হাইকোর্ট বিভাগে নতুন অস্থায়ী বিচারক নিয়োগের প্রস্তুতি চলছে পুরোদমে। এবারই প্রথমবারের মতো নিয়োগ হবে সুপ্রিম জুডিশিয়াল অ্যাপয়েন্টমেন্ট কাউন্সিলের সুপারিশে। সংখ্যাটা এখনও নির্ধারিত না হলেও, প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গেছে।
এর আগে নিয়োগের নিয়ম ছিল ভিন্ন। প্রধান বিচারপতির সুপারিশে নিয়োগ হলেও, পেছনে থাকত সরকারের ইচ্ছা। অনেক সময় আওয়ামী লীগের ঘনিষ্ঠ, দলীয় লোকজন বা মামলার আসামিরাও পেতেন বিচারকের চেয়ার। শেখ হাসিনার শাসনামলে এই প্রবণতা আরও বেড়ে যায়। বিচার বিভাগ হয়ে পড়ে সরকারের হাতের ক্রীড়নক।
তখন নিয়োগ পাওয়া অনেক বিচারকই এখন আওয়ামী-বিরোধী আইনজীবীদের প্রতি পক্ষপাত দেখাচ্ছেন। পুরনো সিন্ডিকেট ভেঙে এসেছে নতুন প্রভাবশালী গ্রুপ।
হাসিনার পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকারও এক দফা নিজের মতো করে বিচারক নিয়োগ দেয়। তা নিয়েও চলে সমালোচনা। এরপর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত সরকার সংবিধান অনুযায়ী গঠন করে সুপ্রিম জুডিশিয়াল অ্যাপয়েন্টমেন্ট কাউন্সিল। এবার এই কাউন্সিলই নিয়োগে চূড়ান্ত ভূমিকা রাখছে।
এই কাউন্সিল গঠিত হয়েছে রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশে। প্রধান বিচারপতি এর সভাপতি। সদস্য হিসেবে রয়েছেন আপিল বিভাগের প্রবীণ বিচারপতি, হাইকোর্ট বিভাগের প্রবীণ বিচারপতি, প্রধান বিচারপতির মনোনীত একজন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি, অ্যাটর্নি জেনারেল এবং একজন আইন বিশেষজ্ঞ।
প্রথম সভাতেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের শিক্ষক সুমাইয়া খায়ের ও অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি তারিক উল হাকিমকে কাউন্সিলে যুক্ত করা হয়। এরপর আরও দুটি সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। সভায় সিদ্ধান্ত হয়, আগ্রহীদের আবেদন নিতে হবে নির্ধারিত ফরমে। আবেদন জমা পড়েছে প্রায় ৭০টি।
এই আবেদন যাচাই-বাছাই শেষে এই সপ্তাহেই বসছে পরবর্তী সভা। উপযুক্ত প্রার্থীদের তালিকা চূড়ান্ত করে সুপারিশ পাঠানো হবে রাষ্ট্রপতির কাছে। তিনি চূড়ান্ত নিয়োগ দেবেন।
নতুন নিয়মে বিচারক হতে হলে বয়স হতে হবে অন্তত ৪৫ বছর। আগে এ ধরনের সীমা ছিল না। এবার প্রার্থীর শিক্ষাগত যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা, প্রশিক্ষণ, গবেষণা, আইনের প্রতি শ্রদ্ধা ও সুনাম—সব কিছুই খতিয়ে দেখা হবে। ফৌজদারি মামলায় কেউ দোষী কি না, সেটিও গুরুত্ব পাবে।
নিম্ন আদালতের বিচারকদের জন্যও নিয়ম আছে। হাইকোর্টে বিচারক হতে হলে কমপক্ষে ১০ বছর বিচারক থাকা লাগবে। পাশাপাশি আদালত পরিচালনার দক্ষতা, আদেশের মান, সততা ও আচরণও মূল্যায়ন করা হবে।
অস্থায়ী নিয়োগের দুই বছর পর কার্যকারিতা যাচাই করে কাউন্সিলই স্থায়ী নিয়োগের সুপারিশ করবে।
তবে বিতর্ক এখানেই শেষ নয়। অতীতে হাইকোর্টে নিয়োগ ঘিরে বহু বিতর্ক তৈরি হয়েছে। চারদলীয় জোট সরকারের সময় আওয়ামী লীগ তীব্র বিরোধিতা করেছিল। আন্দোলন করেছিল সুপ্রিম কোর্ট চত্বরে। অথচ ক্ষমতায় এসে শেখ হাসিনাই নিয়োগ দিয়েছেন আওয়ামী ক্যাডার, দলীয় নেতা, এমনকি খুনের মামলার আসামিদেরও। এখনো তারা বিচারকের চেয়ারে বসে আছেন।
বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই বিতর্কিত বিচারকদের অপসারণের দাবি উঠেছে। ছাত্র আন্দোলন থেকে শুরু করে আইনজীবীরাও চাপ দিয়ে গেছে। ফলে প্রধান বিচারপতি ১২ জন বিচারককে ছুটিতে পাঠান। তাদের মধ্যে ছয়জন ইতোমধ্যে অবসর নিয়েছেন বা পদত্যাগ করেছেন। বাকি ছয়জনের বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে।
সম্প্রতি আরও তিনজন বিচারক ছুটিতে পাঠানো হয়েছেন— মামনুন রহমান, বদরুজ্জামান ও আশরাফুল কামাল। আশরাফুল কামাল ৭ নভেম্বরের বিপ্লবকে রায়ে ‘ডাকাতি’ বলেছিলেন। মামনুন রহমানের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে।
এখন প্রশ্ন একটাই— নতুন নিয়োগে জুডিশিয়াল কাউন্সিল কি পারবে নিরপেক্ষতা ও যোগ্যতার মান বজায় রাখতে?

