সরকার নানা উদ্যোগ নিলেও দেশের শ্রম আদালত ও শ্রম আপিল ট্রাইব্যুনালে মামলা জট কমছে না। বিচার প্রক্রিয়ার ধীরগতির কারণে শ্রমিকদের ন্যায়বিচার পাওয়া কঠিন হয়ে উঠছে। বর্তমানে দেশের ১৩টি শ্রম আদালত ও একমাত্র শ্রম আপিল ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা প্রায় ২৩ হাজারের মতো। অথচ আইন অনুযায়ী শ্রম আদালতে একটি মামলা ৬০ দিনের মধ্যে নিষ্পত্তি হওয়ার কথা। বাস্তবে ছয় মাসের বেশি সময় ধরে নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে ১৩ হাজার ৪০২টি মামলা।
শ্রম মন্ত্রণালয়ের হালনাগাদ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৪ সালের মার্চ পর্যন্ত সব শ্রম আদালত ও ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা ২২ হাজার ৭৩৭টি। ওই মাসে নিষ্পত্তি হয়েছে মাত্র ৭৮৮টি। বিশেষ করে ঢাকার তিনটি শ্রম আদালতেই ঝুলে আছে ১০ হাজার ৫৮৯টি মামলা। এর মধ্যে ১ম শ্রম আদালতে রয়েছে ৪ হাজার ৬৭৬টি মামলা, দ্বিতীয় ও তৃতীয় আদালতে রয়েছে যথাক্রমে ৩ হাজার ২৯৯ এবং ২ হাজার ৬১৪টি মামলা। মার্চ মাসে এই তিনটি আদালতে নিষ্পত্তি হয়েছে মাত্র ২৬৯টি মামলা।
চট্টগ্রামের পরিস্থিতিও ভিন্ন নয়। সেখানে প্রথম শ্রম আদালতে বিচারাধীন ১ হাজার ৩৭৬টি এবং দ্বিতীয় আদালতে ৫৫৪টি মামলা। পুরো চট্টগ্রামে মার্চ মাসে মাত্র ১৭টি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে। এ সময় সেখানে নতুন করে করা হয়েছে ৫২টি মামলা। গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জের শ্রম আদালতেও জট রয়েছে যথাক্রমে ৫ হাজার ৫২৮টি ও ২ হাজার ১৩৩টি মামলা নিয়ে। ওই দুই জেলায় মার্চ মাসে নিষ্পত্তি হয় মাত্র ৪২৩টি মামলা।
বিভাগীয় শ্রম আদালতগুলোর মধ্যে খুলনায় ৯১টি, রাজশাহীতে ৭৩, রংপুরে ৭৫, সিলেটে ৪৮, কুমিল্লায় ১৫২ এবং বরিশালে বিচারাধীন ৬৬টি মামলা রয়েছে। সব মিলিয়ে বিভাগীয় আদালতগুলোতে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা ৫০৫টি।
শ্রম আপিল ট্রাইব্যুনালের চিত্রও উদ্বেগজনক। বর্তমানে এখানে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা ১ হাজার ২২৩টি, যার মধ্যে ৮২২টি মামলার মেয়াদ ছয় মাসের বেশি পেরিয়ে গেছে। এছাড়া ৪১টি মামলা উচ্চ আদালতের নির্দেশে স্থগিত রয়েছে। দেশের একমাত্র আপিল ট্রাইব্যুনাল হওয়ায় বিভাগীয় ও জেলা শ্রম আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করতে শ্রমিকদের ঢাকায় আসতে হয় যা অনেকের জন্যই কঠিন। ফলে শ্রমিকদের বড় একটি অংশই উচ্চ আদালতে যাওয়ার আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন।
