গত বছরের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর থেকেই দেশের প্রশাসনে অস্থিরতা ও আতঙ্ক বিরাজ করছে। একের পর এক অলিখিত সিদ্ধান্ত এবং পদক্ষেপে আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। বিশেষত, আগের সরকারের ঘনিষ্ঠ হিসেবে চিহ্নিত সচিব, সিনিয়র সচিব, নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট, ডিসি, এসপি, ইউএনও, ওসি এমনকি বিতর্কিত নির্বাচনে দায়িত্ব পালনকারী কর্মকর্তারা ইতোমধ্যেই ওএসডি অপসারণ বা বাধ্যতামূলক অবসরের মুখোমুখি হয়েছেন। তবে এবার আতঙ্কের মাত্রা আরও বেড়েছে। কারণ সরকারি চাকরির বিদ্যমান আইনে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে যাচ্ছে সরকার যার ফলে বিনা তদন্তে মাত্র এক সপ্তাহের নোটিশে চাকরিচ্যুতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
সচিবালয়ের একাধিক কর্মকর্তা জানান, প্রস্তাবিত সংশোধিত আইনে যেকোনও প্রশাসনিক বা দাফতরিক কাজে বিঘ্ন সৃষ্টি করলে, কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকলে, অন্যদের কর্মবিমুখ করতে উসকানি দিলে কিংবা সরকারি কর্মকাণ্ডে শৃঙ্খলাভঙ্গ ঘটালে, অভিযুক্ত কর্মচারীকে বিনা তদন্তেই চাকরিচ্যুত বা পদাবনতি দেওয়া যাবে। অভিযোগ পাওয়ার দুই থেকে পাঁচ দিনের মধ্যে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে জবাব দিতে হবে আর সন্তোষজনক জবাব না দিলে তিন দিনের মধ্যে কার্যকর হবে শাস্তি। অবশ্য শাস্তির বিরুদ্ধে আপিলের সুযোগ থাকলেও আদালতে এর বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা যাবে না।
বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে, নতুন এই আইনটির মাধ্যমে সব ধরনের সরকারি চাকরিজীবীদের আন্দোলন-সংগ্রাম নিষিদ্ধ করা হচ্ছে। ধর্মঘট, অবস্থান কর্মসূচি, মিছিল বা মিটিং সবকিছুই নিষিদ্ধ হবে। এর পেছনে যুক্তি হিসেবে সরকার বলছে, এমন কর্মকাণ্ডে অফিসের কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়ে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে সমস্যা হয় এবং জনসাধারণের সেবাপ্রদান ব্যাহত হয়।
গত বছরের আগস্টের পটপরিবর্তনের পর থেকে প্রশাসনের মধ্যে দলাদলি, পারস্পরিক সন্দেহ ও পেশাগত দ্বন্দ্ব প্রকট আকার ধারণ করে। ক্যাডার বিভাজন, পদোন্নতির অসাম্য, মহার্ঘ ভাতা ও অন্যান্য দাবিকে কেন্দ্র করে সচিবালয়ে কর্মচারীরা আন্দোলনে নেমে পড়েন। তখন থেকেই পুরো প্রশাসনে উদ্বেগ, ক্ষোভ ও হতাশা বাড়তে থাকে। এর মাঝে নির্বাচন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া অস্থিরতাকে আরও ঘনীভূত করে।
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, প্রশাসনে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে সরকারকে প্রচুর পরিশ্রম করতে হয়েছে, যা এখনো চলছে। সচিবালয়ের ভেতরে একাধিক অংশ নিজেদের দাবি আদায়ের লক্ষ্যে সক্রিয় থাকায় প্রশাসনিক কার্যক্রমে শৈথিল্য দেখা দিচ্ছে। নিয়ন্ত্রণের অভাব ও সিদ্ধান্তহীনতার ফলে প্রশাসনের কাঠামো একসময় সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় ‘সরকারি চাকরি আইন ২০১৮’ সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। পাশাপাশি ২০১৮ সালে বাতিল হওয়া ‘সরকারি কর্মচারী (বিশেষ বিধান) অধ্যাদেশ, ১৯৭৯’ থেকে কিছু ধারা পুনরায় সংযোজনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এই আইনের খসড়া ইতোমধ্যেই প্রধান উপদেষ্টার অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে এবং শিগগিরই উপদেষ্টা পরিষদের সভায় উপস্থাপন করা হবে।
