মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় জামায়াত নেতা এটিএম আজহারুল ইসলামের মৃত্যুদণ্ডের বিরুদ্ধে করা আপিলের শুনানি শেষ হয়েছে। বৃহস্পতিবার (৮ মে) প্রধান বিচারপতি ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদের নেতৃত্বাধীন সাত বিচারপতির পূর্ণাঙ্গ আপিল বেঞ্চ রায়ের জন্য আগামী ২৭ মে দিন নির্ধারণ করেছেন।
শুনানির সময় আদালতে আজহারের পক্ষে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ শিশির মনির। তাকে সহযোগিতা করেন অ্যাডভোকেট রায়হান উদ্দিন ও ব্যারিস্টার নাজিব মোমেন। এ সময় আদালতে জামায়াতে ইসলামীর শীর্ষস্থানীয় কয়েকজন নেতা উপস্থিত ছিলেন। তাদের মধ্যে ছিলেন সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জোবায়ের, অ্যাডভোকেট মোয়াজ্জেম হোসেন হেলাল, নির্বাহী পরিষদ সদস্য মোবারক হোসেন, ঢাকা মহানগর দক্ষিণের আমির নুরুল ইসলাম বুলবুল ও নায়েবে আমির ড. হেলাল উদ্দিন।
এর আগে ৬ মে শুনানির প্রথম দিনে আপিল বিভাগ আংশিক শুনানি গ্রহণ করে ৮ মে পরবর্তী দিন ধার্য করে। গত ২২ এপ্রিল আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ এই শুনানির জন্য ৬ মে দিন নির্ধারণ করেছিল। তারও আগে, ২৬ ফেব্রুয়ারি সর্বোচ্চ আদালত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় এটিএম আজহারের মৃত্যুদণ্ডের রায়ের বিরুদ্ধে আপিলের অনুমতি দেন। সেইসঙ্গে আসামিপক্ষকে দুই সপ্তাহের মধ্যে আপিলের সারসংক্ষেপ দাখিলের নির্দেশ দেওয়া হয়।
এই মামলাটি বাংলাদেশের আইনি ইতিহাসে একটি দৃষ্টান্তমূলক ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, কারণ এটিই প্রথম কোনো মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলা যেখানে রিভিউ থেকে মূল আপিল শুনানির অনুমতি দিয়েছে আদালত।
মামলার প্রেক্ষাপট অনুযায়ী, গত ২৩ ফেব্রুয়ারি আপিল বিভাগ জামায়াত নেতা আজহারের রিভিউ আবেদনের শুনানির জন্য দিন ধার্য করে এবং ২৫ ফেব্রুয়ারি প্রথম দিনের শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। ২০ ফেব্রুয়ারি রিভিউ আবেদনটি কার্যতালিকায় থাকলেও সেদিন তা শুনানি হয়নি। পরে ২৩ ফেব্রুয়ারি শুনানির জন্য নতুন দিন নির্ধারণ করেন বিচারপতি মো. আশফাকুল ইসলামের নেতৃত্বাধীন আপিল বেঞ্চ। আদালতে রাষ্ট্রপক্ষের হয়ে শুনানি উপস্থাপন করেন অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান এবং চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম।
২০১৪ সালের ৩০ ডিসেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল জামায়াত নেতা এটিএম আজহারুল ইসলামকে মৃত্যুদণ্ড দেন। পরে ২০১৫ সালের ২৮ জানুয়ারি এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেন আসামিপক্ষ। ১১৩টি যুক্তি তুলে ধরে ৯০ পৃষ্ঠার মূল আপিল ও ২৩৪০ পৃষ্ঠার সম্পূরক নথি আপিল বিভাগের সংশ্লিষ্ট শাখায় দাখিল করা হয়।
২০১৯ সালের ২৩ অক্টোবর আপিল বিভাগ এই রায় বহাল রাখে। তৎকালীন প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ ওই রায় প্রদান করে। পরে জামায়াত নেতা আজহার রায়ের বিরুদ্ধে রিভিউ আবেদন করেন।
মামলার অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়, মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে রংপুর অঞ্চলে গণহত্যা, অপহরণ, ধর্ষণ, আটক, নির্যাতন, লুণ্ঠন ও অগ্নিসংযোগসহ মোট ছয়টি মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িত ছিলেন এটিএম আজহার। এসব অভিযোগের মধ্যে পাঁচটিতে তাকে দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ড দেয় ট্রাইব্যুনাল। অভিযোগে বলা হয়, ১২৫৬ জনকে হত্যা বা গণহত্যা, ১৭ জনকে অপহরণ, একজন নারীকে ধর্ষণ, ১৩ জনকে আটক ও নির্যাতন করা হয় তার নেতৃত্বে পরিচালিত বাহিনীর মাধ্যমে। এছাড়াও শত শত বাড়িঘরে লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনাও তার বিরুদ্ধে অভিযোগে অন্তর্ভুক্ত ছিল।
এদিকে জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে শুরু থেকেই এই মামলার রায়কে “প্রহসনের রায়” হিসেবে বর্ণনা করে তা প্রত্যাখ্যান করা হচ্ছে।
২৭ মে রায় ঘোষণার মাধ্যমে বাংলাদেশের যুদ্ধাপরাধবিষয়ক বিচার প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় শেষ হতে যাচ্ছে। এই মামলার রায়ের দিকেই এখন নজর দেশের মানুষের, আইন অঙ্গনের এবং আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের।

