বাংলাদেশ সরকার যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক একটি বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে চলা আইনি বিরোধ নিষ্পত্তির পথে এগিয়েছে। ‘স্মিথ কো-জেনারেশন (বাংলাদেশ) প্রাইভেট লিমিটেড’ নামের এই কোম্পানিকে ২০ মিলিয়ন ডলার ক্ষতিপূরণ দিয়ে মামলা নিষ্পত্তির সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগ। এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সরকারের বিরুদ্ধে করা মামলা প্রত্যাহার করার শর্তে একটি নিষ্পত্তি চুক্তিতে উপনীত হয়েছে উভয় পক্ষ।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ উপদেষ্টা ফাওজুল কবির খান জানিয়েছেন, অর্থনৈতিক উপদেষ্টা কমিটি বিদ্যুৎ বিভাগের প্রস্তাবিত ক্ষতিপূরণের অর্থ ছাড়ের অনুমোদন দিয়েছে। তিনি বলেন, কোম্পানিটি যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, সুইজারল্যান্ড, আয়ারল্যান্ডসহ একাধিক দেশের আদালতে মামলা করেছিল। এখন একটি এস্ক্রো অ্যাকাউন্টে অর্থ জমা রাখা হবে। নির্ধারিত সব মামলা প্রত্যাহার ও আইনজীবীদের সনদ পাওয়ার পরই কোম্পানির অনুকূলে অর্থ ছাড় করা হবে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, স্মিথ কো-জেনারেশন ১৯৯৭ সালে ঠাকুরগাঁওয়ের হরিপুরে ১০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার বার্জ-মাউন্টেড বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের জন্য বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) ও সরকারের সঙ্গে একটি চুক্তি করে। চুক্তি অনুযায়ী, ১০ মাসের মধ্যে প্রকল্প বাস্তবায়ন ও ১৯৯৮ সালের ১৫ আগস্ট থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের কথা ছিল। কিন্তু কোম্পানিটি নির্ধারিত সময়সীমায় কাজ শুরু করতে ব্যর্থ হয় এবং প্রকল্পে কোনো নির্মাণকাজই শুরু করেনি। পরবর্তীতে তারা সময়সীমা আরও ছয় মাস ২০ দিন বাড়ানোর প্রস্তাব দেয়, যা সরকার গ্রহণ করেনি।
ফলে ১৯৯৯ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি সরকার বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি বাতিল করে এবং কোম্পানির পারফরম্যান্স গ্যারান্টির ১ লাখ ৫০ হাজার ডলার বাজেয়াপ্ত করে। এরপর কোম্পানিটি চুক্তি বাতিল ও গ্যারান্টি নগদায়নের বিরোধে ঢাকাসহ নারায়ণগঞ্জে মামলা করে, যেগুলো খারিজ হয়ে যায়। একইসঙ্গে কোম্পানিটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক সালিসি আদালত (আইসিসি)-এর আওতায় আরবিট্রেশনের উদ্যোগ নেয় এবং ১৯৯৯ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি বিপিডিবিকে নোটিশ পাঠায়।
আইসিসি আরবিট্রেশন ট্রাইব্যুনাল আরবিট্রেশন খরচ হিসেবে ৯ লাখ ৫০ হাজার ডলার নির্ধারণ করে, যার অর্ধেক বিপিডিবিকে পরিশোধ করতে হতো। তবে বিপিডিবি আদালতে চলমান মামলা এবং খরচ বিবেচনায় এই অর্থ না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। একপাক্ষিক শুনানির পর ২০০৩ সালের ৩০ অক্টোবর আইসিসি ট্রাইব্যুনাল স্মিথ কো-জেনারেশনের পক্ষে ১৩.০৬ মিলিয়ন ডলার ক্ষতিপূরণের রায় দেয়, পরিশোধে বিলম্ব হলে ৪ শতাংশ হারে সুদ দেওয়ার নির্দেশও ছিল।
