বাংলাদেশের হাইকোর্ট বিভাগের বিকেন্দ্রীকরণ নিয়ে জনমতের সমর্থন অত্যন্ত স্পষ্ট ও দৃঢ়। সংবিধান সংস্কার কমিশন (CRC) এ বিষয়ে দেশের নাগরিকদের মতামত জানতে একটি জাতীয় জরিপ পরিচালনা করে। যা বাস্তবায়ন করে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)।
এই জরিপে প্রায় ৪৬ হাজার নাগরিকের সাক্ষাৎকার নেওয়া হয় এবং এতে দেখা যায়, ৮৮ শতাংশের বেশি উত্তরদাতা দেশের প্রতিটি প্রশাসনিক বিভাগে হাইকোর্ট স্থাপনের পক্ষে মত দিয়েছেন। জনমতের এই শক্তিশালী অবস্থানের প্রেক্ষাপটে সংবিধান সংস্কার কমিশন (CRC) এবং বিচারব্যবস্থা সংস্কার কমিশন (JRC) উভয়ই হাইকোর্ট বিকেন্দ্রীকরণের সুপারিশ করে যদিও তাদের প্রস্তাবের ধরনে কিছুটা পার্থক্য ছিল। CRC প্রতিটি বিভাগে স্থায়ী হাইকোর্ট আসন প্রতিষ্ঠার পক্ষে মত দেয় যেখানে JRC বিভাগীয় পর্যায়ে স্থায়ী বেঞ্চ স্থাপনের সুপারিশ করে। উভয় কমিশনই তাদের সুপারিশের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেছে।
তবে এই ধরনের যেকোনো স্থায়ী কাঠামো গঠনের জন্য সংবিধানের ধারা ১০০-তে সংশোধন আনা জরুরি। কারণ বর্তমান ধারা অনুযায়ী সুপ্রিম কোর্টের স্থায়ী আসন রাজধানীতেই থাকবে এবং শুধুমাত্র প্রধান বিচারপতির অনুমোদন সাপেক্ষে অন্যান্য স্থানে হাইকোর্ট বিভাগের “অধিবেশন” আয়োজন করা যেতে পারে। এর ফলে স্থায়ী আসন বা বেঞ্চ প্রতিষ্ঠার সাংবিধানিক ভিত্তি নেই।
ধারা ১০০-তে “অধিবেশন” শব্দটি ব্যবহৃত হলেও সেটি কার্যকর বিকেন্দ্রীকরণের জন্য যথেষ্ট নয়। গত ৫০ বছরে এই বিধান কার্যকরভাবে ঢাকার বাইরে বিচারিক কর্মকাণ্ড ছড়িয়ে দিতে পারেনি। এমনকি প্রধান বিচারপতির বিবেচনায় নির্ধারিত অধিবেশনগুলোও ছিল অস্থায়ী এবং বাধ্যতামূলক নয়, ফলে রাজধানীর বাইরে স্থায়ী বিচারপ্রাপ্তির নিশ্চয়তা দেয়নি। এ কারণে CRC ও JRC উভয়ই মনে করেছে কার্যকর বিকেন্দ্রীকরণে এই বিধান যথেষ্ট নয় এবং তারা স্থায়ী হাইকোর্ট আসন বা বেঞ্চ গঠনের সুপারিশ করেছে।
এ ধরনের বিকেন্দ্রীকরণের একটি ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট রয়েছে। ১৯৮২ থেকে ১৯৮৬ সালের মধ্যে মার্শাল ল- এর অধীনে ঢাকার বাইরে প্রথমে চারটি এবং পরে আরও তিনটি হাইকোর্ট বেঞ্চ স্থাপন করা হয়। ১৯৮৮ সালে সংবিধানের ধারা ১০০ সংশোধনের মাধ্যমে অষ্টম সংশোধনী গৃহীত হয় যার ফলে বরিশাল, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, যশোর, রংপুর এবং সিলেটে স্থায়ী হাইকোর্ট বেঞ্চ স্থাপিত হয়।
তবে অষ্টম সংশোধনীর সাংবিধানিক বৈধতা চ্যালেঞ্জ করা হয় সুপ্রিম কোর্টে, যা পরে “অষ্টম সংশোধনী মামলা” নামে পরিচিত হয়। ১৯৮৯ সালের ২ সেপ্টেম্বর একটি ঐতিহাসিক রায়ে আপিল বিভাগ ওই সংশোধনীর সংশোধিত ধারা ১০০ অবৈধ ও অসাংবিধানিক ঘোষণা করে। কারণ এটি হাইকোর্ট বিভাগের একত্ব নীতিকে ক্ষুণ্ণ করেছিল এবং সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর বিরুদ্ধে গিয়েছিল।
