২০২৪ সালের ৫ আগস্ট, স্বৈরাচারী সরকারের পতনের পর ৮ আগস্ট দায়িত্ব নেয় অন্তর্বর্তী সরকার। প্রথম থেকেই তারা সাইবার নিরাপত্তা আইন বাতিল করার প্রতিশ্রুতি দেয়। যা দীর্ঘদিন ধরে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার জন্য একটি বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছিল। প্রায় ৯ মাস পর, সরকার ঘোষণা করেছে যে তারা সাইবার নিরাপত্তা আইনের বদলে ‘সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ’ আনবে।
মঙ্গলবার, অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদ এই অধ্যাদেশের খসড়া অনুমোদন করেছে। এর ফলে সাইবার নিরাপত্তা আইনের ৯টি ধারা বাতিল করা হয়েছে। এর মধ্যে মুক্তিযুদ্ধ, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং জাতীয় প্রতীক সম্পর্কে বিদ্বেষ, বিভ্রান্তি ও কুৎসামূলক প্রচারণার বিধানগুলো বাদ পড়েছে। এছাড়া, মানহানিকর তথ্য প্রকাশ এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অবনতির ধারা সবার জন্য রদ করা হয়েছে।
আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল এসব ধারাকে ‘কুখ্যাত’ হিসেবে অভিহিত করেছেন এবং বলেন, এসব ধারায় সবচেয়ে বেশি মামলা হয়েছিল। এর ফলে এসব মামলাগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে। এটি ভুক্তভোগীদের জন্য স্বস্তির খবর হিসেবে এসেছে।
নতুন ‘সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ’-এ মতপ্রকাশের অপরাধের দুটি নতুন দিক যুক্ত করা হয়েছে। প্রথমটি হলো, নারী ও শিশুর প্রতি যৌন নির্যাতনমূলক কনটেন্ট প্রকাশ ও হুমকি দেওয়া। দ্বিতীয়টি হলো, ধর্মীয় ঘৃণা ছড়িয়ে সহিংসতা উসকে দেওয়ার অপরাধ। এতে ধর্মীয় ঘৃণাকে সুনির্দিষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। যাতে কেউ ভুল-বোঝাবুঝি বা হয়রানির শিকার না হয়।
নতুন অধ্যাদেশে অনলাইন জুয়া নিষিদ্ধ করা হয়েছে এবং সাইবার নিরাপত্তা কাউন্সিলে সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের রাখা হবে। এসব পরিবর্তন ইতিবাচক হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। যা অপরাধ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে খসড়া অধ্যাদেশে কনটেন্ট অপসারণের জন্য আদালতের অনুমতি নেওয়ার বিধান রাখা হলেও, এটি আরও গ্রহণযোগ্য হতে পারত যদি কনটেন্ট অপসারণের আগে আদালতের অনুমতি নেওয়ার বিষয়টি আরও স্পষ্ট করা হতো, যেভাবে অনেক দেশে এটি করা হয়।
এছাড়া, ইন্টারনেটকে নাগরিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। তবে এই অধিকার ক্ষুণ্ন হলে ভুক্তভোগী ব্যক্তির জন্য আইনগত প্রতিকার দেওয়ার বিষয়ে কিছু স্পষ্ট করা হয়নি। এতে প্রশ্ন উঠছে, এই অধিকার কার্যকরীভাবে প্রয়োগ হবে কিনা।
এছাড়া নতুন অধ্যাদেশে পরোয়ানা ছাড়া তল্লাশি, গ্রেপ্তার ও জব্দের বিধান নিয়ে কোনো স্পষ্ট উল্লেখ নেই। এসব বিধান যদি বহাল থাকে, তবে অপব্যবহারের সুযোগ থাকতে পারে। তাই এসব বিষয় পুনর্বিবেচনা করা জরুরি।
সব মিলিয়ে সাইবার নিরাপত্তা আইন বাতিল এবং সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ প্রবর্তন একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। কিছু প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনা হয়েছে। তবে কিছু বিষয় আরও উন্নতির সুযোগ রেখে নতুন অধ্যাদেশ কার্যকরীভাবে বাস্তবায়িত হওয়ার জন্য সরকারকে আরও সতর্ক থাকতে হবে।

