অধস্তন আদালতের নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলা সংক্রান্ত সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদ এবং বিচার বিভাগের জন্য পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠার নির্দেশনা চেয়ে করা রিটের শুনানি গ্রহণের জন্য নতুন একটি বেঞ্চ নির্ধারণ করেছেন প্রধান বিচারপতি। রোববার (২০ এপ্রিল) বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন রিটকারীদের পক্ষে আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির।
তিনি জানান, হাইকোর্টের বিচারপতি আহমেদ সোহেল ও বিচারপতি দেবাশীষ রায় চৌধুরীর সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চে এখন এ রুলের শুনানি অনুষ্ঠিত হবে। এর আগে, গত বছরের ২৭ অক্টোবর বিচারপতি ফারাহ মাহবুব ও বিচারপতি দেবাশীষ রায় চৌধুরীর বেঞ্চ রুল জারি করেন। তবে বিচারপতি ফারাহ মাহবুব বর্তমানে আপিল বিভাগে পদোন্নতি পাওয়ায় প্রধান বিচারপতি নতুন বেঞ্চ গঠন করেছেন।
২০২৩ সালের ২৫ আগস্ট সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদ ও ২০১৭ সালের জুডিসিয়াল সার্ভিস (শৃঙ্খলা) বিধিমালার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে এবং পৃথক বিচার বিভাগীয় সচিবালয় প্রতিষ্ঠার নির্দেশনা চেয়ে সুপ্রিম কোর্টের সাত আইনজীবী রিটটি দায়ের করেন। রিট আবেদনকারীরা হলেন—মোহাম্মদ সাদ্দাম হোসেন, মো. জহিরুল ইসলাম, মোস্তাফিজুর রহমান, আবদুল্লাহ সাদিক, মো. মিজানুল হক, আমিনুল ইসলাম শাকিল ও যায়েদ বিন আমজাদ। তাদের পক্ষে আদালতে শুনানি করেন শিশির মনির।
রুলে জানতে চাওয়া হয়েছে, সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদ এবং ২০১৭ সালের জুডিসিয়াল সার্ভিস (শৃঙ্খলা) বিধিমালা কেন সংবিধান পরিপন্থি ও বাতিলযোগ্য ঘোষণা করা হবে না এবং বিচার বিভাগের জন্য কেন একটি পৃথক সচিবালয় গঠন করা হবে না। এ বিষয়ে আইন মন্ত্রণালয়ের দুই সচিব ও সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেলকে চার সপ্তাহের মধ্যে রুলের জবাব দিতে বলা হয়েছে।
সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, অধস্তন আদালতে নিয়োজিত বিচারকদের (বিশেষত ম্যাজিস্ট্রেটদের) নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলা বিধানের ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির হাতে ন্যস্ত। কর্মস্থল নির্ধারণ, পদোন্নতি, ছুটির মঞ্জুরি ইত্যাদি ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতি সুপ্রিম কোর্টের সঙ্গে পরামর্শক্রমে এ ক্ষমতা প্রয়োগ করে থাকেন।
তবে রিটকারীদের পক্ষের আইনজীবী শিশির মনির মনে করেন, রাষ্ট্রপতির ওপর ন্যস্ত এ ক্ষমতা বাস্তবে নির্বাহী বিভাগের হস্তক্ষেপের সুযোগ তৈরি করে যা বিচার বিভাগের স্বাধীনতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। তিনি বলেন, ১৯৭২ সালের সংবিধানে এসব নিয়ন্ত্রণ সুপ্রিম কোর্টের ওপর ন্যস্ত থাকলেও ১৯৭৪ সালের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে তা রাষ্ট্রপতির হাতে দেওয়া হয়। পরবর্তীতে সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনীতে ‘সুপ্রিম কোর্টের সঙ্গে পরামর্শক্রমে’ রাষ্ট্রপতি এ ক্ষমতা প্রয়োগ করবেন—এমন বিধান সংযোজন করা হয়। কিন্তু ২০১১ সালে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে আবারও ১১৬ অনুচ্ছেদের বর্তমান রূপটি বহাল রাখা হয় যা আগে আদালত অসাংবিধানিক বলে ঘোষণা করেছিল।
শিশির মনির বলেন, “সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদ বিচার বিভাগের স্বাধীনতার পরিপন্থি। এ অনুচ্ছেদের মাধ্যমে বিচার বিভাগের উপর নির্বাহী বিভাগের নিয়ন্ত্রণ বলবৎ রয়েছে, যা সংবিধানের মৌলিক কাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত করে।” তিনি আরও দাবি করেন, বিচারকদের শৃঙ্খলাবিধি কার্যত আইন মন্ত্রণালয়ের হাতে থাকায় বিচার বিভাগ একটি স্বাধীন প্রতিষ্ঠান হিসেবে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না।
তিনি জানান, পৃথক সচিবালয় না থাকায় বিচার বিভাগের প্রশাসনিক কার্যক্রমের ওপর আইন মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণ বিরাজ করছে। যার ফলে অধস্তন আদালতের বিচারকরা অনেক ক্ষেত্রে স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালনে বাধার সম্মুখীন হচ্ছেন। এ বাস্তবতায় বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদের পুনর্বিন্যাস ও পৃথক সচিবালয়ের প্রয়োজনীয়তা এখন সময়ের দাবি হয়ে উঠেছে।
এই রুলের শুনানির মাধ্যমে বিচার বিভাগের সাংবিধানিক কাঠামো এবং স্বাধীনতা প্রশ্নে একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক বিতর্কের অবসান ঘটতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