এর ধারাবাহিকতায় ২০২৪ সালের ১৯ মে যুক্তরাষ্ট্রের কলাম্বিয়া ডিসট্রিক্ট কোর্টে বিপিডিবির বিরুদ্ধে একটি সংশোধিত চূড়ান্ত রায় জারি হয়, যাতে ৩১.৭১ মিলিয়ন ডলার পরিশোধের নির্দেশ দেওয়া হয়। এই রায় কার্যকর করতে গিয়ে বিপাকে পড়ে সরকার। কারণ ওই সময় আইএমএফ-ওয়ার্ল্ড ব্যাংক বার্ষিক বৈঠকে যোগ দিতে যুক্তরাষ্ট্রে ছিলেন অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ ও বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর। আদালত তাদের বিরুদ্ধে অর্থ আদায়ের নির্দেশ এবং গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করলে বাংলাদেশ দ্রুত আইনজীবী নিয়োগ করে সেই পরোয়ানা স্থগিত করতে সক্ষম হয়।
এই পরিস্থিতিতে সরকার বিষয়টি আদালতের বাইরে নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেয় এবং স্মিথ কো-জেনারেশনকে মধ্যস্থতার প্রস্তাব পাঠায়। কোম্পানিটি তাতে সম্মত হয় এবং প্রধানমন্ত্রী উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের মধ্যস্থতায় আলোচনা শুরু হয়। যুক্তরাষ্ট্রের আদালত নিযুক্ত মধ্যস্থতাকারীদের উপস্থিতিতে পাঁচটি অনলাইন সভায় অংশ নেয় বাংলাদেশের অ্যাটর্নি জেনারেল, বিদ্যুৎ বিভাগ ও বিপিডিবির প্রতিনিধি দল।
সভাগুলোতে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ১৯৯৯ সালে বাজেয়াপ্ত ১.৫ মিলিয়ন ডলার ফেরতের প্রস্তাব দেওয়া হয়, কিন্তু কোম্পানিটি আইসিসির রায় অনুযায়ী ৩১.৭১ মিলিয়ন ডলার এবং মামলার খরচ বাবদ অতিরিক্ত ১৮ মিলিয়ন ডলার দাবি করে। বাংলাদেশ পরে স্মিথ কো-জেনারেশনকে দেশে বিনিয়োগের আহ্বানসহ ১০ মিলিয়ন ডলারের প্রস্তাব দিলেও, সেটি গ্রহণ করেনি কোম্পানিটি।
পরবর্তীতে স্মিথ কোজেনারেশন দুইটি প্রস্তাব দেয়—একটি ২৫ মিলিয়ন ডলারে এককালীন নিষ্পত্তি এবং অপরটি ২৪ মিলিয়ন ডলার ক্ষতিপূরণ ও দুটি বিদ্যুৎ প্রকল্পে বিনিয়োগের সুযোগের বিনিময়ে নিষ্পত্তি। আলোচনার শেষ পর্যায়ে বাংলাদেশ সরকার ২০ মিলিয়ন ডলারে মামলাটি নিষ্পত্তিতে সম্মত হয়।
অ্যাটর্নি জেনারেল নিশ্চিত করেছেন, গত ২৮ এপ্রিল দুই পক্ষের মধ্যে নিষ্পত্তি চুক্তি স্বাক্ষর হয়েছে। এতে স্মিথ কোজেনারেশন বিশ্বের কোনো আদালতে আর মামলা না করার এবং পূর্বে করা সব মামলা প্রত্যাহার করার লিখিত প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এই চুক্তির আওতায় সুইজারল্যান্ডভিত্তিক আইনি প্রতিষ্ঠান ব্রাটশি লিমিটেডকে এস্ক্রো এজেন্ট মনোনীত করা হয়েছে, যার মাধ্যমে ২০ মিলিয়ন ডলার কোম্পানিকে প্রদান করা হবে।
এই প্রক্রিয়ায় সরকারের পক্ষে নিয়োজিত আইন প্রতিষ্ঠান ফলি হোগ এলএলপিকে ৩ লাখ ৯৬ হাজার ডলার ফি দিতে হয়েছে। সব মিলিয়ে মামলাটির নিষ্পত্তিতে বাংলাদেশ সরকারের ব্যয় দাঁড়িয়েছে প্রায় ২ কোটি ৪০ লাখ ডলার।

