আদালতে হয়রানি ও দুর্ভোগ নতুন কিছু নয়। বিচারপ্রার্থীদের অনেকেই বছরের পর বছর ঘুরেও ন্যায্য সেবা পান না। এই বাস্তবতায় নতুন আশার আলো হয়ে এসেছে ‘সুপ্রিম কোর্ট অনলাইন হেল্পলাইন’।
২০২৪ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর চালু হওয়া এই হেল্পলাইনে প্রতিদিনই বাড়ছে ফোনকল। সাত মাসে এসেছে প্রায় দুই হাজার অভিযোগ ও পরামর্শ।
দুইটি নম্বর চালু রয়েছে—০১৩১৬১৫৪২১৬ এবং ০১৭৯৫৩৭৩৬৮০। সরাসরি কল করা যায়। হোয়াটসঅ্যাপেও অভিযোগ জানানো সম্ভব। সেবা মিলছে রোববার থেকে বৃহস্পতিবার সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত।
ফোন করলেই কাজ হচ্ছে
খুলনার রমজান ফকির অভিযোগ জানান, তার ছেলে হাফিজুর রহমান হাইকোর্ট থেকে জামিন পেলেও রায়ের কপি কারাগারে পৌঁছায়নি। হেল্পলাইনে ফোন করার পরদিনই কপি পাঠানো হয়। ছেলে মুক্তি পান।
নাটোরের মো. বাবুর মামলার নথি খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। হেল্পলাইনে জানানোর পর নথি উদ্ধার হয়।
ঢাকার ইসহাক চৌধুরীর রিট ছিল কার্যতালিকায়, কিন্তু কোর্টে নথি পাঠানো হচ্ছিল না। ফোন করার পর দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
হাজারো অভিযোগ, অনেক সমাধান
প্রথম মাসেই ফোন আসে ৩৩৭টি। সাত মাসে ফোন বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ২ হাজারে।
এই সময়ে জমা পড়ে ১৫৩টি লিখিত অভিযোগ। এর মধ্যে ঘুষ, বিলম্ব, খারাপ আচরণ, দায়িত্বে গাফিলতিসহ নানা অনিয়মের অভিযোগ ছিল।
অভিযোগ এসেছে বিচারক, আইনজীবী ও আদালতের কর্মচারীদের বিরুদ্ধেও। এমনকি সরকারি দপ্তরের দুর্নীতির অভিযোগও জানানো হয়েছে।
একটি অভিযোগ আপিল বিভাগের সাবেক বিচারকের বিরুদ্ধে। তিনটি হাইকোর্ট বিভাগের বিচারকদের বিরুদ্ধে। জেলা আদালতের বিচারকদের বিরুদ্ধে এসেছে ২৫টি অভিযোগ। কর্মচারীদের বিরুদ্ধেও ২৫টি, আইনজীবীদের বিরুদ্ধে ৯টি অভিযোগ জমা পড়ে।
সরাসরি প্রধান বিচারপতির নজরে
এই হেল্পলাইন পরিচালনা করছে সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার দপ্তর। প্রতিটি অভিযোগ প্রধান বিচারপতির নির্দেশেই বিবেচনা করা হয়। প্রয়োজনে নেওয়া হয় আইনগত ব্যবস্থা।
প্রধান বিচারপতি ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদের নেতৃত্বে সুপ্রিম কোর্ট একটি রোডম্যাপ তৈরি করেছে। সেখানে দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ ঘোষণা করা হয়েছে।
নির্দেশনায় বলা হয়েছে, কেউ হয়রানি করলে, ঘুষ নিলে বা দায়িত্বে গাফিলতি করলে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সেবায় দেরি, খারাপ আচরণ বা অর্থ লেনদেন—কোনো কিছুই বরদাস্ত করা হবে না।
গঠনগত উদ্যোগও চলমান
সুপ্রিম কোর্টে আছে হাইকোর্টের ৩৮টি এবং আপিল বিভাগের ১৯টি শাখা।
কর্মরত আছেন রেজিস্ট্রার জেনারেল, ৩ জন রেজিস্ট্রার, ৪ জন অতিরিক্ত রেজিস্ট্রার, ১ জন বিশেষ অফিসার, ১২ জন ডেপুটি রেজিস্ট্রার ও ২০ জন সহকারী রেজিস্ট্রার। সবমিলিয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংখ্যা প্রায় ২,৫০০ জন।
আইনজীবীদের প্রশংসা
হাইকোর্টের তরুণ আইনজীবী মো. শাহীন মণ্ডল বলেন, “এই হেল্পলাইন দুর্দান্ত উদ্যোগ। আগে মানুষ শুধু আইনজীবী বা কর্মচারীদের ওপর নির্ভর করত। এখন নিজেরাই সরাসরি যোগাযোগ করতে পারছে।”
তিনি আরও বলেন, “ফোন নম্বর বাড়ানো দরকার। শুধু সুপ্রিম কোর্ট নয়, জেলা আদালতেও এই সেবা চালু হলে সাধারণ মানুষ আরও উপকৃত হবে। দুর্নীতিও কমবে।”

