বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) মেধাবী শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ হত্যা মামলায় বিচারিক আদালতের দেওয়া রায় হাইকোর্টে বহাল রয়েছে। ২০ জন আসামির মৃত্যুদণ্ড ও ৫ জনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের রায় বহাল রেখে হাইকোর্টের দেওয়া পূর্ণাঙ্গ রায় সম্প্রতি সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হয়েছে। রায়টি মোট ১৩১ পৃষ্ঠার।
এর আগে ২০২৪ সালের ১৬ মার্চ বিচারপতি এ কে এম আসাদুজ্জামান ও বিচারপতি সৈয়দ এনায়েত হোসেনের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ ডেথ রেফারেন্স, আপিল এবং জেল আপিলের শুনানি শেষে এই রায় ঘোষণা করেন। বিচারিক প্রক্রিয়ার শুরু থেকে এই মামলাটি দেশজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন তুলেছিল।
আবরার ফাহাদ ছিলেন বুয়েটের ইলেকট্রিকাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক্স ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। ২০১৯ সালের ৬ অক্টোবর রাতে বুয়েটের শেরেবাংলা হলে ছাত্রলীগের একদল নেতাকর্মীর নির্মম নির্যাতনে প্রাণ হারান তিনি। ঘটনার সূত্রপাত হয় আবরারের ফেসবুকে দেওয়া একটি ভারতবিরোধী পোস্টের কারণে। এরপর রাত ৮টার দিকে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা তাকে নিজের ১০১১ নম্বর কক্ষ থেকে ডেকে নেয়। গভীর রাত ৩টার দিকে জানা যায়, আবরারকে পিটিয়ে হত্যা করে হলের একতলা ও দোতলার মাঝামাঝি সিঁড়ির স্থানে ফেলে রাখা হয়েছে।
সেই রাতে আবরারকে ‘শিবির’ আখ্যা দিয়ে প্রথমে একটি কক্ষে এবং পরে আরেকটি কক্ষে নিয়ে তাকে দুবার পিটানো হয়। রাত ২টার দিকে টহল পুলিশ হলে প্রবেশ করতে চাইলে তাদের গেটের বাইরে আটকে রাখা হয়। পরে রাত ৪টার দিকে পুলিশ হলে প্রবেশ করে। ডাক্তার এসে তখনই আবরারকে মৃত ঘোষণা করেন। মৃতদেহ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। পুলিশ পরে নিশ্চিত করে যে, আবরার ফাহাদকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে।
এই হত্যাকাণ্ডের খবর ছড়িয়ে পড়লে সারা দেশে নিন্দার ঝড় ওঠে। বুয়েটসহ দেশের প্রায় সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রতিবাদ-বিক্ষোভে উত্তাল হয়ে উঠে। আন্দোলনের মুখে বুয়েটে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করা হয়। দেশের রাজনীতিতেও আবরার হত্যাকাণ্ড এক গম্ভীর প্রতিক্রিয়ার জন্ম দেয়। সে সময়কার ক্ষমতাসীন সরকারকে ‘ফ্যাসিস্ট’ বলে উল্লেখ করে আন্দোলনে উত্তাল হয়ে ওঠে বিভিন্ন ছাত্র সংগঠন ও রাজনৈতিক দলগুলো।
ঘটনার পরদিন, ৭ অক্টোবর ২০১৯ তারিখে আবরারের বাবা বরকত উল্লাহ চকবাজার থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। মাত্র ৩৭ দিনের মধ্যে তদন্ত শেষ করে ১৩ নভেম্বর চার্জশিট দাখিল করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা, গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) পরিদর্শক মো. ওয়াহিদুজ্জামান। এরপর ২০২১ সালের ৮ ডিসেম্বর আদালত ২০ জন বুয়েট শিক্ষার্থীকে মৃত্যুদণ্ড এবং আরও পাঁচ শিক্ষার্থীকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রদান করেন।
মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের মধ্যে রয়েছেন— মেহেদী হাসান রাসেল, মো. অনিক সরকার ওরফে অপু, মেহেদী হাসান রবিন ওরফে শান্ত, ইফতি মোশাররফ সকাল, মো. মনিরুজ্জামান মনির, মেফতাহুল ইসলাম জিয়ন, মো. মাজেদুর রহমান মাজেদ, মো. মুজাহিদুর রহমান মুজাহিদ, খন্দকার তাবাকারুল ইসলাম ওরফে তানভির, হোসেন মোহাম্মদ তোহা, মো. শামীম বিল্লাহ, এ এস এম নাজমুস সাদাত, মুনতাসির আল জেমী, মো. মিজানুর রহমান মিজান, এস এম মাহমুদ সেতু, সামসুল আরেফিন রাফাত, মো. মোর্শেদ ওরফে অমর্ত্য ইসলাম, এহতেশামুল রাব্বি ওরফে তানিম (পলাতক), মোহাম্মদ মোর্শেদ উজ্জামান মণ্ডল ওরফে জিসান (পলাতক) এবং মুজতবা রাফিদ (পলাতক)।
এ ছাড়া যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্তরা হলেন— অমিত সাহা, ইসতিয়াক আহমেদ মুন্না, মো. আকাশ হোসেন, মুহতাসিম ফুয়াদ এবং মো. মোয়াজ ওরফে মোয়াজ আবু হোরায়রা।
ফৌজদারি কার্যবিধি অনুযায়ী, কোনো বিচারিক আদালত যদি মৃত্যুদণ্ড প্রদান করে, তবে সেই রায় অনুমোদনের জন্য হাইকোর্টে পাঠাতে হয় যেটিকে ডেথ রেফারেন্স বলা হয়। সেই অনুযায়ী ২০২২ সালের ৬ জানুয়ারি মামলার নথি হাইকোর্টে পাঠানো হয়। পরে কারাবন্দি আসামিরা জেল আপিল করেন এবং কেউ কেউ ফৌজদারি আপিলও করেন।
২০২৩ সালের জুলাই মাসে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় আবরার ফাহাদের নাম নতুন করে সামনে আসে। শিক্ষার্থীদের কাছে আবরার হয়ে ওঠেন আন্দোলনের প্রতীক। তারা তার নামেও স্লোগান দেন। একই বছরের ৫ আগস্ট, ‘ফ্যাসিস্ট সরকার’ পতনের পর আবরার ফাহাদ হত্যা মামলার ডেথ রেফারেন্স ও আপিল শুনানির উদ্যোগ নেওয়া হয়। পরে ২৮ নভেম্বর থেকে হাইকোর্ট বেঞ্চে এ বিষয়ে নিয়মিত শুনানি শুরু হয়। সবকিছু বিচার-বিশ্লেষণ করে হাইকোর্ট অবশেষে পূর্বের রায় বহাল রাখে এবং ন্যায়বিচারের একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করে।
এই রায় শুধু আবরার ফাহাদের পরিবার নয় গোটা জাতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সহিংসতার জায়গা নেই এবং অপরাধ যতোই প্রভাবশালী হোক আইনের আওতা থেকে কেউই রেহাই পায় না।

