সাড়ে তিন বছর আগে কাজের সময় ভয়াবহ দুর্ঘটনায় হাত হারানো ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জ উপজেলার ১৩ বছর বয়সী শিশু নাঈম হাসান নাহিদকে অবশেষে ক্ষতিপূরণের একটি অংশ হিসেবে ১০ লাখ টাকার চেক প্রদান করেছেন ভৈরবের ওয়ার্কশপ মালিক হাজী ইয়াকুব। বৃহস্পতিবার (৮ মে) প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদের নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগে আদালতের নির্দেশনায় হাজী ইয়াকুবের আইনজীবী ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল চেকটি হস্তান্তর করেন শিশুটির পক্ষে আইনজীবী ব্যারিস্টার ওমর ফারুকের কাছে।
আদালত আগামী ১৩ মে মামলার পরবর্তী শুনানির দিন নির্ধারণ করেছে। ব্যারিস্টার ওমর ফারুক আশা প্রকাশ করেন সেদিন অবশিষ্ট ২০ লাখ টাকাও নাঈম পেয়ে যাবে এবং আদালতে হাজির হতে হবে অভিযুক্ত মালিক হাজী ইয়াকুবকে।
উল্লেখ্য এর আগেও গত ১০ ফেব্রুয়ারি আদালতের আদেশ সত্ত্বেও ৩০ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ পরিশোধ না করায় হাজী ইয়াকুবকে তলব করেছিল আপিল বিভাগ। আদালত অবমাননার আবেদনের শুনানি শেষে বিচারপতি মো. আশফাকুল ইসলামের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ এই আদেশ দেন।
এই মামলার শুরু হয় ২০২০ সালের ডিসেম্বরে যখন জাতীয় এক পত্রিকায় “ভৈরবে শিশুশ্রমের করুণ পরিণতি” শিরোনামে একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, নাঈমের বয়স তখন মাত্র ১০ বছর এবং সে চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ত। করোনাভাইরাসের প্রথম ঢেউয়ে বাবা আনোয়ার হোসেন জুতা ব্যবসা বন্ধ করতে বাধ্য হলে সংসারের চাপ সামলাতে তার মা-বাবা নাঈমকে কিশোরগঞ্জের ভৈরবের একটি ওয়ার্কশপে কাজে পাঠান। সেখানে কাজ করার সময় এক দুর্ঘটনায় মেশিনে হাত আটকে গিয়ে কনুই থেকে তার ডান হাতটি বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
প্রকাশিত প্রতিবেদনটি যুক্ত করে ২০২০ সালের ডিসেম্বর মাসে নাঈমের বাবা হাইকোর্টে একটি রিট আবেদন করেন যাতে ২ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ দাবি করা হয়। ওই বছরের ২৭ ডিসেম্বর হাইকোর্ট এ বিষয়ে রুল জারি করে জানতে চায় কেন শিশুটিকে দুই কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে না। চার সপ্তাহের মধ্যে বিবাদীদের জবাব দিতে বলা হয়। একই সঙ্গে ২০২০ সালের ২৮ সেপ্টেম্বরের ঘটনাটি জেলা প্রশাসকের একজন কর্মকর্তার মাধ্যমে তদন্ত করে প্রতিবেদন দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়।
পরবর্তী সময়ে, ২০২৩ সালের ১২ জানুয়ারি হাইকোর্ট নাঈমের জন্য ৩০ লাখ টাকা ফিক্সড ডিপোজিট করার নির্দেশ দেয়। রায়ে বলা হয়, এপ্রিল মাসের মধ্যে প্রথম ধাপে ১৫ লাখ এবং ডিসেম্বরের মধ্যে বাকি ১৫ লাখ টাকা জমা দিতে হবে। সেই সঙ্গে নির্দেশ দেওয়া হয় নাঈম এইচএসসি পাস না করা পর্যন্ত তাকে প্রতি মাসে ৭ হাজার টাকা করে ভাতা দিতে হবে ওয়ার্কশপ মালিককে। একই আদেশে বলা হয়, ১০ বছর পর নাঈম ফিক্সড ডিপোজিটের সম্পূর্ণ অর্থ উত্তোলন করতে পারবে।
এই আদেশের বিরুদ্ধে আপিল হলে, ২০২৩ সালের ১৯ নভেম্বর হাইকোর্টের রায় বহাল রাখে আপিল বিভাগ। শুনানিতে বিচারপতি মো. আশফাকুল ইসলামের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ হাইকোর্টের সিদ্ধান্ত সমর্থন করেন। পরে ২০২৩ সালের ৫ ডিসেম্বর শিশুটির ক্ষতিপূরণ সংক্রান্ত রুলের ওপর চূড়ান্ত শুনানি হয় এবং আদালত রায় ঘোষণার জন্য অপেক্ষমাণ রাখেন।
এই মামলায় শিশুটির পক্ষে নিঃস্বার্থভাবে আইনি লড়াই চালিয়ে যান ব্যারিস্টার অনীক আর হক, অ্যাডভোকেট মো. বাকির উদ্দিন ভূইয়া এবং তামজিদ হাসান। অন্যদিকে ওয়ার্কশপ মালিকের পক্ষে ছিলেন অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম ও আইনজীবী আবদুল বারেক। রাষ্ট্রপক্ষে দায়িত্বে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল অমিত দাশ গুপ্ত।
শিশুশ্রমের ভয়াবহতার প্রতীক হয়ে ওঠা নাঈমের ঘটনা এ দেশে শ্রমনিরাপত্তা ও শিশু অধিকার রক্ষায় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। আদালতের নির্দেশনা বাস্তবায়ন এবং পূর্ণ ক্ষতিপূরণ আদায়ে আগামী ১৩ মে তারিখটি গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