মামলার দীর্ঘসূত্রতার পেছনে রয়েছে বিচারক সংকট, প্রযুক্তির অপ্রয়োগ, মালিক ও আইনজীবীদের সময় নেওয়ার প্রবণতা এবং মামলার নথি প্রস্তুতের ধীর গতি। এ প্রসঙ্গে সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনজিল মোরসেদ বলেন, ‘বিচারকের সংখ্যা মামলার তুলনায় অপ্রতুল। মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ এবং নথিপত্র প্রস্তুতিতেও দীর্ঘ সময় লাগে। এতে একটি মামলার নিষ্পত্তিতে গড়ে ৩ থেকে ৫ বছর সময় লাগছে।’ তিনি শ্রম আদালতের কাঠামো পুনর্বিন্যাসের পাশাপাশি আইন যুগোপযোগী করার পরামর্শ দেন।
শ্রম আদালতের প্রতি আস্থা হারিয়ে ফেলেছেন অনেক শ্রমিক। রূপগঞ্জের গার্মেন্ট শ্রমিক মনিরা আক্তার ২০১৮ সালে বকেয়া বেতন ও ছাঁটাইয়ের ক্ষতিপূরণ চেয়ে মামলা করেছিলেন। তিনি জানান, পাঁচবার বিচারক বদল হলেও এখনো সাক্ষ্যপর্ব শেষ হয়নি। ‘প্রতিবার তারিখ দেয়, বিচারক থাকেন না, মালিকপক্ষের আইনজীবী বারবার সময় নেয়। আগে খোঁজখবর রাখতাম এখন রাখি না। আদালতে গেলে চাকরি থাকে না,’ বলেন মনিরা।
শুধু মামলার ধীর নিষ্পত্তিই নয় আদালতগুলোর প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনাতেও সমস্যা রয়েছে। বর্তমানে শ্রম আদালত ও আপিল ট্রাইব্যুনালে ৫৮টি পদ শূন্য যার মধ্যে ৭টি আদালতে গুরুত্বপূর্ণ রেজিস্ট্রার পদও ফাঁকা। এতে মামলার তালিকা, আদেশের কপি সংগ্রহ এবং নতুন মামলা দায়েরসহ নানা প্রক্রিয়ায় হয়রানির শিকার হচ্ছেন সাধারণ শ্রমিকরা।
শ্রম আপিল ট্রাইব্যুনালের রেজিস্ট্রার মো. হেদায়েতুল ইসলাম জানান, শূন্যপদ পূরণের প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। অন্যদিকে ব্লাস্ট-এর আইন উপদেষ্টা ও অবসরপ্রাপ্ত জেলা জজ এসএম রেজাউল করিম বলেন, ‘আইনে ১৮০ দিনের মধ্যে মামলা নিষ্পত্তির কথা বলা হলেও বাস্তবে তা হয় না। আইনজীবী ও মালিকপক্ষ অনেক সময় মামলার গতি থামিয়ে দেন। শ্রম আইনও দীর্ঘদিন ধরে সংশোধনের অপেক্ষায়।’
এ বিষয়ে শ্রম ও কর্মসংস্থান সচিব এএইচএম সফিকুজ্জামান জানান, ‘শ্রম আইন সংশোধনের কাজ চলছে। আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী আইন তৈরি করা হচ্ছে। শ্রম কমিশনের প্রতিবেদন এবং খসড়া আইন পর্যালোচনা করা হচ্ছে। আশা করছি, জুলাই-আগস্টের মধ্যে নতুন আইন প্রণয়ন হবে।’ তিনি বলেন, ‘নতুন আইনে শ্রমিকদের স্বার্থ রক্ষা, আদালতের কাঠামো পুনর্বিন্যাস এবং বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি (ADR) ব্যবস্থার কথা রাখা হয়েছে যা বিচার প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও গতিশীলতা আনবে।’
সব মিলিয়ে শ্রম আদালতের মামলা জট শুধু বিচার ব্যবস্থার নয় শ্রমিকদের জীবিকা ও অধিকার নিশ্চিত করার প্রশ্নেও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কাঙ্ক্ষিত সমাধানে নতুন আইন, প্রযুক্তিনির্ভর আদালত ব্যবস্থাপনা ও মানবসম্পদের ঘাটতি পূরণ এখন সময়ের দাবি।

