রিয়া এগিয়ে চলেছে।
এই প্রেক্ষাপটে, ২২ এপ্রিল নির্ধারিত আপিল শুনানি মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার প্রক্রিয়ায় একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। আদালতের সিদ্ধান্ত কী হবে সেটিই এখন জাতীয়ভাবে নজরকাড়া বিষয় হয়ে উঠেছে।

