তিন বছর আট মাস আগে এক দম্পতির বিবাহবিচ্ছেদ হয়। এরপর দুই মেয়ের হেফাজত চেয়ে আদালতে পাল্টাপাল্টি মামলা করেন মা ও বাবা। শুনানির সময় সন্তানরা বাবার সঙ্গে আদালতে দেখা করত। তবে এ অল্প সময়ের সাক্ষাতে তাদের মন ভরত না। তারা সব সময় মা–বাবাকে একসঙ্গে কাছে পেতে চাইত। সাত বছর বয়সী বড় মেয়ে প্রতিবার সাক্ষাতে কান্না করত। সে মা–বাবাকে একসঙ্গে রাখার জন্য অনুরোধ করত।
এই আবেগ আর সন্তানের মানসিক অবস্থা ভেবে দম্পতি আবার এক হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। প্রায় তিন বছর ধরে মামলা চলার পর গত মার্চে তাঁরা আবার বিয়ে করেন। বিয়ে হয় আদালত চত্বরে।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মলয় কুমার সাহা জানান, শুধু মেয়েদের মানসিক অবস্থার কথা বিবেচনায় নিয়ে তাঁরা আবার এক হয়েছেন। আপসে পৌঁছানোর পর ধর্মীয় রীতিতে আদালত প্রাঙ্গণে তাঁদের পুনরায় বিয়ে হয়। এখন তাঁরা একসঙ্গে সংসার করছেন।
২০১৭ সালে তাঁদের বিয়ে হয়। দুজনই উচ্চশিক্ষিত ও ভালো পদে চাকরি করেন। শুরুতে নারীটির বাবার বাড়িতে তাঁদের সংসার হয়। পরে রাজধানীতে ভাড়া বাসা নেন তাঁরা। বিয়ের এক বছর পর তাঁদের প্রথম কন্যা জন্ম নেয়।
নারীর ভাষ্যমতে, শুরুতে সংসার ভালোই চলছিল। কিন্তু স্বামী যৌতুক চেয়েছিলেন। মেয়ের সুখের কথা ভেবে তাঁর বাবা ছয় লাখ টাকা ব্যয়ে টিভি, ফ্রিজ, খাট ও আলমারি দেন।
নারী মামলায় জানান, বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় ভাড়া বাসায় ওঠার কিছুদিন পর থেকেই অশান্তি শুরু হয়। পাশেই স্বামীর বোনের বাসা ছিল। শাশুড়ি কখনো তাঁদের সঙ্গে আবার কখনো মেয়ের বাসায় থাকতেন। তুচ্ছ বিষয়ে শাশুড়ির সঙ্গে প্রায়ই মনোমালিন্য হতো। এ নিয়ে স্বামী তাঁকে বাজে কথা বলতেন। পরে মানসিক ও শারীরিকভাবে নির্যাতন শুরু করেন। সন্তানের কথা ভেবে তিনি সব সহ্য করতেন।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, একসময় স্বামী তাঁর বাবার জমি লিখে নিতে চাপ দেন। এতে রাজি না হওয়ায় নির্যাতন বেড়ে যায়। দুজনের দূরত্ব বাড়ে। এরপর নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে চার বছরের মাথায় তিনি স্বামীকে তালাক দেন। সন্তান নিয়ে বাবার বাড়িতে চলে যান।
তালাক কার্যকরের আগে (তিন মাসের সময়সীমায়) স্বামীর পরিবার তালাক প্রত্যাহারের অনুরোধ করে। স্বামী ও তাঁর আত্মীয়রা বলেন, আর নির্যাতন হবে না। সন্তানদের কথা ভেবে তিনি তালাকের নোটিশ তুলে নেন। আবার সংসার শুরু করেন।
আদালতে ওই নারী বলেন, ফের সংসার শুরুর পর প্রথম কয়েক মাস ভালোই চলছিল। কিন্তু দ্বিতীয় সন্তান গর্ভে আসার পর স্বামী আবার নির্যাতন শুরু করেন। তিনি এতটাই রেগে যেতেন যে, পরিবারের অন্য সদস্যরাও তাঁকে সামলাতে পারতেন না। নির্যাতন সইতে না পেরে তিনি আবার বাবার বাড়িতে চলে যান। ২০২১ সালের ৩০ আগস্ট তিনি দ্বিতীয়বার স্বামীকে তালাক দেন। এই তালাক কার্যকর হয়। ছয় মাস পর এক বেসরকারি হাসপাতালে তাঁর দ্বিতীয় কন্যার জন্ম হয়। তবে স্বামী কখনো মেয়েকে দেখতে আসেননি।
তাঁর সাবেক স্বামী এসব অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি অভিযোগ করেন, স্ত্রীর তাঁর মায়ের সঙ্গে বনিবনা হতো না। স্ত্রী প্রায় সময় মায়ের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করতেন। একদিন রাগ করে স্ত্রী বড় মেয়েকে নিয়ে বাবার বাড়ি চলে যান। দ্বিতীয় সন্তানের জন্মের পর মেয়েদের দেখতে তিনি শ্বশুরবাড়ি যান। তখন তাঁকে মারধর করা হয়। তিনি ৯৯৯ নম্বরে ফোন দেন। পরে পুলিশ এসে তাঁকে উদ্ধার করে।
এই ঘটনার পর দুজনের আর যোগাযোগ হয়নি। পরে দুই মেয়ের হেফাজতের জন্য আদালতে মামলা করেন স্বামী। স্ত্রীও একই ধারায় পাল্টা মামলা করেন। বাবা–মায়ের মামলার শুনানির সময় দুই মেয়ে আদালতে আসত। সেখানে মা–বাবার সঙ্গে কথা বলত। তারা একসঙ্গে থাকতে চাইত। প্রায়ই কান্না করত। এসব দেখে স্বামী–স্ত্রী দুজনই আবার এক হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
আইনজীবী মলয় কুমার সাহা বলেন, মা–বাবার বিচ্ছেদে শিশুদের মন ভেঙে পড়ে। ভালোভাবে বড় হতে তাদের মা–বাবার আদর দরকার। বিচ্ছেদ হলে এই ভালোবাসার অভাব থেকে যায়। এতে শিশুর মানসিক সমস্যা দেখা দেয়। এ কারণেই ওই দম্পতি মেয়ে দুটির কথা ভেবে আবার এক হয়েছেন। মার্চ মাসে তাঁরা আবার বিয়ে করেন। এখন তাঁরা একসঙ্গে আছেন। তাঁদের নিয়মিত খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে। তাঁরা বর্তমানে ভালো আছেন।