নতুন আইনে তিন ধরণের শাস্তির কথা বলা হয়েছে চাকরিচ্যুতি, অব্যাহতি এবং পদাবনতি বা বেতন হ্রাস। এসব শাস্তি দেওয়ার আগে অভিযুক্তকে সীমিত সময়ের মধ্যে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করতে বলা হবে। যদি ব্যাখ্যা সন্তোষজনক না হয় তবে সরকার নির্ধারিত শাস্তি আরোপ করতে পারবে। আপিলের সুযোগ রাখা হলেও শেষ সিদ্ধান্ত রাষ্ট্রপতির হাতেই থাকবে।
সরকারের অভ্যন্তরীণ সূত্রে আরও জানা গেছে, এই আইনের মাধ্যমে প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলা, অনুপস্থিতি, দায়িত্ব এড়ানো, ও ক্ষমতার অপব্যবহার বন্ধ করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। গত বছর ডিসি নিয়োগ ঘিরে যে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয় তার প্রতিক্রিয়াও এই আইনের পেছনে কাজ করেছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, সরকারি কর্মচারীদের মধ্যে মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছে এবং তারা অনেকেই যথাযথ কর্তৃপক্ষের নির্দেশ মানতে অনীহা প্রকাশ করছেন যা সরকারের জন্য বিব্রতকর পরিস্থিতির জন্ম দিয়েছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ও শৃঙ্খলা রক্ষায় দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন বলেও চিঠিতে উল্লেখ করা হয়।
এর প্রেক্ষিতে সরকার সিদ্ধান্ত নেয়, ১৯৭৯ সালের বিতর্কিত অধ্যাদেশ থেকে কিছু ধারা হালনাগাদ করে বর্তমান চাকরি আইনে যুক্ত করা হবে। যদিও ১৯৭৯ সালের অধ্যাদেশে “আদালতে প্রশ্ন তোলা যাবে না” এমন ধারা ছিল প্রস্তাবিত আইনে তা বাদ দেওয়া হচ্ছে। এখন রাষ্ট্রপতির সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত ধরা হবে।
এদিকে মেহেরপুরের একজন কর্মকর্তা জানান, এই ধরনের কঠোর আইন সংবিধানের ৩৯(১) অনুচ্ছেদের পরিপন্থী। তিনি বলেন, “যখন ১৯৭৯ সালের আইনটি করা হয়েছিল তখন সংবিধান স্থগিত ছিল। কিন্তু এখন সংবিধান কার্যকর থাকা অবস্থায় এটি চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে।”
প্রশাসনের ভেতরে বিভিন্ন ক্যাডারভুক্ত কর্মকর্তারা নিজের অবস্থান রক্ষায় সংগঠিত হচ্ছেন। ‘আন্তক্যাডার বৈষম্য নিরসন পরিষদ’ নামে একটি সংগঠন গঠিত হয়েছে যারা প্রশাসন ক্যাডারের প্রভাব ও পক্ষপাতমূলক আচরণের বিরুদ্ধে বিবৃতি ও কর্মসূচি দিচ্ছে। তারা অভিযোগ করছে, জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদন নিয়ে প্রশাসন ক্যাডার সংস্থা ঢাকায় সমাবেশ করেছে এবং আলটিমেটাম দিয়েছে। এমনকি অন্যান্য ক্যাডার সদস্যদের উদ্দেশ্যে কটূক্তিও করা হয়েছে। এই ঘটনাগুলো সামাজিক মাধ্যমে পাল্টাপাল্টি বক্তব্যে পরিণত হয়েছে এবং প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলায় চরম ব্যাঘাত ঘটাচ্ছে।
এই অস্থিরতা ও দলাদলি নিরসনে সরকার মনে করছে, কঠোর আইনই হতে পারে একমাত্র সমাধান। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব ড. মোখলেস উর রহমান এই প্রসঙ্গে সাংবাদিকদের বলেন, “এটি সরকারের এখতিয়ার। এখানে আমার কোনও মন্তব্য দেওয়া উচিত নয়।”
সরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যে ক্রমবর্ধমান ভয়, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ও প্রশাসনিক অনিশ্চয়তার মধ্যে সরকার যে কঠোর ব্যবস্থা নিতে যাচ্ছে তা স্পষ্ট হয়ে উঠছে নতুন আইনের খসড়ায়। তবে এটি কার্যকর হলে তা একদিকে প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনলেও অন্যদিকে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা নিয়ে নতুন বিতর্ক সৃষ্টি করতে পারে বলেই মনে করছেন অনেকে।

