চট্টগ্রাম মহানগর দায়রা জজ আদালতে এক নাশকতা মামলার জামিন শুনানিকে কেন্দ্র করে ঘটে যায় নজিরবিহীন এক ঘটনা। বৃহস্পতিবার (৮ মে) এজলাসেই দেখা দেয় চরম উত্তেজনা। আসামিপক্ষের আইনজীবীরা বিচারকের প্রতি অশালীন আচরণ করেন। কেউ কেউ বিচারকের দিকে ফাইল ছুড়ে মারেন। একপর্যায়ে বিচারক মো. হাসানুল ইসলাম দুইবার এজলাস ত্যাগে বাধ্য হন।
এই অপ্রত্যাশিত ঘটনায় আদালতজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে উত্তেজনা। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে দ্রুত এগিয়ে আসেন জেলা আইনজীবী সমিতির নেতারা। তারা পুলিশের প্রসিকিউশন বিভাগ ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে বসেন।
আন্দোলন থেকে মামলা, মামলার আসামিরা সবাই প্রভাবশালী
২০২৩ সালে চট্টগ্রাম সিটি কলেজ এলাকায় একটি আন্দোলনের সময় হামলার শিকার হন এক শিক্ষার্থী। তার নাম মাশফিকুর রহমান শান্ত। তিনি সদরঘাট থানায় নাশকতার অভিযোগে একটি মামলা দায়ের করেন।
এই মামলায় আসামি করা হয় ছয়জনকে। তারা সবাই মেঘনা পেট্রোলিয়াম শ্রমিক ইউনিয়নের নেতাকর্মী এবং আওয়ামী লীগের সঙ্গে জড়িত। আসামিরা হলেন—মো. আয়ুব (সভাপতি), হামিদুর রহমান (সাধারণ সম্পাদক), জহির উদ্দিন ওরফে আকবর (সহ-সাধারণ সম্পাদক), ইউসুফ আলী (অর্থ সম্পাদক), বাবু রনি কর (দপ্তর সম্পাদক) ও রাজীব ধর (সদস্য)।
১৬ ফেব্রুয়ারি হাইকোর্ট থেকে তারা আট সপ্তাহের জামিন পান। এরপর মেয়াদ শেষে তারা চট্টগ্রামের নিম্ন আদালতে আত্মসমর্পণ করে আবার জামিন আবেদন করেন।
জামিন নামঞ্জুর করায় শুরু হয় উত্তেজনা
প্রথমে ২৭ এপ্রিল জামিন শুনানির দিন ধার্য ছিল। পরে সেটি পিছিয়ে ৫ মে ও তারপর ৮ মে ধার্য করা হয়। বৃহস্পতিবার (৮ মে) শুনানিতে আসেন আসামিপক্ষের একাধিক আইনজীবী। তাদের মধ্যে ছিলেন অ্যাডভোকেট নুরুল ইসলাম, কামরুল হাসান সাজ্জাদ, সফিউল মোর্শেদ, জহুরুল আলম, আবুল কালাম আজাদ, রফিক আহমেদ, সেলিম উদ্দিন শাহীন, ফয়জুল আমিন, দেলোয়ার হোসেন, নেজাম উদ্দিন, ইকবাল হোসেন, রশিদ বিন জাহেদ ও বেলাল হোসেন। অধিকাংশই সরকারি নিয়োগপ্রাপ্ত আইনজীবী।
অন্যদিকে বাদীপক্ষের হয়ে ছিলেন অ্যাডভোকেট শামসুল আলম ও অ্যাডভোকেট জিয়াউর রহমান জিয়া। তাদের সঙ্গে জামায়াতপন্থি হিসেবে পরিচিত কয়েকজন আইনজীবীও ছিলেন।
শুনানির একপর্যায়ে বিচারক জামিন আবেদন নামঞ্জুর করেন। ঠিক তখনই আদালতে শুরু হয় হট্টগোল। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, আসামিপক্ষের কয়েকজন আইনজীবী বিচারকের দিকে উচ্চস্বরে চিৎকার করেন, অশালীন ভাষা ব্যবহার করেন। একপর্যায়ে কেউ একজন বিচারকের দিকে ফাইল ছুড়ে মারেন।
তীব্র অপমানবোধে বিচারক প্রথমবার এজলাস ত্যাগ করেন। আদালত সমিতির নেতারা দ্রুত পরিস্থিতি সামাল দিতে এগিয়ে আসেন। পরে বিচারক আবার এজলাসে ফেরেন। কিন্তু উত্তেজনা না কমায় দ্বিতীয়বারের মতোও তাকে কক্ষ ত্যাগ করতে হয়।
সমালোচনায় আইনজীবীরা
বাদীপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট শামসুল আলম বলেন, “জামিন দেওয়ার সিদ্ধান্ত একান্ত আদালতের। কিন্তু এমন অশোভন আচরণ আমি জীবনে দেখিনি। অনেক সরকারি আইনজীবী আসামিদের পক্ষে দাঁড়িয়েছেন। এটা সরাসরি বিধি লঙ্ঘন।”
জেলা আইনজীবী সমিতির সহ-সাধারণ সম্পাদক ফজলুল বারী বলেন, “প্রথমে শুনে আমি আদালতে যাই। বিচারকের খাস কামরায় কথা বলতে চেয়েছিলাম। তবে কিছু সমস্যা হওয়ায় আর দেখা হয়নি। পরে আবার বিচারক এজলাসে উঠলে ফের উত্তেজনা শুরু হয়।”
আলোচিত আসামি ডিবি থেকে ছাড়াও পেয়েছিলেন
এই মামলার আসামি হামিদুর রহমান আরও আগেই আলোচনায় এসেছিলেন। গত বছরের ১৭ ডিসেম্বর ডিবির হাতে গ্রেপ্তার হন তিনি। কিন্তু পরে অভিযোগ ওঠে, যুবদলের কয়েকজন নেতা তাকে ডিবি কার্যালয় থেকে ‘জোর করে’ ছাড়িয়ে নিয়ে যান। সে সময় ‘ঢাকা পোস্ট’ একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করে। শিরোনাম ছিল—“কার নির্দেশে ডিবি থেকে ছাড়া পেলেন হামিদুর?”