এই মামলাটি শুধু সংবিধান সংশোধনের সীমা নির্ধারণেই নয় বরং ‘বেসিক স্ট্রাকচার’ নীতির প্রবর্তনেও একটি যুগান্তকারী ঘটনা ছিল। আদালত উল্লেখ করে, সংবিধানের কিছু মৌলিক বৈশিষ্ট্য রয়েছে যা সংশোধন করা যায় না যেমন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও একক কাঠামো। এই রায়ের মাধ্যমে একটি সামরিক শাসকের হস্তক্ষেপ প্রতিহত হয় এবং ভবিষ্যতের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ভিত্তি দৃঢ় হয়। ১৯৯০ সালের গণআন্দোলন এবং সামরিক শাসনের পতনের পেছনেও এই রায়ের ভূমিকা উল্লেখযোগ্য।
তবে এখন প্রশ্ন উঠছে এই রায় কি CRC ও JRC-এর সুপারিশ অনুযায়ী হাইকোর্টের বিকেন্দ্রীকরণের পথ রুদ্ধ করে দিয়েছে? বিশ্লেষণে দেখা যায়, উত্তর হলো না।
প্রথমত, অষ্টম সংশোধনীর মূল ত্রুটিটি ছিল, এটি হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ বিচারিক ক্ষমতা সাতটি আলাদা বেঞ্চে ভাগ করে দিয়েছিল এবং হাইকোর্টের একত্ব নীতিকে ভেঙে দিয়েছিল। কিন্তু ভবিষ্যতে ধারা ১০০ যদি এমনভাবে সংশোধন করা হয় যাতে প্রতিটি বিভাগে স্থায়ী হাইকোর্ট আসনের অধীনে পূর্ণাঙ্গ বিচারিক ক্ষমতা অক্ষুণ্ন রাখা হয় এবং মামলার বণ্টন সুপ্রিম কোর্টের নীতিমালার অধীনে পরিচালিত হয় তাহলে আগের সেই সাংবিধানিক ত্রুটি থেকে মুক্ত থাকা সম্ভব।
দ্বিতীয়ত, সংবিধান একটি স্থবির দলিল নয় এটি সময় ও বাস্তবতার সঙ্গে অভিযোজিত হওয়া প্রয়োজন। সংবিধানের ব্যাখ্যা কোনো স্থির ব্যাকরণ নয় এটি সময়ের প্রয়োজনে বিকশিত হতে পারে। তাই ভবিষ্যতে ধারা ১০০ সংশোধনের ক্ষেত্রে আদালত চাইলে পূর্ববর্তী অষ্টম সংশোধনী মামলার ব্যাখ্যা থেকে সরে আসার সুযোগ পেতে পারে।
তৃতীয়ত, যদি জনগণের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সংবিধান সংশোধন করা হয় তাহলে সেটিকে সংবিধানের গঠনমূলক শক্তির প্রয়োগ হিসেবে গণ্য করা যেতে পারে। এক্ষেত্রে এমন একটি পরিবর্তন বেসিক স্ট্রাকচার নীতির আওতায় না পড়ে এবং সুপ্রিম কোর্টও সেটিকে অবৈধ ঘোষণা করার কারণ খুঁজে পাবে না।
সার্বিকভাবে বলা যায়, অষ্টম সংশোধনী মামলা হাইকোর্টের বিকেন্দ্রীকরণের পথে কোনও স্থায়ী বা অপ্রতিরোধ্য বাধা সৃষ্টি করে না। বরং একটি সুচিন্তিত ও গণতান্ত্রিকভাবে অনুমোদিত সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে, যেখানে ন্যায়বিচার, একতা ও কার্যকারিতার নীতিগুলো সমুন্নত থাকবে সে পথে অগ্রসর হওয়া পুরোপুরি সম্ভব। জনমত ও সাংবিধানিক সংস্কারের বাস্তবতা মিলিয়ে এখন সময় এসেছে হাইকোর্ট বিকেন্দ্রীকরণের নতুন করে ভাবনার।

