কিশোরগঞ্জের ভৈরব উপজেলার একটি ওয়ার্কশপে কাজ করতে গিয়ে ডান হাত হারানো শিশু নাইম হাসানের জন্য হাইকোর্টের দেওয়া ৩০ লাখ টাকার ক্ষতিপূরণ আদেশ পালন না করায় ওয়ার্কশপ মালিককে আপিল বিভাগে হাজির করা হয়েছে। আদালতের নির্দেশে সোমবার (২১ এপ্রিল) কিশোরগঞ্জের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ হাছান চৌধুরী তাকে আদালতে হাজির করেন। এ সময় উপস্থিত ছিলেন নাইম ও তার বাবা আনোয়ার হোসেন।
আদালতে নাইমের পক্ষে উপস্থিত ছিলেন আইনজীবী ওমর ফারুক। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল অনীক আর হক এবং মালিকপক্ষে শুনানি করেন সিনিয়র অ্যাডভোকেট রুহুল কুদ্দুস কাজল।
ঘটনার সূত্রপাত ২০২০ সালের ১ নভেম্বর একটি জাতীয় দৈনিকে ‘ভৈরবে শিশুশ্রমের করুণ পরিণতি’ শিরোনামে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনের মাধ্যমে। প্রতিবেদনটিতে নাইমের জীবনের মর্মান্তিক ঘটনার বর্ণনা উঠে আসে। নাইমের বয়স তখন মাত্র ১০ বছর। সে চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ত এবং বাড়ি ছিল ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জ উপজেলার আড়াইসিধা গ্রামে। বাবা আনোয়ার হোসেন জুতা ব্যবসায়ী হলেও করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে কর্মহীন হয়ে পড়ায় সংসার চালাতে নাইমকে ভৈরবে একটি ওয়ার্কশপে পাঠানো হয়। সেখানে কাজ করতে গিয়েই এক মাসের মধ্যে এক দুর্ঘটনায় তার ডান হাতটি মেশিনে ঢুকে যায়। পরে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে কনুই থেকে বিচ্ছিন্ন করতে হয় হাতটি।
প্রকাশিত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে নাইমের বাবা ২০২০ সালের ডিসেম্বরে হাইকোর্টে একটি রিট করেন, যাতে ক্ষতিপূরণের নির্দেশনা চাওয়া হয়। রিটের প্রাথমিক শুনানিতে ২০২০ সালের ২৭ ডিসেম্বর হাইকোর্ট রুল জারি করেন। রুলে দুই কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ দিতে কেন নির্দেশ দেওয়া হবে না, তা জানতে চাওয়া হয় সংশ্লিষ্টদের কাছে। একই সঙ্গে ওই বছরের ২৮ সেপ্টেম্বর ঘটে যাওয়া ঘটনাটি জেলা প্রশাসকের একজন কর্মকর্তাকে দিয়ে অনুসন্ধানের নির্দেশও দেওয়া হয়।
রুলের ওপর চূড়ান্ত শুনানি শেষে ২০২৩ সালের ৩১ জানুয়ারি হাইকোর্ট রায় দেন। রায়ে বলা হয়, ৩০ লাখ টাকার মধ্যে ১৫ লাখ টাকা ওই বছরের এপ্রিলের মধ্যে এবং বাকি ১৫ লাখ টাকা ডিসেম্বরে ১০ বছর মেয়াদি ফিক্সড ডিপোজিট রিসিপ্ট (এফডিআর) আকারে শিশুটির নামে করতে হবে। পাশাপাশি নাইম এইচএসসি পর্যন্ত পড়ালেখা চালিয়ে যেতে পারার জন্য প্রতিমাসে সাত হাজার টাকা করে আর্থিক সহায়তা দিতে হবে। এই আদেশ বাস্তবায়নের দায়িত্ব দেওয়া হয় ওয়ার্কশপ মালিককে।
তবে হাইকোর্টের এ রায়ের বিরুদ্ধে মালিকপক্ষ আপিল বিভাগে আবেদন করে, যা ২০২৩ সালের ১৯ নভেম্বর খারিজ করে দেওয়া হয়। এরপরও ক্ষতিপূরণের অর্থ দেওয়া হয়নি। ফলে শিশুটির বাবা আদালত অবমাননার অভিযোগ এনে নতুন মামলা দায়ের করেন।
এই প্রেক্ষাপটে গত ১০ ফেব্রুয়ারি আপিল বিভাগ মালিককে আদালতে তলবের আদেশ দেন। সেই সঙ্গে কিশোরগঞ্জের পুলিশ সুপারকে নির্দেশ দেওয়া হয়, ২১ এপ্রিল ওয়ার্কশপ মালিককে আদালতে হাজির করতে হবে। এরপর আদালতের আদেশ অনুযায়ী তাকে হাজির করা হয়।
শুনানিতে মালিকপক্ষের আইনজীবী রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেন, তারা মামলা লড়তে আসেননি বরং উভয় পক্ষের মধ্যে স্থানীয়ভাবে আলোচনার উদ্যোগ চলছে। এ ছাড়া রিভিউ আবেদনও করা হয়েছে এবং এ বিষয়ে আদালতের একটি আদেশ প্রয়োজন।
এ বক্তব্যের ভিত্তিতে আদালত ৮ মে পর্যন্ত শুনানি মুলতবি রাখেন।
শিশুটির পক্ষে আইনজীবী ওমর ফারুক বলেন, আদালত সার্বিক বিষয় বিবেচনায় নিয়েছেন। মালিকপক্ষের আইনজীবী জানিয়েছেন তারা রিভিউ করেছেন এবং অর্থ পরিশোধে প্রস্তুত। এই আশ্বাসের ভিত্তিতে আদালত শুনানি পিছিয়ে দিয়েছেন এবং ৮ মে তারিখে উভয় পক্ষকে উপস্থিত থাকতে বলেছেন। তিনি আরও বলেন, “আমরা আশা করছি ৮ মে তারা অর্থ নিয়ে এসে আদালতের আদেশ বাস্তবায়ন করবেন এবং শিশুটির ন্যায্য ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করবেন।”
এই ঘটনায় শিশু নাইমের ভবিষ্যত ও পরিবারটির ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াই নতুন করে শিশুশ্রম এবং শিল্পখাতে নিরাপত্তাবিধি মানার গুরুত্বের বিষয়টিও সামনে এনেছে।

